সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমিয়ে আনায় এ খাতে বিনিয়োগ কিছুটা কমলেও এর ৯২ শতাংশ চলে যাচ্ছে মূল ও মুনাফা পরিশোধে। তবে এভাবে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমতে থাকলে মূল ও মুনাফা পরিশোধ করতে অন্য খাত থেকে টাকা জোগাড় করে এই ব্যয় নির্বাহ করতে হবে সরকারকে।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের হালনাগাদ করা প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত নভেম্বর মাসে সঞ্চয়পত্রে নতুন বিনিয়োগ এসেছে ৮ হাজার ৯৪১ কোটি টাকা। ওই মাসে মেয়াদপূর্তি হওয়া পুরনো সঞ্চয়পত্রের মূল ফেরত ও মুনাফা পরিশোধে সরকার ব্যয় করে ৮ হাজার ২৪০ কোটি টাকা। ফলে নিট ঋণ দাঁড়ায় ৭০১ কোটি টাকা।
অর্থাৎ নিট ঋণ কম হলেও সরকারকে বর্তমানে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রে ভবিষ্যতে মুনাফা পরিশোধে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হবে। তাছাড়া নতুন সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমতে থাকলে নিট ঋণ ২০২০ সালের মতো আবারও ঋণাত্মক ধারায় চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে অতীতের মতো সরকারকে বাজেটের একটি বড় অংশ বরাদ্দ রাখতে হবে সুদব্যয় খাতে। ওই বছর এপ্রিল মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে সরকার যে পরিমাণ ঋণ পায় তার থেকে ৬২১ কোটি টাকা বেশি মূল ও মুনাফা পরিশোধে খরচ করে।
প্রাপ্ত তথ্যে আরও দেখা যায়, গত অক্টোবরে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ হয়েছিল ৭৬৬ কোটি টাকা। ওই মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে পাওয়া ঋণের ৯১ শতাংশ মূল ও মুনাফা পরিশোধে ব্যয় করে সরকার। গত অক্টোবরে সঞ্চয়পত্রে মোট বিনিয়োগ আসে ৮ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা। ওই মাসে মূল ও মুনাফা পরিশোধে ৭ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা ব্যয় করে সরকার।
এদিকে গত সেপ্টেম্বর মাসে সঞ্চয়পত্রে অধিক হারে বিনিয়োগের ওপর তুলনামূলক কম মুনাফা চালু করার পর সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগেও ধস নামে। পরের মাস অক্টোবরেই মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে ২৩ শতাংশ। সেপেম্বরের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, নভেম্বরে সঞ্চয়পত্রে মোট বিনিয়োগ কমেছে ২১ শতাংশ।
প্রাপ্ত তথ্যে আরও দেখা যায়, মুনাফা কমানোর আগে গত সেপ্টেম্বরে সঞ্চয়পত্রে মোট বিনিয়োগ আসে ১১ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা। ওই মাসে ৮ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা মূল-মুনাফা পরিশোধের পর সরকারের নিট ঋণ দাঁড়ায় ২ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। ওই মাসে মোট বিক্রির ৭৫ শতাংশ অর্থ সরকারের ব্যয় হতো মূল-মুনাফা পরিশোধে।
এরও আগের মাস আগস্টে ৯ হাজার ৮৯১ কোটি টাকার বিনিয়োগ আসে সঞ্চয়পত্রে। এর ৬৩ শতাংশ অর্থ সরকার ব্যয় করে মূল ও মুনাফা পরিশোধে। নিট ঋণ দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা।
জুলাই মাসে সঞ্চয়পত্রে মোট বিনিয়োগ আসে ৫ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ ব্যয় হয় মূল ও মুনাফা পরিশোধে। ফলে ওই মাসে সরকারের নিট ঋণ আসে ২ হাজার ১০৪ কোটি টাকা।
সবমিলিয়ে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) সঞ্চয়পত্রে মোট বিনিয়োগ আসে ৪৪ হাজার ২৭০ কোটি টাকা। এর ৭৭ শতাংশ অর্থ সরকার ব্যয় করেছে মূল ও মুনাফা পরিশোধে। ফলে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়ায় ১০ হাজার ২৫ কোটি টাকা।
এ নিয়ে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের পুঞ্জীভূত নিট ঋণ বেড়ে ৩ লাখ ৫৪ হাজার ১২০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
সঞ্চয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সঞ্চয়পত্রে একক গ্রাহকের বিনিয়োগ কমিয়ে আনতে একের পর এক নানা শর্ত জুড়ে দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে গত সেপ্টেম্বরে ১৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে সুদহার ২ শতাংশ কমানো হয়েছে। আবার ঘোষণার বাইরে সঞ্চয়পত্র থাকলে জেল-জরিমানার বিধান করা হয়েছে। এ কারণে সঞ্চয়পত্র বিনিয়োগ কমে আসছে।
বাজেট ঘাটতি মেটাতে চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার নিট ৩২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছে। প্রথম ৫ মাসে অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার ৩১ শতাংশ ঋণ নিয়েছে সরকার।
বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরের পুরো সময়ে (জুলাই-জুন) সঞ্চয়পত্র থেকে ৪১ হাজার ৯৫৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকা নিট ঋণ নেয় সরকার। যেখানে গত অর্থবছরে মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ছিল ২০ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছরের শেষ দিকে এ খাতের ঋণ বেড়ে যাওয়ায় সংশোধিত বাজেটে এই লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৩০ হাজার ৩০২ কোটি টাকা করা হয়।
গত দুই অর্থবছর থেকে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ ও এর ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে সরকার। চলতি বাজেটে ২ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র বা পোস্টাল সেভিংস কিনতে হলে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ছাড়া পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র মিলবে শুধু সঞ্চয় অধিদপ্তরে।
সবশেষ গত ২১ সেপ্টেম্বর সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারি করে। সঞ্চয়পত্রে ১৫ লাখ টাকার ওপরে বিনিয়োগের মুনাফার হার ২ শতাংশ পর্যন্ত কমানো হয়েছে। তবে ১৫ লাখ টাকার নিচে মুনাফার হার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।