‘যে খোঁজে আপন ঘরে’ পয়লা পড়েছিলাম আজ থেকে তেত্রিশ বছর আগে। চাইলে সন তারিখ মিলিয়ে নেওয়ার সুযোগ আছে। সে সময়ে প্রায় সপ্তাহখানেকের জন্য কক্সবাজারে। একটি বইমেলা হচ্ছিল। স্টলে দাঁড়িয়েই পড়েছিলাম হুমায়ূন আহমেদের এলেবেলে। একটু কৌতুকপূর্ণ রম্যলেখার সংকলন। লেখাগুলো এর আগে ‘উন্মাদে’ বেরিয়েছে। আমাদের শহরের লাইব্রেরিতে নিয়মিত ‘উন্মাদ’ আসত, আমরা বড়দের পড়ার ফাঁকে ওটার পাঠক। ওই ছিল খেলার মাঠের বাইরে আমাদের তখনকার বিনোদন। বইপড়া, বুঝি আর না বুঝি আমাদের কাছে তখনো কিংবা এখনো, কোনোদিনও খুব বিনোদনে পরিণত হয়নি, সে তুলনায় ওই লাইব্রেরিতে পুরনো ‘উন্মাদ’ পত্রিকা খোঁজা কিংবা নতুনটা পড়ার সুযোগ পাওয়া ছিল বিনোদন!
সেই বইমেলাতেই এক কোণে কয়েকটি রুশ বই। স্টলটি সম্ভবত চট্টগ্রামের মনীষার। তখন পর্যন্ত রুশ লেখক বলতে গোর্কিকে চিনি, আর স্কুলে শিক্ষকদের কাছ থেকে শোনা রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে উচ্চারিত নাম তলস্তয়। একখানা ‘মা’ আর দুখন্ড ‘রুশ গল্প সংকলন’ কিনেছিলাম, অন্য বইয়ের তুলনায় সস্তায়। জানা হলো পুশকিন গোগল তুর্গেনেভের আর চেখভের অমর নাম। এই-যে এ কথা প্রায় দিন তারিখ মিলিয়ে বলার বাহাদুরি, এর কারণ সে সময়ের অনেক কিছু খোয়ালেও ওই ‘রুশ গল্প সংকলনে’র খন্ড দুটো আজও বহাল। সেখানে চেখভের গল্পের নাম ‘সাহিত্যের শিক্ষক’, ওই গল্পটি পরে তার আরও কোনো বাংলা বা ইংরেজি সংকলনে দেখিনি, হয়তো গল্পসমগ্রে আছে। তলস্তয়ের ‘বল-নাচের পর’ কখনো ভোলার নয়, অসাধারণ! এমন শোনাল যেন তলস্তয়ের কোনো গল্প যে অসাধারণ তা আমার এই শংসাপত্রের ওপর নির্ভরশীল। বিষয়টা বরং একেবারে উলটো। ‘বল-নাচের পর’ পড়ার পরে, সেই একাদশ শ্রেণির বয়েসে পড়া অন্য বহু গল্প একেবারে পানসে লেগেছিল। ওই জোড়া বইয়ের পুস্তানিতে তারিখ লিখেছিলাম, ৫ নভেম্বর ’৮৮, কক্সবাজার। তাই, ‘যে খোঁজে আপন ঘরে’ প্রথম কবে পড়েছি, তা এখন একেবারে সন তারিখসহ বলে দেওয়া সম্ভব। এ জন্য গলায় বেশ জোর দিয়ে বিষয়টি কবুল করে নেওয়া।
কিন্তু, দ্বিতীয়বার ‘যে খোঁজে আপন ঘরে’ পড়বার প্রশ্নটাই-বা এখানে উঠছে কোন যুক্তিতে। কী দরকার? সেদিনও কোনো প্রয়োজনই-বা ছিল। এ প্রশ্ন নিজের জন্য তোলা প্রশ্ন। এইসঙ্গে বলা উচিত, ওই রুশ গল্পের সংকলন দুটো তখন পড়িনি। পড়েছি কক্সবাজার থেকে বাড়ি ফেরার পরে। কক্সবাজারে উঠেছিলাম মামার অফিসার্স মেসে। মামার পাশের রুমটা আমার জন্য