ইউপি নির্বাচনে তৃণমূল আ.লীগে বিভক্তি বেড়েছে

ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে ক্রমান্বয়ে বাড়ছে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের হারের সংখ্যা। সর্বশেষ গত রবিবার চতুর্থ ধাপের নির্বাচনে ৭৯৬ ইউনিয়ন পরিষদের প্রায় অর্ধেকে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন। নির্বাচন কমিশন প্রকাশিত চতুর্থ ধাপের ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ ৫১ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং স্বতন্ত্র, জাপাসহ অন্যান্য দল ৪৮ দশমিক ৫১ শতাংশ ইউপিতে বিজয়ী হয়েছেন। এর আগে ২৮ নভেম্বর তৃতীয় ধাপের ৪৭ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ, ১১ নভেম্বর দ্বিতীয় ধাপে ৪৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ পদে পরাজিত হয়েছেন ক্ষমতাসীন দলটির প্রার্থীরা। তবে প্রথম ধাপে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা ৭৩ দশমিক ৪৮ শতাংশ ইউপিতে জয়ী হন।

এই অবস্থায় প্রকাশ্য বক্তব্যে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা এটাকে অবাধ সুষ্ঠু এবং গণতন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ বললেও ভেতরে ভেতরে অস্বস্তিতে রয়েছেন। তৃণমূল থেকে আসা সুপারিশ এবং মনোনয়ন বোর্ডের সুচিন্তিত মতামতের পরও দলীয় প্রার্থীদের এই হারে নতুন করে তৃণমূলে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘ইউপি নির্বাচনের এই হারের কারণ এক দিনের নয়। তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং কেন্দ্রের সঙ্গে দূরত্ব, রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার অভাব, মনোনয়ন বাণিজ্য এবং এমপিদের দৌরাত্ম্যের কারণেই এই পরিস্থিতি হয়েছে।’

আওয়ামী লীগের একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত তিন ধাপের ইউপি নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কেন্দ্র থেকে যাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে স্থানীয় নেতারা তাদের পক্ষে কাজ করেনি। তা ছাড়া প্রথম ধাপের নির্বাচনের পরেই এমপিরা দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের বিপক্ষে মতামত দিয়েছিলেন। তৃণমূলের দ্বন্দ্বের সেই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ইউপি নির্বাচনের ফলাফলে।’

ওই নেতার মতে, এই নির্বাচন এবং ফলাফলের মধ্য দিয়ে তৃণমূলে কোন্দল আরও প্রকট হলো।

আওয়ামী লীগের উপজেলা, জেলা ও কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকেরই অভিমত, দলের নির্দেশ উপেক্ষা করে যারা নির্বাচন করেছেন তারা তো আওয়ামী লীগের ভোটই পেয়েছেন। আবার দলীয় নির্দেশ উপেক্ষা করে তারা যে নির্বাচন করতে পেরেছেন তার পেছনে দলের প্রভাবশালীরা ছিলেন। এতে বোঝা গেল, তৃণমূলে স্থানীয় প্রভাব অনেক বেশি কাজ করে।

এখন প্রশ্ন হলোএই এত এত বিদ্রোহী প্রার্থীকে বহিষ্কার করা যেমন ঝুঁকি তেমনি আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে তৃণমূলের নতুন এই কোন্দল, বিভক্তি এবং এর পেছনের প্রভাবশালীদের শৃঙ্খলার মধ্যে আনতেও অনেক ঝক্কি সামলাতে হবে।

আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা বলেছেন, ‘বিদ্রোহী প্রার্থীদের জয়ের সংখ্যাটা এত বেশি হবে তা চিন্তা করতে পারেনি কেন্দ্র। সব সময়ই আওয়ামী লীগসহ বড় রাজনৈতিক দলগুলোতে ইউপি নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়। তবে বিজয়ী হওয়ার সংখ্যা কম হয়।’

দলীয় সূত্র জানিয়েছে, বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে তৃণমূল নেতৃত্ব কেন্দ্রকে বলেছিলেনটানা তিনবার দল ক্ষমতায় থাকার ফলে তৃণমূলে নেতৃত্বের আকাক্সক্ষা বেড়েছে। কেউ নির্বাচন করতে চাইলে করতে দেওয়াই ভালো। কারণ জিতে আসবে নৌকা প্রতীক। সবাই নৌকার পক্ষেই কাজ করবে। নির্বাচন প্রতিযোগিতামূলক হবে। কেন্দ্রে ভোটার আসবে।

