খালেদা জিয়ার বিদেশযাত্রা এখন প্রধানমন্ত্রীর হাতে

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে অনুমতি চেয়ে সরকারের কাছে তার পরিবারের করা আবেদনের ওপর আইন মন্ত্রণালয়ের দেওয়া মতামত পর্যালোচনা করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের মতামত দিয়ে সেটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পাঠাবে। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সাংবাদিকদের এ কথা জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা জানি সরকার অনুমতি দেবে না। তারপরও পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়েছিল। এখন চেয়ারপারসনের মুক্তি ও উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে আমরা যে আন্দোলনের মধ্যে আছি তা চলমান থাকবে। প্রয়োজনে সরকার পতনে এক দফা আন্দোলনে যাব আমরা।’

খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠাতে পরিবারের আবেদনের বিষয়ে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্ব^রাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আবেদনে আইনমন্ত্রী মতামত দিয়েছেন। আমরা তা স্টাডি করে দেখছি, অধিকতর পরামর্শ প্রয়োজন হলে আমরা  সেটাও নেব। এটা নিয়ে আরও কথা বলতে হবে। খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশ পাঠানোর আইনি কোনো সুযোগ নেই।’

তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার একটি চিঠি দিয়েছিলেন। আইনমন্ত্রী যেভাবে লিখেছেন, যেভাবে জানিয়েছেন, আইনগতভাবে এটার কোনো সুযোগ নেই। কোনো সুযোগই নেই। কাজেই আমাদের অবস্থানটা নিশ্চয়ই আপনারা বুঝছেন। আমরা এটা নিয়ে বসে আলোচনার মাধ্যমে পরবর্তী ব্যবস্থা নেব।’

আসাদুজ্জামান বলেন, যেহেতু অনুরূপ একটি আবেদন নিষ্পত্তি করে তাকে একবার সুবিধা দেওয়া হয়েছে, দ্বিতীয়বার তিনি আর এ সুবিধা পাবেন না। ফলে খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়ার অনুমতি দেওয়ার আইনগত সুযোগ নেই বলে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাদের আরও কিছু পর্যবেক্ষণ রয়েছে। এগুলো সম্পন্ন করে সেটা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে।’

এর আগে গত সোমবার নিজের দপ্তরে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘খালেদা জিয়ার ভাইয়ের আবেদনের বিষয়ে আইনি মতামত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ফাইলটি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠাবে।’

এ বিষয়ে খালেদা জিয়ার মেজো বোন সেলিমা ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার মানবিক হওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখছি না। বিষয়টি দুঃখজনক ও হতাশাজনক।’ তিনি বলেন, ‘আমার বোন সুস্থ অবস্থায় হেঁটে কারাগারে গেছেন। এখন চিকিৎসার অভাবে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। হুইল চেয়ারে তাকে মুভমেন্ট করতে হচ্ছে। এটা তো হওয়ার কথা ছিল না। আমরা তাকে সুস্থভাবে আমাদের মাঝে ফিরে পেতে চাই।’ 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, জেলা পর্যায়ের সমাবেশ শেষ করে তারা ঢাকায় একটি বড় ধরনের সমাবেশ করবেন। সমাবেশ থেকে সরকারকে আলটিমেটাম দেওয়া হবে। ধাপে ধাপে তারা কঠোর কর্মসূচিতে যাবেন এবং খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর অনুমতি দিতে সরকারকে বাধ্য করবেন। 

খালেদা জিয়ার সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে বিএনপি গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্য ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চেয়ারপারসনের শারীরিক অবস্থার কোনো উন্নতি নেই। তার হিমোগ্লোবিন কম। রক্তপাত আপাতত বন্ধ আছে। তবে তার অবস্থা আনপ্রেডিক্টেবল।’

দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত খালেদা জিয়াকে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে পাঠানো হয়। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটলে পরিবারের আবেদনে সরকার দন্ডের কার্যকারিতা স্থগিত করে গত বছর ২৫ মার্চ তাকে সাময়িক মুক্তি দেয়। এরপর গুলশানের বাসায় ফেরেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। পরে করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়ে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাও নেন। এ পর্যন্ত তার সাজা স্থগিতাদেশের মেয়াদ চার দফা বাড়ানো হয়েছে।

মুক্তির শর্তে বলা হয়েছে, খালেদা জিয়াকে তার গুলশানের বাসভবনে থাকতে হবে। তিনি বিদেশ যেতে বা বিদেশে চিকিৎসা নিতে যেতে পারবেন না। তবে দেশের ভেতরে যেকোনো হাসপাতালে তিনি চিকিৎসা নিতে পারবেন।

সর্বশেষ গত ১৩ নভেম্বর বিকেলে খালেদা জিয়াকে কিছু শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রথমে কেবিনে রাখা হলেও রাতেই তাকে আবার সিসিইউতে নেওয়া হয়। এরপর গত ২৬ নভেম্বর খালেদা জিয়ার গুলশানের বাসভবনে সংবাদ সম্মেলন করেন তার চিকিৎসার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান ডা. এফ এম সিদ্দিকী। তিনি জানান, বিএনপি  চেয়ারপারসনের লিভার সিরোসিস হয়েছে। এরপর তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়। ৭৬ বছর বয়সী খালেদা জিয়া বহু বছর ধরে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি, ফুসফুস, চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন।