ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে আগুনে পোড়া লঞ্চের দগ্ধ শতাধিক যাত্রীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঝালকাঠি সদর হাসপাতাল এবং রাজধানী ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। এই হাসপাতালগুলোর শয্যায় শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন দগ্ধরা। আর তাদের পাশে আহাজারি করছেন স্বজনরা। গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এই হাসপাতালগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা রোগীদের স্বজনরা ওষুধসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী আনতে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছেন। আবার কোনো কোনো রোগীর পাশে নেই তাদের স্বজনরা।
লঞ্চে আগুনে দগ্ধদের বেশিরভাগকেই ঘটনার পরপরই নেওয়া হয় ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে। পরে সেখান থেকে গুরুতর আহতদের পাঠানো হতে থাকে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সবমিলিয়ে লঞ্চে আগুনে দগ্ধ ৭২ জনকে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাদের জরুরি চিকিৎসায় হাসপাতালের সব চিকিৎসক, নার্স ও স্টাফের সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করে কর্র্তৃপক্ষ। তবে চিকিৎসক না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ হাসপাতালটির বার্ন ইউনিট। এমন পরিস্থিতিতে সার্জারি ওয়ার্ডে দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে গুরুতর আহতদের পাঠানো হয় শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আগুনে বেশিরভাগ রোগীরই ৫০ ভাগ দগ্ধ হয়েছে। সেখান থেকে প্রায় ৭০ ভাগ দগ্ধ তিন শিশুসহ ৭ জনকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে রেফার করা হয়। তাদের মধ্যে ঢাকায় নেওয়ার পথে এক শিশুর মৃত্যু হয়।
গতকাল ভোর ৫টা থেকে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লঞ্চে আগুনে দগ্ধ রোগীরা আসতে শুরু করে। সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ৭২ রোগী এ হাসপাতালে ভর্তি হয়। এর মধ্যে পুরুষ সার্জারি ওয়ার্ডের ৩ ও ৪ নম্বর ইউনিটে ৪০ জন, মহিলা সার্জারি ওয়ার্ডে ২০ জন এবং শিশু সার্জারি ওয়ার্ডে ৭ জনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এ ছাড়া অর্থোপেডিকস ওয়ার্ডে ৫ জনকে ভর্তি করা হয়।
বার্ন ইউনিট বন্ধ : দগ্ধ রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হয় শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক-সেবিকাদের। একের পর এক দগ্ধ রোগী ভর্তি হওয়ায় চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খান তারা।
এই হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগে একজন চিকিৎসক ছিলেন। ২০২০ সালের ২৮ এপ্রিল ভাড়া বাসা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ মৃত্যুর রহস্য এখনো উদ্ঘাটিত হয়নি। এরপর এক বছর আট মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো চিকিৎসক দেওয়া হয়নি এ ইউনিটে। ফলে চিকিৎসক শূন্যতায় হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগ বন্ধ রয়েছে। এ কারণে দগ্ধ রোগীদের হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের তিন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। ওই তিন ইউনিটে আগে থেকেই রোগী ছিল। এতে করে শয্যা সংকট দেখা দেয়। অনেক দগ্ধ রোগীকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চিকিৎসকের অভাবে হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগটি বন্ধ রয়েছে। হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের ৩ ওয়ার্ডে ৫০ জন চিকিৎসক ও ইন্টার্ন চিকিৎসক দগ্ধ রোগীদের সেবা দিচ্ছেন, তবে সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’
এরপর দুপুরে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার সাইফুল হাসান হাসপাতালে দগ্ধ রোগীদের দেখতে গিয়ে বলেন, দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসার জন্য ঢাকা থেকে ৫০ সদস্যের একটি দল বরিশালে আসছে। তারা বরিশালে এসে রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেবে।
সবারই পুড়েছে শ্বাসনালি : গতকাল রাত ১০টায় এ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত লঞ্চে দগ্ধদের ৭ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছিল। গতকাল বেলা ৩টার পর থেকে বিভিন্ন সময় তারা হাসপাতালটিতে আসেন। এদের মধ্যে ছিলেন জিয়াসমিন আক্তার (২৮), তার ছেলে তামিম হাসান (১০), মো. বাচ্চু মিয়া (৫০), তার স্ত্রী শাহিনুর খাতুন স্বপ্না (৪৩) ও শাহিনুরের মেয়ে ইশরাত জাহান সাদিয়া (২২)। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ভর্তি সবারই শ্বাসনালি দগ্ধ হয়েছে।