রাজশাহী জেলার দুটি উপজেলা, পাবনা ও কুমিল্লার জেলার একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের আগে ইউপিতে এত বিদ্রোহী প্রার্থীর জয়ে দলের মধ্যে বিভক্তি আরও প্রকট হয়েছে। দলের চেইন অব কমান্ড যে ভেঙে পড়েছে তা এখন স্পষ্ট। দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বুঝতে পারছেন কেন্দ্রের সঙ্গে তৃণমূলের দূরত্ব কতটা বেড়েছে।’

তারা বলেন, ‘তৃণমূল মুখিয়ে আছে। দলীয় সভাপতি যদি তৃণমূলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তাহলে সব বেরিয়ে আসবে। এমপিরা কীভাবে স্থানীয় পর্যায়ে দলের ত্যাগী এবং গ্রহণযোগ্য নেতাদের বাদ দিয়ে পরিবারতন্ত্র কায়েম করছে।’

নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর উপজেলার পাঁচ ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে ভোটযুদ্ধের মাঠে প্রার্থী ছিলেন ২৯ জন। এর মধ্যে জামানত হারিয়েছেন নৌকা ও লাঙ্গল মার্কার প্রার্থীসহ ১৩ জন। সৈয়দপুরের খাতামধুপুর ইউনিয়ন নির্বাচনে হাসিনা বেগমকে ভোট পেয়েছেন মাত্র ৯৩টি। সেখানে তৃণমূল থেকে এক নম্বরে নাম পাঠানো হয় মুক্তিযোদ্ধার সন্তান মাসুদ রানা পাইলটের। তাকে মনোনয়ন না দিয়ে তালিকা তিন নম্বরে থাকা হাসিনা বেগমকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। একইভাবে সৈয়দপুরের চকরিয়ার চিরিঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মো. শাহ নেওয়াজ রুমেল। বিগত চার ধাপে সবচেয়ে কম ভোটের সর্বনিম্ন রেকর্ডও তার। চতুর্থ ধাপে নৌকা নিয়ে তিনি পেয়েছেন মাত্র ৬৭ ভোট। তার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। এটি বাংলাদেশে নৌকা প্রতীক নিয়ে সর্বনি¤œ ভোট পাওয়ার নতুন রেকর্ড।

সৈয়দপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোখছেদুল মোমিন বলেন, ‘মনোনয়ন সঠিক হয়নি বলেই তারা এত কম ভোট পেয়েছেন। এর জন্য যারা দায়ী তাদেরই প্রশ্ন করতে হবে।’ তার দাবি, এখানে নৌকার জনপ্রিয়তার সমস্যা নয়, সমস্যা মনোনয়নে।

চতুর্থ ধাপে নৌকার পরাজয় প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য আবদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি মনে করি স্বাধীন গণতন্ত্রের জন্য এই ফলাফল ইতিবাচক। স্থানীয় পর্যায়ের এই নির্বাচন অনেক বেশি অংশগ্রহণমূলক হয়েছে। দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। আবার অনেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছেন। বিরোধী দলের অনেকে বিশেষ করে বিএনপির অনেক প্রার্থীও নির্বাচন করেছে। নির্বাচনে সরকার বা নির্বাচন কমিশন কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করেনি।’

তিনি বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এর কোনো প্রভাব পড়বে না। কারণ বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্রদের বেশিরভাগই নৌকার লোক। যারা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কথা বলে তারা তো নির্বাচন করারই সাহস পায়নি। তারা আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। তবে দলীয় মনোনয়নের বাইরে যেন কেউ বিদ্রোহী না হয় সেজন্য আদর্শিক চর্চা বাড়াতে হবে। আমরা জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামছি।’

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম দেশ রূপান্তরকে  বলেন, দিনশেষে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আওয়ামী লীগের জয় হয়েছে। যারা নৌকা প্রতীকে ও স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করেছেন তাদের প্রায় সবাই আওয়ামী লীগের লোক। আর যারা (বিএনপির প্রতি ইঙ্গিত করে) নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন করে তাদের এই নির্বাচন থেকে বোঝা উচিত এবং নির্বাচন কমিশনকে ভালো নির্বাচন উপহার দেওয়ার জন্য সহযোগিতা করা উচিত।’

