৪৩৭ সন্ত্রাসীর নিয়ন্ত্রণে রোহিঙ্গা শিবির!

কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ৩৪টি শিবির ৪৩৭ সন্ত্রাসী নিয়ন্ত্রণ করছে বলে পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিট সূত্রে জানা গেছে। ওই ইউনিট গত মাসে ৮টি গ্রুপে বিভক্ত এসব রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীর তালিকা পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠিয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে বেশ কয়েকটি হত্যাকা- এবং নানা ধরনের অপরাধ কর্মকান্ড বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে পুলিশের ওই বিশেষ ইউনিট এই তালিকা দিল।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের তালিকাটি তাদের নজরে এসেছে। শিবিরগুলো ঘিরে মাদক চোরাচালান ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ক্রমেই উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। দলবদ্ধ হামলার বহু ঘটনা ঘটেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত চার বছরে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে সন্ত্রাসীদের হাতে ২৩৭ জন খুন হয়েছে। আহত হয়েছে সহস্রাধিক নারী-পুরুষ। ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৮৭ জন। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ১ হাজার ৭১২টি।

অভিযোগ রয়েছে, ক্যাম্পের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের গোপনে সহায়তা করছে মিয়ানমারের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা)। এই সংগঠনটির মাধ্যমে মাদক কারবারও চালানো হচ্ছে। নানা অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার দায়ে বিভিন্ন সময়ে ৫শ’ রোহিঙ্গা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে ধরা পড়েছে। তা ছাড়া পুলিশ-র‌্যাব ও বিজিবির সঙ্গে গোলাগুলিতে শতাধিক রোহিঙ্গা মারা গেছে।

সম্প্রতি মিয়ানমারের মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের একজন কর্মকর্তা তাদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে দাবি করেছেন যে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে আরসার উপস্থিতি রয়েছে। তবে বাংলাদেশ বরাবরই আরসার উপস্থিতি থাকার বিষয়টি নাকচ করে আসছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কক্সবাজার জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, শিবিরগুলোতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধ, ভাড়া তোলা, পূর্ব শত্রুতা, চুরি, ডাকাতি, অপহরণ, খুনোখুনিসহ নানা ধরনের অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িত কিছু রোহিঙ্গা।তারা মাদক পাচারে জড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে ইয়াবা কারবার চালাচ্ছে বেশি।

ওই কর্মকর্তা বলেছেন, ২০১৬ সালের ১৩ মে টেকনাফের মৌচনী রোহিঙ্গা শিবিরের পাশে শালবন আনসার ক্যাম্পে হামলা চালায় হাকিম বাহিনী। তারা আনসার কমান্ডার আলী হোসেনকে গুলি করে হত্যা করে। নিয়ে যায় ১১টি আগ্নেয়াস্ত্র। তারপর থেকেই বোঝা গেছে, ক্যাম্পের ভেতর সন্ত্রাসীদের আনাগোনা রয়েছে।

জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রোহিঙ্গা শিবির থেকে কোনো ধরনের অপরাধ কর্মকান্ড চালাতে পারবে না কেউ। দেশের পরিস্থিতি কেউ নষ্ট করার চেষ্টা করলে তাদের কঠোরভাবে দমন করা হবে। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য নতুন আবাসনস্থল গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে নতুন একটি থানা হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য যা যা করা দরকার তাই করা হচ্ছে।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সেনাবাহিনীর গণহত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশমুখী ঢল নামে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট। সীমান্ত পেরিয়ে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা কক্সাবাজারে এসে আশ্রয় নেয়। আনরেজিস্টার-২১, হোয়াইংকা চাকমারকুল, উংচিপ্রাং-২২, লেদা-২৪, আলীখালী-২৫, নয়াপাড়া মৌচনী-২৬ ও জাদিমুড়া ক্যাম্পসহ ৩৪টি শিবিরে তাদের আশ্রয় দেওয়া হয়। এর আগেও বিভিন্ন সময় মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, রোহিঙ্গা শিবিরগুলো অপরাধীদের আখড়া হয়ে উঠছে। গুম, খুন, ধর্ষণসহ এমন কোনো অপরাধ নেই যা শিবিরগুলোতে হয় না। প্রতিটি শিবিরেই আছে সন্ত্রাসীদের তৎপরতা। নারীদের তুলে নিয়ে যায় স্বামী-স্বজনদের সামনেই। রোহিঙ্গাদের মধ্যে কেউ কেউ ডাকাতির সঙ্গে জড়িত। আছে মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান চক্র।

চলতি বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পক্ষে কাজ করা রোহিঙ্গা নেতা মহিব উল্লাহকে হত্যা করা হয়। তার কিছুদিন পর একটি মাদ্রাসায় হামলা চালিয়ে তিন শিক্ষক ও এক শিক্ষার্থীকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ওই ঘটনার পরের দিন ক্যাম্পের দুজনকে হত্যা করা হয়। এসব হামলার জন্য ক্যাম্পে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা আরসা ও এর অনুসারীদের দায়ী করে।

এমন প্রেক্ষাপটে পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিট তালিকাসহ একটি প্রতিবেদন পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠিয়েছে। সেখানে ৮টি গ্রুপে ৪৩৭ জন রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীর অপরাধ কর্মকান্ড তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, এসব রোহিঙ্গা অপরাধ, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান, অপহরণ, ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িত। এই তালিকায় বেশ কয়েকজনের নাম রয়েছে যাদের আরসা মতাদর্শী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

গ্রুপগুলোর নেতৃত্বে যারা রয়েছে তাদের মধ্যে আছে উখিয়ার ৭ নম্বর ক্যাম্পের দীন মোহাম্মদ ওরফে মার্স, বালুখালী শিবিরের নবী হোসেন, নাসাপ্রু এলাকার মৌলভী আক্কাস, টেকনাফের কুতুপালং শিবিরে মৌলভী আইয়াহ, টেকনাফের ব্লক এ থেকে ডি-এর মোহাম্মদ হাসিম, উখিয়ার ৪ নম্বর শিবিরের আলম, কুতুপালং এলাকার ৫ নম্বর শিবিরের মৌলভী শহিদুল, টেকনাফের ২ নম্বর শিবির (পূর্ব) ব্লক ই-৩ এর কলিমুল্লাহ। কোনো কোনো গ্রুপে ৪০-১২০ জন পর্যন্ত সদস্য আছে। কোনো কোনো গ্রুপে আছে ৪০-৪৫ জন। আবার কোনো কোনো গ্রুপে ৭০-৭৫ জন সদস্য রয়েছে।

কক্সবাজার-টেকনাফের ১৬ এপিবিএনের (আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন) কমান্ডিং অফিসার ও পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, অপরাধীদের রুখতে প্রতিনিয়ত বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে। অন্যান্য সময়ের তুলনায় বর্তমানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধ ঘটছে না। তারপরও আমরা সতর্ক আছি। তালিকাভুক্ত অপরাধীরা অনেকটা গা ঢাকা দিয়েছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। ’

একই ব্যাটালিয়নের উনুচুচিপ্রাংয়ের কমান্ডার ও সহকারী পুলিশ সুপার আলী হোসেন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে ক্যাম্পগুলোতে আমরা নিয়মিত মনিটরিং করছি। প্রায় ২৪শ স্বেচ্ছাসেবক পুলিশের সঙ্গে কাজ করছে। স্বেচ্ছাসেবকদের লাঠি ও বাঁশি দেওয়া হয়েছে। প্রতিরাতে পুলিশের সঙ্গে ১শ’ স্বেচ্ছাসেবক কাজ করেন।