সহিংসতার মধ্যেই চতুর্থ ধাপের ৮৩৮টি ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) আজ রবিবার ভোট হচ্ছে। এর মধ্যে ৩৮টিতে ইলেট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট নেওয়া হবে। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোটগ্রহণ চলবে।
এ ধাপের নির্বাচনে প্রার্থীদের পক্ষে আচরণবিধি লঙ্ঘন করে প্রচারে অংশ নিতে দেখা গেছে কয়েকজন সংসদ সদস্যকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রচার বা নির্বাচনী কার্যক্রমে সংসদ সদস্য ও সরকারি সুবিধাভাগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অংশ না নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
তফসিল অনুযায়ী, দেশের ৮৪০ ইউপিতে ভোট হওয়ার কথা ছিল ২৩ ডিসেম্বর। এইচএসসি পরীক্ষা থাকায় ভোটের তারিখ তিনদিন পিছিয়ে ২৬ ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছিল। চতুর্থ ধাপে ভোটের আগেই চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সদস্য পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন ২৯৫ জন। চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছেন ৪৮ জন। সংরক্ষিত সদস্য পদে ১১২ জন এবং সাধারণ সদস্য পদে ১৩৫ জন নির্বাচিত হয়েছেন।
এ ধাপে চেয়ারম্যান পদে তিন হাজার ৮১৪ জন, সংরক্ষিত সদস্য পদে নয় হাজার ৫১৩ জন এবং সাধারণ সদস্য পদে ৩০ হাজার ১০৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ৯ হাজার ২২৪টি ভোটকেন্দ্রের ৪৯ হাজার ৮৩২টি ভোটকক্ষে এক কোটি ৬২ লাখ ৭৪ হাজার ৬৬০ জন ভোটার তাদের ভোটারধিকার প্রয়োগ করবেন।
ইতিমধ্যে তিন ধাপের ভোটগ্রহণ শেষ করেছে ইসি। পঞ্চম ধাপে ৭০৭টি ইউপিতে ৫ জানুয়ারি এবং ষষ্ঠ ধাপে ২১৯ ইউপিতে ৩১ জানুয়ারি ভোটগ্রহণ হবে।
আধিপত্যের কারণে বিনাভোটে জয়ের রেকর্ডও হয়েছে এবার। পঞ্চম ধাপ পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজারের বেশি জনপ্রতিনিধি বিনাভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। ৩৫৩ ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে ভোটের প্রয়োজন হয়নি।
নির্বাচনী প্রচারণার সময়ে প্রার্থীদের হুমকি, ধমকি, হামলা এবং দফায় দফায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে উত্তপ্ত ভোটের মাঠ।
ভোটের আগের দিন গতকাল শনিবার ইসি সচিব হুমায়ুন কবীর খোন্দকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।’ সহিংসতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ইউপি নির্বাচনে ঘরে ঘরে প্রতিযোগিতা হয়। সে কারণে সহিংসতার ঘটনাও ঘটে।’ তবে ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো থাকবে এবং সুষ্ঠু ভোট হবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
ভোটের মাঠে সহিংসতা বিরাজ করছে জানিয়ে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ বদিউল আলম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন ভিন্ন বাস্তবতায় আছে। মাঠে কী ঘটছে তার সঙ্গে তাদের সংযোগ নেই। সহিংসতার অবসান ঘটার মতো কোনো আলামত দেখছি না। এটা বন্ধ হওয়া জরুরি।’
চতুর্থ ধাপ ও পঞ্চম ধাপের নির্বাচন সামনে রেখে গত কয়েকদিনে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। ভোলায় দুই ইউপি সদস্য প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে ৫০ জন আহত হয়েছে। প্রচারের সময় মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে ঝিনাইদহে। নির্বাচনী ক্যাম্পে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে যশোরে। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় নির্বাচনী সহিংসতার জেরে চেয়ারম্যান প্রার্থীর কর্মীর হাতের কব্জি বিচ্ছিন্ন করার ঘটনা ঘটেছে। লক্ষ্মীপুরে স্বতন্ত্র প্রার্থী ছাত্রলীগ নেতাকে তুলে নিয়ে মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। গতকাল শনিবার ভোটের আগের দিন কুমিল্লার আদর্শনগর থেকে ২৯টি ককটেল, ৭টি রামদাসহ দেশীয় অস্ত্র উদ্বার করা হয়েছে। গত জুনে শুরু হওয়া তৃণমূলের এ ভোট এখন পর্যন্ত নির্বাচনী সহিংসতায় প্রাণ হারায় ৭৪ জন। এ ছাড়া ক্রসফায়ার করার, এলাকায় ঢুকতে না দেওয়ার মতো হুমকির অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নির্বাচনী ক্যাম্প দখলের অভিযোগও উঠেছে।
চতুর্থ ধাপের নির্বাচনের প্রচারণা শেষ হয়েছে গত শুক্রবার মধ্যরাতে। সুষ্ঠু ভোট গ্রহণের লক্ষ্যে দেশের ৫৮ জেলার ১১৮ উপজেলায় আগামীকাল ২৭ ডিসেম্বর সোমবার পর্যন্ত মোটরসাইকেল চলাচলে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এছাড়া গত শনিবার মধ্যরাত থেকে আজ রবিবার দিবাগত মধ্যরাত পর্যন্ত ট্রাক, পিকআপসহ যান্ত্রিক যানবাহন, লঞ্চ, ইঞ্জিনচালিত নৌযান এবং স্পিডবোট চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। সাংবাদিক, নির্বাচন কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ জরুরি সেবার কাজে নিয়োজিতদের জন্য এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে না।
ইসির দেওয়া তথ্যমতে, প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ২২জন করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ভোটের দায়িত্বে থাকবেন। এছাড়া প্রতি ইউপিতে পুলিশ, আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ও অস্ত্রধারী আনসারের সমন্বয়ে একটি করে মোবাইল ফোর্স এবং প্রতি তিনটি ইউপিতে তিনটি করে স্ট্রাইকিং ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে।
এছাড়া প্রতি উপজেলায় র্যাবের দুইটি মোবাইল টিম ও একটি স্ট্রাইকিং ফোর্স, প্রতি উপজেলায় বিজিবি’র দুইটি মোবাইল ফোর্স (দুই প্লাটুন), একটি স্ট্রাইকিং ফোর্স (এক প্লাটুন), প্রতি উপকূলীয় উপজেলায় কোস্টগার্ডের দুইটি মোবাইল টিম (দুই প্লাটুন) ও একটি স্ট্রাইকিং ফোর্স (এক প্লাটুন), প্রত্যেক উপজেলায় একজন করে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োজিত রয়েছেন।