বরাদ্দ। টেবিলে অফিসের কাগজপত্রের সঙ্গে কয়েকটি পুরনো পূজা সংখ্যা। লেখকদের ভেতরে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পরিচিত। ইতিপূর্বে তাদের কিশোর উপযোগী লেখাপত্তর পড়েছি। একটি পূজা সংখ্যায় শীর্ষেন্দুর ‘আদম ইভ ও অন্ধকার’। আর-একটায় সুনীলের ‘জয়াপীড়’, বিমল করের ‘গ্রন্থি’। সেই প্রথম বিমল করের লেখা পড়া। মা ও যুবক ছেলের সম্পর্কের সেই টানাপড়েন কোনো দিনও বিস্মৃত হওয়া যাবে না। পরে কোথাও যে পড়েছিলাম, এটি সত্যি ঘটনা, এক প্রখ্যাত অভিনেত্রীর ব্যক্তিজীবন নিয়ে। বিমল কর সরল আখ্যানে এমনভাবে লিখেছিলেন যে, এখনো কোনো কোনো দৃশ্য মনে করতে পারি। এরপরই ওই সংখ্যায় পর-পর দুটো উপন্যাস পড়েছিলাম। কোনটি আগে আর কোনটি পরে সেকথা মনে নেই। তবে দুজন লেখকই তখন আমার কাছে অপরিচিত। রমাপদ চৌধুরীর ‘বাড়ি বদলে যায়’। যে সংকট বোঝার বয়েস তখনো হয়নি, রমাপদ মধ্যবিত্তের গার্হস্থ্য জীবনের নাগরিক সংকটের ভেতর দিয়ে তা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। কলকাতা নগরী তখন ব্যক্তিজীবনে ওই সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল। ও লেখা স্মৃতিবাহী হয়ে যায়। আর ‘দেশ’ পত্রিকায় নিয়মিত চোখ রাখার কারণে কিছুদিন পরে জানতে পারি এই উপন্যাসটি সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পেয়েছে।
বাকি রইল, কালকূটের ‘যে খোঁজে আপন ঘরে’। কালকূট যে সমরেশ বসু, তা তখন জানি না। জানলে লেখককে পরিচিত মনে হতো। সমরেশ বসুর ‘গোগল চিক্কুস নাগাল্যান্ডে’ ও ‘বিদেশী গাড়িতে বিপদ’ নামের দুটো বই লাইব্রেরি থেকে পড়েছি। বাংলাদেশের পেপারব্যাক। হুমায়ূন আহমেদের ‘দেবী’ আর ‘নিশিথিনী’ও একই ধরনে বেরিয়েছিল। প্রকাশক অবসর। কিন্তু কালকূট? লেখক যে এ বছরের গোড়ার দিকে প্রয়াত হয়েছেন তাও জানি না। সমরেশ বসুর খবর বড় ভাইদের মুখে শুনতে পেয়েছি।
কিন্তু সেই অখ- অবসরে ‘বাড়ি বদলে যায়’ পড়া হয়ে গেলে, নগর কলকাতা থেকে ‘যে খোঁজে আপন ঘরে’র কাহিনীর দূরবর্তী টান, প্রায় ভ্রমণাখ্যানের গড়নে ওই লেখা, পড়তে শুরু করতেই চোখের আপন গতিতে চলতে লাগল। লেখক শীতে ইস্টিমারের ওপরের ডেকে বসেছেন, সেখানে ভীষণ বাতাস, গায়ে চাদর পেঁচিয়েও কোনোভাবেই শীত আটকাতে পারছেন না। আমি পড়ছি হেমন্তে। হিমালয়ের ঠান্ডা বাতাস তখন আসার কোনো সুযোগ নেই। সাগরতীরের কক্সবাজারে তাপ আরও বেশি। কিন্তু বাতাস, ঝাউগাছগুলোয় দিনের বেলায়ও শব্দ হয়, সারাটা শহর পর্যটকবিরল। ওই অফিসার্স মেসের দক্ষিণের জানালায় দাঁড়ালে সমুদ্র একেবারে সামনে দেখা যায়। ফলে, ওই শীতের আবহ সেখানে বয়ে না-এলেও বাতাসের মিল যেন মিশে যাচ্ছিল।
