বিচারফলের জ্ঞানকাণ্ড

(দ্বিতীয় কিস্তির পর)

জ্ঞান বাবু ফরিদপুরের কোটালীপাড়ার চালিকাবাড়ির বাপ-দাদা চৌদ্দপুরুষের বাড়ি থেকে গিয়ে ভারতে ছিলেন পাকিস্তান আমলে, ফিরে আসেন ১৯৭২-এ স্বাধীন বাংলাদেশে এবং ১৯৭৭-এর ২৬ এপ্রিল মুন্সেফি পেয়ে ১৯৭৮-এর ৩০ এপ্রিল ছাঁটাই হন বিনা নোটিসে। স্বীকৃত এইটুকু ঘটনার মামলাটিতে বিরোধ দেখি পয়েন্টে পয়েন্টে, জট লেগে আছে গিঁটে গিঁটে। বিরোধের সব জট একে একে ছুটিয়ে তবেই তো পৌঁছানো যাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে, বলা যাবে তার ছাঁটাইয়ের আদেশটা বেআইনি, বে-এখতিয়ারি, অবৈধ-বাতিল কি না। তারপরে হবে তার মুন্সেফি বহাল-ই আছে বলে বকেয়া বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা, জ্যেষ্ঠতা সব দিয়ে তাকে চাকরিতে ফিরিয়ে নিতে আইন মন্ত্রণালয়সমেত বিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে ডিক্রি দেওয়া যাবে কি না। মামলার কোথায় কোন বিরোধের জট বেঁধে আছে তা আগেই ধরে তার ওপরেই হয় সাক্ষীসাবুত। আদালতি ভাষায় ইস্যু (বিচার্য বিষয়) বলা হয় এসব বিরোধের জটকে।

এ-মামলায় দেখি ১ নম্বর জট : জ্ঞান বাবু ভারতের নাকি বাংলাদেশের নাগরিক? ২ নম্বর জট : জ্ঞান বাবু ভারতে থাকার সময়টাতেও কি তার চালিকাবাড়ির স্থায়ী নিবাসী ছিলেন? ৩ নম্বর জট : জ্ঞান বাবু কি সত্য গোপন করেছিলেন মুন্সেফি পেতে? ৪ নম্বর জট : জ্ঞান বাবুকে নিয়োগ দেওয়া মুন্সেফ পদটা কি অস্থায়ী ছিল? ৫ নম্বর জট : বিনা নোটিসে জ্ঞান বাবুকে ছাঁটাই (টারমিনেট) আদেশটা কি সংবিধান ও ন্যায়বিচারের নীতিতে (প্রিন্সিপলস অব ন্যাচারাল জাস্টিস) খাটে? ৬ নম্বর জট : নিয়োগপত্রের শর্তে উল্লেখ ছিল বলেই কি জ্ঞান বাবুকে ছাঁটাই করা চলে বিনা নোটিসেই? ৭ নম্বর জট : জ্ঞান বাবুকে বিনা নোটিসে ছাঁটাইটা কি ছিল রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে? 

১ নম্বর আর ২ নম্বর জট ছুটানো যাক আগে : জ্ঞান বাবুর ভারতে চলে যাওয়া আর ১৯৭২-এ ফিরে আসার ঘটনায় গোল নেই দুপক্ষে, যদিও মামলাটা বেধেছে তার ফিরে আসাতেই। না ফিরে থেকে গেলে মুন্সেফিটাও জুটত না, ছাঁটাইয়ের বালাইও ঘটত না। নাগরিকত্ব আইনের কচকচানি হবে পরে, আগে রাষ্ট্রের কল, সরকারের কাঠি কিছু দেখি : ভারতে চলে যাওয়ায় জ্ঞান বাবুর জাতে হাত না পড়লেও পেটে লাথি পড়েছে নাগরিকত্ব গেছে বলে তার মুন্সেফি যাওয়াতে। আইন মন্ত্রণালয় কাজটা করেছে পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্টের সূত্রে। তথ্যটা পাওয়া গেল তলব দিয়ে আনা আইন মন্ত্রণালয়ের ছাঁটাইয়ের নথিতে। আইন মন্ত্রণালয়ের ৩ ডিসেম্বর ১৯৭৮-এর চাহিদার সূত্রে পুলিশের স্পেশাল ব্র্যাঞ্চ (এসবি) ভেরিফিকেশন রিপোর্ট দেয় ১১ মার্চ ১৯৭৮-এ। তাতে লেখা দেখি : ১৯৫৩-তে বাবা মারা গেলে ঘরবাড়ি, জমিজিরাত সব বিক্রি করে ভাইকে নিয়ে জ্ঞান বাবু ভারতে যান চিরতরে; ১৯৭২-এ বাংলাদেশে ঢোকেন অবৈধ পথে (বিনা পাসপোর্টে বুঝাচ্ছে); ১৯৭১-এর ২৫ মার্চে তিনি বাংলাদেশের স্থায়ী অধিবাসী ছিলেন না বিধায় পিও ১৪৯/১৯৭২ [‘বাংলাদেশ সিটিজেনশিপ (টেম্পরারি প্রভিশনস) অর্ডার, ১৯৭২] বিধানে আর বাংলাদেশের নাগরিক নন, হয়ে গেছেন ভারতীয় নাগরিক।

