এবার শরিয়াহভিত্তিক সুকুক ছেড়ে এক হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের ঘোষণা দিয়েছে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)। সুকুকের মাধ্যমে উত্তোলিত অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করবে প্রতিষ্ঠানটি। এজন্য কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ ‘আইসিবি ফার্স্ট মুদারাবা সুকুক’ বন্ড ইস্যুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গতকাল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এর আগে দেশে বেসরকারি খাতে প্রথমবারের মতো শরিয়াহভিত্তিক গ্রিন সুকুক বন্ড ইস্যু করে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বেক্সিমকো লিমিটেড। সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন এ কোম্পানিটি শরিয়াহভিত্তিক সুকুক ছেড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। অবশ্য দেশে সুকুকের মাধ্যমে প্রথম অর্থ সংগ্রহ করে সরকারি প্রতিষ্ঠান পানি উন্নয়ন বোর্ড। সাড়া দেশে নিরাপদ পানি সরবরাহের প্রকল্পে সরকারি প্রতিষ্ঠানটি সুকুক ছেড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করে। আর বেসরকারি পর্যায়ে বেক্সিমকো ছাড়াও তালিকাভুক্ত কোম্পানি দেশবন্ধু পলিমার সুকুকের মাধ্যমে ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের ঘোষণা দিয়েছে। এরপরই আইসিবি সুকুক ছেড়ে এক হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের ঘোষণা দিল।
আইসিবি জানিয়েছে, সুকুক বন্ডের ন্যূনতম ৭০ শতাংশ অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা হবে। অবশিষ্ট অর্থ মুদ্রাবাজারে বিনিয়োগ হবে। এই বিনিয়োগ থেকে বছর শেষে যে নিট মুনাফা হবে তার ৭৫ শতাংশ সুকুকহোল্ডারদের মধ্যে বিতরণ করা হবে।
আইসিবি জানিয়েছে, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) অনুমোদনের পর সম্পদভিত্তিক সুকুক ইস্যু করবে আইসিবি। আইসিবির এই সুকুকের মেয়াদ হবে ১০ বছর। বন্ডটি তালিকাভুক্ত হবে না। সুকুক বন্ডের অভিহিত মূল্য এক হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের সব নাগরিক (স্থানীয় ও অনাবাসী), প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী যেমন ব্যাংক, বীমা ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান, দেশি ও বিদেশি কোম্পানি, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও করপোরেশনসহ অন্যান্য সব সামাজিক প্রতিষ্ঠান যেমন ক্লাব, সমিতি এই বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারবে।
প্রতিষ্ঠানের জন্য ১০০ ইউনিটের লট এক লাখ টাকা এবং ৫ হাজার টাকা মূল্যমানের ৫ ইউনিটের একটি লটে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করতে পারবেন। সুকুকে বিনিয়োগকৃত মূলধন ষষ্ঠ বছর থেকে ফেরত দেওয়া শুরু করবে আইসিবি। ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম বছরের শেষে ২০ শতাংশ করে মূল অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। সুকুকের বাকি অংশ দশম বছরের শেষে বাজার মূল্যে পরিশোধ করা হবে।
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ ও উচ্চ সুদের ব্যাংকঋণ পরিশোধে চলতি বছর বিদেশি মুদ্রায় ১৫০ কোটি ডলারের বন্ড ছাড়ার উদ্যোগ নেয় আইসিবি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে দেওয়া চিঠিতে আইসিবি জানিয়েছে, দেশের অভ্যন্তর থেকে স্বল্পসুদে তহবিল সংগ্রহের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। এছাড়া আগে সংগৃহীত মেয়াদি আমানত পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল জোগানোর জন্য বিদেশ থেকে স্বল্পসুদে তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে তারা। অবশ্য বিদেশি মুদ্রায় এই বন্ড ছাড়ার বিষয়ে গত মার্চে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের মতামত চেয়ে আইসিবি চিঠি পাঠালেও এখন পর্যন্ত ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। চিঠিতে আইসিবি জানায়, ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে পুঁজিবাজারে অব্যাহত মন্দাভাব বিরাজ করায় বাজারের ওপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল আইসিবির আর্থিক সক্ষমতা অনেকাংশে কমে গেছে।
জানা গেছে, বর্তমানে তারল্য সংকটে রয়েছে পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগের এই প্রতিষ্ঠানটি। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধের চাপ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির ওপর। ২০১৭ সালের পর মেয়াদি আমানতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একক গ্রাহক ঋণসীমার কারণে আমানত সংগ্রহের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। নতুন করে বিনিয়োগ করতে তহবিল জরুরি হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সুকুক ছেড়ে অর্থ সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এর আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে স্বল্পমেয়াদি আমানতের ওপর আইসিবির নির্ভরশীলতা কমাতে ২ হাজার কোটি টাকার সাব-অর্ডিনেট বন্ড ইস্যু করে।
এ বিষয়ে আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক সুকুক ছেড়ে আমরা এক হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই তহবিলের অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ হবে এবং এই বিনিয়োগ থেকে যে মুনাফা হবে তার ৭৫ শতাংশ বন্ডহোল্ডারদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। মেয়াদ শেষে এই বন্ডের পুরো অর্থ বন্ডহোল্ডারদের ফেরত দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে মেয়াদ শেষে বন্ডহোল্ডাররা তাদের বিনিয়োগের বেশি কিংবা কম অর্থ ফেরত পেতে পারেন। যেহেতু তহবিল ব্যবস্থাপনায় আইসিবির দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা রয়েছে, সেক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের ভালো মুনাফা পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
সুকুকের পাশাপাশি বিদেশি মুদ্রায় বন্ড ছাড়ার প্রক্রিয়াও চালু রয়েছে বলে জানান আইসিবি এমডি।