শিক্ষার্থীদের শুধু বকাঝকা না করে তাদের মন বোঝার ওপর গুরুত্ব দিতে শিক্ষকদের পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে আমাদের দেশের শিক্ষক-অভিভাবকদের অনেকেই সচেতন নন।’
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এই ফল প্রকাশ এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের বই বিতরণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রত্যেকটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্তত শিক্ষার্থীদের একটা পরীক্ষা নেওয়া দরকার মানসিক বিশেষজ্ঞদের দিয়ে, যে কার ভেতরে কী ধরনের সমস্যা আছে। শুধু ধমক-ধামক দেওয়া না বা তাদের বকাঝকা না, তাদের অবস্থাটা বুঝে তাদের সঙ্গে সেভাবেই আচরণ করতে হবে। এটা বাবা, মা, শিক্ষক বা বন্ধু-বান্ধব সবাইকেই বিষয়টায় সচেতন হতে হবে।’
শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে সরকার প্রধান বলেন, ‘পাঠ্যপুস্তকের একগাদা পথে যে শিক্ষা, সেই শিক্ষা না, শিক্ষাটা পরিবেশ সম্পর্কে, শিক্ষাটা মানসিকতা সম্পর্কে, সবার সঙ্গে চলার একটা শিক্ষা সবাইকে দিতে হবে। সেভাবেই সবাইকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমি অনুরোধ জানাচ্ছি।’ ছোটবেলা থেকে শিশুদের সব কাজকে সমান সম্মান নিয়ে দেখার শিক্ষা দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে এ বিষয়গুলোতে আরও নজর দেওয়া দরকার বলে মত দেন তিনি।
নতুন বই পাওয়া শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আক্ষেপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মহামারী করোনার কারণে নিজ হাতে বাচ্চাদের হাতে বই তুলে দিতে পারলাম না এটা বড় দুঃখ। ছোট্ট সোনামণিরা নতুন বছরে নতুন বই পেতে যাচ্ছে। নতুন বই হাতে পাওয়ার আনন্দটাই আলাদা। নতুন বইয়ের ঘ্রাণ পাওয়া, হাতে নেওয়া এই একটা আলাদা অনুভূতি।’
শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘করোনার কারণে বই উৎসব আমরা করতে পারছি না। কিন্তু আমরা বই বিতরণ করছি। গতবারও করোনার কারণে উৎসব করতে না পারলেও বই পৌঁছে দিয়েছি। তা ছাড়া সংসদ টেলিভিশনের মাধ্যমে আমরা শিক্ষাকার্যক্রম অব্যাহত রেখেছি। ছেলেমেয়েদের ডিজিটাল পদ্ধতিতে শিক্ষা নিতে ব্যবস্থা নিয়েছি। তারা যেন পিছিয়ে না থাকে।’ উৎসব না হলেও ৪ জানুয়ারি থেকে সারা দেশে যাতে শিক্ষার্থীরা বই পায়, সে ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, তারাও যেন পিছিয়ে না থাক এজন্য আমরা ব্রেইল পদ্ধতিতে বই তৈরি করে দিচ্ছি। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদেরও তাদের নিজেদের ভাষায় বই তৈরি করে দিচ্ছি। এ রকম পাঁচটি ভাষায় আমরা বই তৈরি করে দিয়েছি। যাতে তারা তাদের ভাষাটা ভুলে না যায়।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আজকে এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমি আহ্বান জানাব, আমরা এই টিকাদান কার্যক্রমটা একদম তৃণমূলপর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যেতে চাচ্ছি। কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমেই দেওয়া হবে বা অন্যান্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমেও দেওয়া হবে। কিন্তু যারা টিকা নেননি, এখনই তাদের টিকাটা নিতে হবে।’ পরিবারের শুধু অভিভাবক নন, শিক্ষার্থীরাও যাতে টিকা নেয় সেজন্য ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অনেক সময় কৃষকের ছেলে বড় কর্মকর্তা হয়ে যাওয়ার পর বাবার পরিচয় দিতে লজ্জা পায়। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং খুব লজ্জার ব্যাপার। বরং সেই বাবাকে আরও বেশি সম্মান দেওয়া উচিত যে বাবা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সন্তানকে শিক্ষা দিয়ে বড় করেছেন। তাকেই সব থেকে সম্মান দেওয়া উচিত, বরং তার সঙ্গে মাঠে নেমে মাঠে কাজ করা উচিত।’
কৃষকের সেই শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে আরও বেশি ফসল ফলানোর চেষ্টা করা উচিত উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, ‘তাহলে সেটা প্রকৃত শিক্ষা হবে। কিন্তু নিজে দুই পাতা পড়ে একটা ফুল প্যান্ট পরার পর আর মাঠে নামতে পারব না, এই মানসিক দৈন্যতাটা বাংলাদেশের মানুষের মাঝে থাকুক, সেটা আমরা চাই না। সেটা আমরা দেখতে চাই না। এটা একটা মানসিক দৈন্য, এটা মানসিক দারিদ্র্য এবং তা আমার দৃষ্টিতে... এটা যেন না থাকে। সমস্ত কাজকেই সম্মান দিতে হবে।’
বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্র প্রান্তে অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি জানান, নতুন বছরে ৪ কোটি ১৭ লাখ ২৬ হাজার ৮৫৬ জন শিক্ষার্থীর হাতে ৩৪ কোটি ৭০ লাখ ২২ হাজার ১৩০ কপি বই বিনামূল্যে বিতরণ করা হবে। ২০২১ সালে ধাপে ধাপে ৩৪ কোটি ৩৬ লাখ ৬২ হাজার ৪১২টি বই বিতরণ করা হয়।
অনুষ্ঠানে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল শিক্ষার্থীদের জীবনমুখী শিক্ষা নিতে শ্রেণিকক্ষের বাইরের জগৎ থেকেও শিক্ষাগ্রহণের তাগিদ দেন। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।