সেই রিপোর্টে পরের বছরেই গোয়ালন্দ ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে পুলিশের করা ১৯২/১৯৭৯ নম্বর জিআর (থানায় এজাহার দায়ের হওয়া) মামলার চার্জশিট আর ১৯৮০-র ১৯ ডিসেম্বরের আদেশের কপির দালিলিক প্রমাণ পেশ করেন জ্ঞান বাবু। তাতে দেখি : জ্ঞান বাবুকে পুলিশ বাংলাদেশি নাগরিক বলে উল্লেখ করে বিনা পাসপোর্টে ভারতে যাওয়া-আসার দায়ে ১৯৫২ সালের ‘বাংলাদেশ কন্ট্রোল অ্যান্ড এন্টি অ্যাক্ট’-এ মামলা করে চার্জশিট দিয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেট বাহাদুর ২৫ টাকা জরিমানা করেন বাংলাদেশি নাগরিক জ্ঞান বাবুকে দোষী সাব্যস্ত করে। ১৯৭৮-এ ভেরিফিকেশনে পুলিশের গোপন রিপোর্টের ভারতীয় নাগরিক জ্ঞান বাবু ১৯৭৯ সালেই জিআর মামলার চার্জশিটে পুলিশের প্রকাশ্য রিপোর্টে হয়ে গেল বাংলাদেশি নাগরিক! নতুন করে নাগরিকত্ব তো গ্রহণ করেননি তিনি। আপিল না করে রায় মেনেও নিয়েছে সরকার। তবুও তার মুন্সেফি ফেরত পাওয়া মানতে আপত্তি প্রবল রাষ্ট্রের সরকারের!

জ্ঞান বাবু দেখি পাসপোর্টও পেয়েছেন একখানা। ভারতীয় নয়, রীতিমতো বাংলাদেশি। দালিলিক প্রমাণও দাখিল করেন আদালতে। দেখি : ১৯৮৮ সালে তাকে পাসপোর্টটা দেওয়া হয়েছে, ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত নবায়নও হয়ে আছে। সেই পাসপোর্টে ভিসা লাগিয়ে ভারতেই গেছেন ১৯৮৮, ১৯৯১, ১৯৯২ সালে। ১৯৭৮-এ মুন্সেফি খাওয়ার ১০ বছর পরে ১৯৮৮ সালে পাসপোর্টের ভেরিফিকেশন রিপোর্টে তাকে আবার বাংলাদেশি নাগরিক বলছে রাষ্ট্রেরই পুলিশে। জ্ঞান বাবু দেখি ভোটারও বটে। ভারতের নয়, রীতিমতো বাংলাদেশের। ১৯৭৩, ১৯৭৬, ১৯৯০ সালের ভোটার তালিকার দালিলিক প্রমাণ দাখিল করেন আদালতে। রাষ্ট্রের নির্বাচন কমিশন তাকে বাংলাদেশি নাগরিক বলে মেনে নিয়ে বসে আছে প্রথমে সেই ১৯৭৩ সালে, পরে মুন্সেফি খাওয়া সামরিক সরকারের শুরুর দিকে ১৯৭৬ সালে, আর মুন্সেফি ফেরত পাওয়া মানতে নারাজ নির্বাচনে জেতা সরকারের ১৯৯০ সালে। জ্ঞান বাবুর ভোটটা দরকারি শুধু, মুন্সেফিটা ফেরত দেওয়ার নয় মোটে! যাকে খুশি তাকে ভোট দিতে পেরেছিলেন কি না, নিজের ভোট নিজে দিয়েছেন নাকি দিয়ে গেছে অন্যে, দিয়েছেন কি রাতে না দিনে, এসব জট ছিল না এ-মামলাতে।   