এদিকে লঞ্চে অগ্নিকান্ডে দগ্ধদের চিকিৎসার জন্য সাত সদস্যের একটি মেডিকেল টিম ঢাকা থেকে বরিশালে গেছে। গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে এই চিকিৎসকদের বরিশালের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ার বিষয়টি দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডা. এসএম আইউব হোসেন।
এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবির বলেন, ‘গত ২০-৩০ বছরেও লঞ্চে এমন দুর্ঘটনা ঘটেনি। এত বড় দুর্ঘটনা ঘটায় এত বেশি পরিমাণ রোগী সেখানকার হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়নি। সেখানে অন্য বিভাগের চিকিৎসকরা দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসা দিয়েছে। এজন্য ঢাকা থেকে সাত সদস্যের একটি মেডিকেল টিম বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে।’
শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন জানান, লঞ্চে দগ্ধদের চিকিৎসার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মালদ্বীপ থেকেই ফোন করে খোঁজখবর নিচ্ছেন।
দগ্ধ জিয়াসমিনের মামা মো. মামুন জানান, জিয়াসমিন তার স্বামী সন্তান নিয়ে বরগুনা সদরে থাকেন। তার বাবার বাড়ি ঢাকার কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা এলাকায়। ১০-১২ দিন আগে জিয়াসমিনের নানির মৃত্যুর খবর পেয়ে দুই সন্তান নিয়ে বাবার বাড়ি যান তিনি। বৃহস্পতিবার রাতে আবার সন্তানদের নিয়ে বরগুনা ফিরছিলেন। তখন লঞ্চে দুর্ঘটনার শিকার হন।
তিনি আরও জানান, দগ্ধ অবস্থায় তাদের বরিশাল মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে তাদের তিনজনকে ঢাকায় নিয়ে আসা হচ্ছিল। পথে মাওয়া ঘাটে জিয়াসমিনের মেয়ে মাহিনুরের মৃত্যু হয়। তার লাশ কেরানীগঞ্জ নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
দগ্ধ বাচ্চুর ছেলে সাইফুল্লাহ মানসুর সাদিক জানান, অগ্নিকাণ্ডের সময় পরিবারের সঙ্গে তিনিও ছিলেন। তিনি সামান্য দগ্ধ হয়েছেন।
লঞ্চ দুর্ঘটনায় আহত মিলন (৩৮) নামে একজনকে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করা হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় তাকে ঢাকা মেডিকেলের ১০৩ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। তার বাড়ি বরগুনা পাথরঘাটা উপজেলায়। বাবার নাম রুস্তম সরদার। তিনি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় সোয়েটার কারখানায় কাজ করেন।
‘ঢাকায় যারা আসছে তারা সবাই ক্রিটিক্যাল’ : ঝালকাঠিতে লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধদের মধ্যে যাদের ঢাকা আনা হয়েছে, তারা সবাই ‘ক্রিটিক্যাল কন্ডিশনে’ আছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি বলেন, ‘বিস্ফোরণে অনেকে দগ্ধ হয়েছে, অনেকে ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ঢাকায় যারা আসছে, তারা সবাই ক্রিটিক্যাল কন্ডিশনে আছে। আর বরিশাল মেডিকেলে যারা আছে, তারা ততটা ক্রিটিক্যাল না। এ জন্য তাদের সে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’
গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধদের দেখতে গিয়ে এসব কথা বলেন তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ঢাকায় আসার পথে একজনের মৃত্যুসহ সব মিলিয়ে ৩৫ জন লোক মারা গেছে বলে জানতে পেরেছি। বরিশালে ভর্তি আছে ৮১ জন। ১০ জনকে সেখান থেকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সারা দেশে বিভিন্নভাবে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। এ বিষয়টি চিন্তা করে দুই সপ্তাহ আগে একনেক সভায় একটি প্রকল্প পাস হয়েছে। সেটি হচ্ছে দেশের আটটি বিভাগের মধ্যে পাঁচটিতে ১০০ শয্যাবিশিষ্ট পাঁচটি বার্ন ইনস্টিটিউট করা হবে। পরে আরও দুই বিভাগে দুটি ইনস্টিটিউট করা হবে। ইনস্টিটিউটগুলোতে আইসিইউ, এইচডিইউসহ পোড়া রোগীদের উন্নত চিকিৎসার সব ব্যবস্থা রাখা হবে, যাতে তাদের ঢাকামুখী হতে না হয়।’
করোনা পরিস্থিতি নিয়ে জাহিদ মালেক বলেন, ‘ইউরোপের বর্তমান অবস্থার মতো করোনার সংক্রমণ আমাদের দেশেও হোক তা আমরা চাই না। তাই সবাইকে সচেতন হতে হবে। আমরা দেখতে পাচ্ছি করোনার সংক্রমণের হার ফের ২ শতাংশ হয়েছে, যা ১ শতাংশের নিচে ছিল। এটা খুবই উদ্বেগের বিষয়। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লে মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়ে যাবে। আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। মাস্ক পরতে হবে। আমরা দেখতে পাচ্ছি লাখ লাখ মানুষ কক্সবাজার চলে যাচ্ছে, তারা কেউ মাস্ক পরছে না।’
বুস্টার ডোজ টিকা কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ডোজের সংখ্যা বাড়লে এর ফলাফল পাওয়া যাবে। তখন বোঝা যাবে এটা কতটুকু কার্যকর।