কালকূটের পাঠকমাত্রই জানেন, সে কাহিনী উত্তমপুরুষে। কোথাও কোথাও সমরেশ বসু অথবা লেখক কালকূট আত্মপরিচয়সহ হাজির হন। যদিও তা তার পুরোপুরি উন্মোচন হয়তো নয়, তবে আংশিক। সেসব কিছুই তখন বুঝি না। স্রেফ লেখকের সঙ্গে পশ্চিম দিনাজপুর থেকে বাংলার সীমানায় পূর্ণিয়ার দিক ধরে সক্রিগলি ঘাটে নেমে আসা। জলপাইগুড়ি কোচবিহার শিলিগুড়ি নকশালবাড়ি এসবও ভূগোলসমেত জানা নেই কোনটা ওপরে কোনটা নিচে। শুধু লেখকের সঙ্গে বেরিয়ে বেড়ানো। তিনি এরপর বীরভূমের দিকে আসবেন কলকাতার দিকে না-গিয়ে। স্টিমারে ওঠার পরে মূল কাহিনীর শুরু, যদি সেই দিক ধরে এগোই, তাহলে মাঝখানের নদী পার হলে কলকাতা খাড়া দক্ষিণে আর পশ্চিম মুখে বীরভূম। স্টিমারে কালকূটের সঙ্গে দেখা বরদাকান্ত মজুমদারের, তিনি উত্তরবঙ্গের বিশেষ সম্মানিত মানুষ। পরস্পরের কথায় কালকূট তা জানালেন। বরদাকান্তের সঙ্গে এক নারী, নাম লছমী। যেন লছমী নিজের ঘরের সন্ধান পায়, এটি লেখকের অভীষ্ট। অথবা, কালকূট নিজেও ঘরে খুঁজে ফেরেন।
এসব সেদিনের পাঠের স্মৃতি থেকে উদ্ধার নয়। শুধু আড়াই যুগ ধরে মনে থাকে ওই সতেরো বছরের লছমীকে, যে শ্বশুর-শাশুড়ির কাছ থেকে মহানগর কলকাতায় স্বামীর কাছে যাওয়ার জন্য বেরিয়েছে, নিয়েছে প্রবীণ বরদাকান্তের সঙ্গ। অথবা আত্মীয়স্বজন লছমীকে তার সঙ্গে দিয়েছে। লছমী চলছে। ওইটুকু ছোট মানুষের বুকে অনেক অভিমান। লছমী বাঙালি নয়, অবাঙালি ব্রাহ্মণী; হয়তো মৈথিলি, বাংলার সীমানার। যখন বরদাকান্ত তাকে জানিয়েছেন এই লোকটি লেখক, লেখক লছমী বোঝে না, তার কাছে কলাকার। তো এই বাঙালি কলাকারবাবু কী লেখা করে তা লছমীকে শোনাতে হয়। বিদ্যাপতির কোনো পদও। কিন্তু তাতে ওই লছমীর ভেতরকার দুঃখ ঘোচে না কোনোভাবে। কালকূটের সঙ্গে পথে দেখা হয়ে যাওয়া এসব নারীর মিলও খুঁজে পাওয়া যায়, যদি আগের কাহিনীগুলো পড়া থাকে। কিন্তু আমার তো সেই প্রথম পড়া, ফলে ওই লছমীর আদলের সঙ্গে কিংবা লছমীকে লেখক যেভাবে এক আলো-আঁধারির খেলায় নির্মিতি দিচ্ছেন সেই প্রকাশ্য দিবালোকে, সেই বিষয়টি ভালো না লাগার কোনো কারণ ছিল না। তাছাড়া লছমী আর আমার বয়স একই। শুধু স্মৃতি থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিল লেখাটির শেষে কী হলো, কী হয়েছিল।