দেখি : জ্ঞান বাবু দিব্যি ওকালতি করছেন ফরিদপুরে। ওকালতি করতে তো বার কাউন্সিলের সনদ লাগে। সনদ পাওয়ার দালিলিক প্রমাণও দাখিল করেছেন। সনদ পেয়েছিলেন মুন্সেফি পাওয়ারও আগে ১৯৭৭-এর জানুয়ারিতে। মুন্সেফি ছাঁটাই হলে ফিরে যান ওকালতি প্র্যাকটিসে। মুন্সেফিতে বহাল হতে না পারলেও বহাল আছেন ওকালতিতে। ভারতের নাগরিকও কি তবে বাংলাদেশে ওকালতি করতে পারে! ১৯৭২ সালের ‘বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনারস অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডারে [(অনুচ্ছেদ ২৭(১)] আইনজীবী হওয়ার প্রথম শর্তই (আগেও ছিল এখনো আছে), অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে। অ্যাটর্নি জেনারেল পদাধিকারবলে বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান [অনুচ্ছেদ ৬(২)]। ২০১২ সালের পর থেকে এর সচিব থাকেন সরকার মনোনীত জেলা জজ [অনুচ্ছেদ ৬এ], এনরোলমেন্ট কমিটিতে চেয়ারম্যান থাকেন প্রধান বিচারপতির মনোনীত আপিল বিভাগের বিচারপতি, দুজন সদস্যও থাকেন প্রধান বিচারপতির মনোনীত হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি [অনুচ্ছেদ ১১বি]। বার কাউন্সিল হলো রাষ্ট্রের আইনে গঠিত রাষ্ট্রীয় সংস্থা। সংযোগ মাধ্যম সেই আইন মন্ত্রণালয়। অ্যাডভোকেট জ্ঞান বাবু আর সাবেক মুন্সেফ জ্ঞান বাবু তো একই জন। একই জ্ঞান বাবু একই সময়ে অ্যাডভোকেট হলে নাগরিক, আর মুন্সেফ হলেই ভারতীয় নাগরিক! রাষ্ট্রের কি ভিন্ন দুটি মুখ! মুন্সেফেই যত দোষ! সমান করা হবে নাকি ওকালতিটাও ছুটিয়ে!

জ্ঞান বাবুর ভারতে যাওয়া আর ১৯৭২-এ ফিরে আসার ঘটনায় গোল নেই দুপক্ষে, এ-মামলায় গোল বেধেছে তার যাওয়ার সন তারিখে। ছাঁটাইকারী বিবাদী সরকারপক্ষের লিখিত জবাবের কথা, ১৯৫৩-তে বাবা মারা গেলে ঘরবাড়ি, জমিজিরাত সব বিক্রি করে ভাইকে নিয়ে জ্ঞান বাবু ভারতে চলে যান চিরতরে। ছাঁটাই হওয়া বাদী জ্ঞান বাবুর আরজির কথা, ১৯৬৪-তে সাম্প্রদায়িক গণ্ডগোলে প্রাণের দায়ে তিনি সাময়িক আশ্রয় নেন ভারতে। সরকারের সূত্র পুলিশ ভেরিফিকেশনের সেই গোপন রিপোর্ট, দালিলিক প্রমাণ পাওয়া গেছে তলব দিয়ে আনা আইন মন্ত্রণালয়ের সেই নথিতে। ১৯৫৩ সালে যেতে কে দেখেছে? কে দেখেছে? নাম নাই, সাক্ষীও নাই কোন গোপালে! সাক্ষীসাবুত উল্লেখ করা পুলিশের চার্জশিটের প্রকাশ্য রিপোর্টের লেখাই বিশ্বাসের নয় আদালতে সাক্ষী হাজির না করলে, বিশ্বাস হবে কি সূত্র গোপন রাখা শুধু ভেরিফিকেশন রিপোর্টের লেখা! বাদী জ্ঞান বাবু, পিডব্লিউ-১ জেরায় স্বীকার করলেন, ১৯৬৪ নয়, ১৯৬২-তে তিনি ভারতে গিয়ে ভর্তি হন ক্লাস সেভেনে। মামলায় তবে দুপক্ষেরই সত্যের সঙ্গে মিথ্যেরও মিশেল থাকে! ১৯৬৪ আর টিকছে না, দাঁড়াচ্ছে ১৯৬২-তে। কোটালীপাড়ার ভবানিপুর মৌজার গোটা তিনেক এসএ (স্টেট অ্যাকুইজিশন) খতিয়ানের দালিলিক প্রমাণ পেশ করেন বাদীপক্ষ। তাতে দেখি, জ্ঞান বাবুর নিজের নামে, বাবা-ভাইয়ের নামে বাড়ি, জমি, পুকুর রেকর্ড আছে জরিপে। এসএ জরিপ শুরুই হয় ১৯৫৬-তে। ১৯৫৩-তেই জ্ঞান বাবুরা বিক্রি করে চলে গেলে এসবের এসএ রেকর্ড হওয়ার কথা তো ক্রেতাদের নামে! কে কিনেছে? কে কিনেছে? নাম নাই, দলিল নাই, সাক্ষীও নাই কোন গোপালে!

(পরবর্তী অংশ আগামী কিস্তিতে)

লেখক অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক

moyeedislam@yahoo.com