বিদ্রোহী প্রার্থীদের এই জয়ে দলীয় শৃঙ্খলা কতটা ভেঙে পড়েছে এবং দলের সিদ্ধান্ত যারা উপেক্ষা করেছে তাদের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এই প্রশ্নে বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘আমরা চাইনি দলীয় নির্দেশ উপেক্ষা করে কেউ প্রার্থী হোক। তবে তারা প্রার্থী হওয়াতে নির্বাচনটা অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক হয়েছে। আর স্থানীয় নির্বাচনে জাতীয় নির্বাচনের প্রভাব পড়বে না। কারণ এখানে স্থানীয় অনেক বিষয়-আশয় থাকে। তারপরও ইউপি নির্বাচনগুলো শেষ হলে আমরা বিশ্লেষণ করে কোথাও কোনো সমস্যা থাকলে সমাধান করব।’

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে দলটি এবার টুঙ্গিপাড়ায় ১০ জানুয়ারি থেকে ১২ জানুয়ারি তিন দিনের বড় কর্মসূচি পালন করবে। এরপর থেকেই আগামী নির্বাচন এবং দলের জাতীয় সম্মেলনকে ঘিরে সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করবে। এর সঙ্গে ইউপি নির্বাচন বা তার ফলাফলের কোনো বিষয় নেই।’

তিনি জানান, গত বছর থেকেই দলের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি গঠনের কাজ শুরু হয়েছে। এ ছাড়া তৃণমূলের যেখানে যেখানে দ্বন্দ্ব, বিভক্তি এবং সংকট রয়েছে সেখানে কেন্দ্রীয় নেতারা স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। 

নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য মতে, চার ধাপের ইউপি নির্বাচনের ফলাফলে ভোট হওয়া ইউনিয়ন পরিষদগুলোর ১ হাজার ৩৭৭টিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন। স্বতন্ত্ররা জিতেছেন ১ হাজার ২৪৯টিতে। স্বতন্ত্রভাবে জয়ী হওয়া প্রার্থীদের বেশিরভাগই সরকারি দলের বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ীদের যুক্ত করলে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের চেয়ে এখনো অনেক এগিয়ে ক্ষমতাসীন দল। চার ধাপে মোট ৩০০টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৯৭ জনই আওয়ামী লীগের ও তিনজন স্বতন্ত্র প্রার্থী। সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগ জিতেছে ১ হাজার ৬৭৪ ইউনিয়ন পরিষদে। অপরদিকে স্বতন্ত্ররা জয়ী হয়েছেন ১ হাজার ২৫২টিতে। অন্যান্য দলের মধ্যে জাতীয় পার্টি ৬টিতে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ দুটিতে, জাকের পার্টি একটিতে ও জাতীয় পার্টি-জেপি একটিতে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।

ইসি জানিয়েছে, প্রথম ধাপে ২১ জুন ও ২০ সেপ্টেম্বরের নির্বাচনে ৩৬৫টি ইউপির মধ্যে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা ২৬৯টিতে জয়ী হন। এর মধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৭২ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১৯৭টিতে জয়ী হন। অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হন ৮৮টি ইউপিতে। এ ছাড়া জাতীয় পার্টি তিনটি, জাতীয় পার্টি (জেপি) তিনটি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি একটি করে ইউপিতে জয়ী হয়। ১১ নভেম্বরের দ্বিতীয় ধাপের ৮৩৩টি ইউপির মধ্যে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন ৪৮৫টিতে। এর মধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৮১ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৪০৪ জন জয়ী হন। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন ৩৩০টিতে। এ ছাড়া এ ধাপে জাতীয় পার্টি ১০, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ চারটি এবং জাতীয় পার্টি (জেপি), খেলাফত মজলিস, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি একটি করে ইউপিতে জয়ী হয়েছে। ২৮ নভেম্বরের তৃতীয় ধাপের আওয়ামী লীগের ৫২৫ চেয়ারম্যানের মধ্যে ৯৯ জন বিনা ভোটের। আর স্বতন্ত্র ৪৪৬ জনের মধ্যে একজন বিনা ভোটের। এ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা ১৭ ইউপিতে চেয়ারম্যান হয়েছেন। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১, ওয়ার্কার্স পার্টি ১, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ১ ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ ১ ইউপিতে বিজয়ী হয়েছে। চতুর্থ ধাপে ৭৯৬ ইউপির ফলাফলে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছে ৩৯৬টিতে, স্বতন্ত্র ৩৯০, জাপা ৬, ইসলামী আন্দোলন ২, জাকের পাটিসহ অন্য একটি দল ২টিতে।