পরে, গ্রন্থকারে ‘যে খোঁজে আপন ঘরে’ নামের ছোট্ট উপন্যাসটি দেখেছি শাহবাগের বইয়ের দোকানে। পড়িনি আর। একসময়ে, বেশির ভাগ পাতলা উপন্যাসের ভাগ্যে যা হয়, হয় হারিয়ে যায় অথবা রচনাবলিতে জায়গা পায়, একক উপন্যাসগ্রন্থ হিসেবে বইগুলো কমই টিকে থাকতে পারে। ‘যে খোঁজে আপন ঘরে’রও তাই হয়েছিল। এ এক অনিবার্য পরিণতি। কিন্তু আমাকে বহুকাল পরে, ওই বইয়ের দিকে তাকাতে বাধ্য করেছে লছমী। কারণ, কাহিনীর শেষে লছমীর কী হয়েছিল, কীভাবে ওই কাহিনী কালকূট শেষ করেছিলেন, তা কোনোভাবেই স্মরণে আসছিল না। আর-একটি কারণ, এই সময়ের ভেতরে পড়া হয়ে গিয়েছে প্রধান সব কালকূটকাহিনী। যথা : ‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’, ‘নির্জন সৈকতে’, ‘কোথায় পাবো তারে’, ‘অমৃত বিষের পাত্রে’, ‘ধ্যান জ্ঞান প্রেম’ অথবা ‘মুক্তবেণীর উজানে’ অথবা ‘চল মন রূপনগরে’। মোটামুটি এগুলো কালকূট স্বাক্ষরে তার প্রধান রচনা; মহাভারত-অন্তর্গত ‘শাম্ব’, ‘পৃথা’ আর ‘যুদ্ধের শেষ সেনাপতি’কে পাশে সরিয়ে রাখছি। ফলে, প্রায় প্রতিটি কাহিনীতেই, সেখানকার প্রধান অথবা অপ্রধান নারীদের যেভাবে উপস্থিতি, স্মৃতি হয়তো বলতে চাইছিল এখানেও তাই ঘটেছে, যা প্রায় কালকূটের জন্য স্বাভাবিক।
ভাবনার কাছাকাছি দিয়ে গেলেও, বিষয়টা তো কাছাকাছি নয়, আবার খানিকটা কাছাকাছিই হয়তো। ওই মজুমদারমশায় কিংবা বরদাকান্তজি কাহিনীর শেষে কালকূটকে জানায়, লছমীর স্বামীর জেল হয়েছে। ভেবেছিলাম যে আশ্রমে বা আখড়ায় এখন তারা উঠেছেন, সেখান থেকে কালকূটের বাড়ির দিকে অথবা অন্যত্র পা বাড়ানোর মধ্য দিয়ে এই কাহিনী শেষ হয়েছিল, লছমী ব্যাকুলভাবে তার দিকে তাকিয়ে থাকবে। তা নয়, ওই তিনজনের একত্রে থাকার ভেতরে, হঠাৎ লছমী একটু সরে গেলে বরদাকান্ত লছমীর জীবনের বিপর্যয়ের কথা বলেছিলেন।
আর একটি বিষয়। এই কাহিনীর একেবারে শুরুতেই। সেখানে আছে কলকাতায় এমএ-পড়ুয়া দেবেশ রায়ের কথা। গল্পলেখক হিসেবে দেশ পত্রিকায় কবে থেকে তার উপস্থিতি, তা-সহ। কালকূট প্রথম দার্জিলিং জলপাইগুড়ির দিকে গিয়েছিলেন তার আমন্ত্রণে। প্রথমবার ‘যে খোঁজে আপন ঘরে’ পড়ার সময়ে দেবেশ রায় নামের কোনো লেখককে চিনতাম না। কালকূটের কাহিনীতে এমন সরাসরি পরিচয় প্রায় বিরল। অন্য দুটো কাহিনীতে অবশ্য নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় আর জহির রায়হানের উল্লেখ আছে।
লেখক কথাসাহিত্যিক
prasantamridha@gmail.com