নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন-২০২২

সর্বোচ্চ গুরুত্ব আ.লীগের নেপথ্যে মদদ বিএনপির

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনকে সামনে রেখে জমে উঠেছে ভোটের মাঠ। প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দিন-রাত চলছে গণসংযোগ। ভোটারের দ্বারে ভোট প্রত্যাশায় ব্যস্ত প্রার্থীরা। এদিকে ঢাকার সন্নিকটে প্রাচ্যের ড্যান্ডি খ্যাত শহর নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনের দিকে সজাগ চোখ রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর। যেকোনো মূল্যে নিজেদের প্রার্থীর জয় নিশ্চিত করতে মরিয়া দলগুলো।

দলের নীতিনির্ধারকরা বসেছেন পরিকল্পনা নিয়ে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ নিজেদের প্রার্থী আইভীর জয় নিশ্চিত করতে বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে এ নাসিক ভোটকে। কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে প্রতিদিনই নেতারা ভিড় জমাচ্ছেন এ শহরে। নানা পরিকল্পনা নিয়ে নামছেন ভোটের মাঠে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় নেতাদের সমন্বয়ে ১৭ সদস্যের টিমও ২/১ দিনের মধ্যে মাঠে নামার কথা রয়েছে। কোনো গাফিলতি পেলেই নেওয়া হচ্ছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। নৌকা প্রতীকের দলীয় প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীর পাশে ছায়ার মতো কাজ করছে কেন্দ্রীয়ভাবে গঠিত নির্বাচন সমন্বয় কমিটি। অন্যদিকে নির্বাচন  কমিশনের (ইসি) প্রতি অনাস্থা দেখিয়ে এ কমিশনের অধীনে দলীয়ভাবে কোনো ভোটে যাচ্ছে না বিএনপি। দলটি সরাসরি প্রার্থী না দিলেও দলীয় চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা তৈমূর আলম খন্দকার স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে হাতি প্রতীক নিয়ে নেমেছেন ভোটের যুদ্ধে। বিএনপির মহাসচিবসহ দলের শীর্ষ নেতারা সরাসরি মাঠে না নামলেও নেপথ্যে থেকে মদদ দিচ্ছেন বহুল আলোচিত এ সিটি নির্বাচনে।

নির্বাচনী মাঠেও ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম। অন্য প্রার্থীরাও বসে নেই। ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখার প্রার্থী মাসুম বিল্লাহ কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। একইভাবে খেলাফত মজলিসের সিরাজুল মামুন (দেয়াল ঘড়ি), খেলাফত আন্দোলনের জসিমউদ্দিন (বটগাছ), কল্যাণ পার্টির রাশেদ ফেরদৌস (হাতঘড়ি) এবং জয় বাংলা নাগরিক কমিটি সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুল হুদা বাবু (ঘোড়া) প্রতীক নিয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন।

সিটি করপোরেশনের ২৭টি ওয়ার্ডে ১৪৮ জন কাউন্সিলর প্রার্থী এবং ৩৪ জন সংরক্ষিত নারী আসনের কাউন্সিলর প্রার্থীও জয় পাওয়ার আশায় ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন।

মহানগর আওয়ামী লীগের সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগের নৌকার প্রার্থীর পক্ষে প্রায় প্রতিদিনই কেন্দ্রীয় নেতারা নারায়ণগঞ্জে আসছেন। গত মঙ্গলবার আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মইনুল হক নিখিলের নেতৃত্বে টিম নারায়ণগঞ্জে যুবলীগের বর্ধিত সভা করেছে। বুধবার রাতে এসেছিলেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক ও দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, সদস্য সচিব মির্জা আজম, সহ-সাধারণ সম্পাদক আফম বাহাউদ্দিন নাসিমসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। এ সময় কাউন্সিলর নির্বাচন থেকে সরে গিয়ে বিএনপির প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগে মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি রবিউল হোসেনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। মহানগর কমিটির সদস্য কাউন্সিলর প্রার্থী আবদুল করিম বাবু স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকারকে সমর্থন দেওয়ার একটি খবর মিডিয়ায় প্রকাশ পাওয়ায় কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে।

মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামাল জানান, বুধবার নির্বাচনের বিষয়ে তাকে ফোন দেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মোবাইল ফোনে তিনি বলেছেনতৈমূর সাহেব জনগণের দাবির মুখে, পরিবেশ পরিস্থিতিতে প্রার্থী হয়ে গেছেন। তিনি এখন জনতার প্রার্থী হয়েছেন। তিনি বিজয়ী হলে জনতার বিজয় হবে। তিনি ব্যর্থ হলে কিন্তু সরকার বলবে বিএনপির একজন নেতা স্বতন্ত্র নির্বাচন করে পরাজয় বরণ করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে আপনারা বিবেক বিবেচনা করে যা ভালো মনে হয় করবেন। আপনাদের যার যার অবস্থান থেকে আপনারা আপনাদের কর্তব্য ঠিক করে নেবেন।

এটিএম কামাল বলেন, মহাসচিব যখন ফোন দেন তখন আমরা ওলামাদলের একটি বৈঠকে ছিলাম। আমি তখন তৈমূর আলম খন্দকারের কাছে ফোন দিলে তার সঙ্গেও মহাসচিবের কথা হয়েছে। তিনি প্রার্থীর খোঁজখবর নিয়েছেন। মহাসচিব আরও বলেছেন, নারায়ণগঞ্জে নির্বাচনে কাজ করতে দলীয় কোনো বিধিনিষেধ নেই। আপনারা যদি ইচ্ছা করেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে যদি কাজ করেন এতে দল বাধা দেবে না। যেহেতু আমরা মানুষের মৌলিক অধিকারে বিশ্বাস করি, তাই স্থানীয় মানুষের চাহিদা ও তাদের পছন্দে আমাদের কোনো বিধিনিষেধ নেই। এটিএম কামাল বলেন, আমরা নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। যেখানে তৈমূর ভাই যাচ্ছেন সেখানেই লোকে-লোকারণ্য হয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ ১৮ বছরে মেয়র পদে থেকেও উন্নয়নবঞ্চিত হয়েছে নগরবাসী। বিপুল ট্যাক্সের বোঝা চাপিয়ে দিলেও নাগরিক সুবিধা ছিল শূন্যের কোঠায়। এজন্যই পরিবর্তনের হাওয়া বইছে নগরীজুড়ে।

আগেও জনগণের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করেছি, আগামীতেও করবআইভী : নাসিকের সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত নৌকার মেয়র প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেছেন, ‘আগেও জনগণের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করেছি, আগামীতেও করব।’

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে নগরীর ৯ নম্বর ওয়ার্ডের জালকুড়ি পশ্চিমপাড়া এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণাকালে সাংবাদিকদের কাছে এসব কথা বলেন তিনি।

আইভী বলেন, জনগণ তো আমার পুরনো। আমি বিগত দশ বছর কাজ করেছি। এই এলাকায় প্রচুর কাজ করেছি, আপনারাও দেখেছেন। আমি নগরবাসীর সঙ্গে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকা- করিনি, চাঁদাবাজি করিনি। মানুষের কোনোদিন কোনো ক্ষতি করিনি। জনকল্যাণে, মানুষের কল্যাণে কাজ করেছি। ঈমান ও আমলের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন চালানোর চেষ্টা করেছি। মানুষের সেবা করেছি। আমি চাই আগামী পাঁচ বছর আমাকে কাজ করার জন্য আবারও সুযোগ দেবেন। যেন আমি তাদের খেদমত করতে পারি।

জালকুড়ি পশ্চিমপাড়া এলাকা থেকে দ্বিতীয় দিনের মতো প্রচার শুরু করে হেঁটে হেঁটে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলেন আইভী। ভোট প্রার্থনা করেন। তার পক্ষে লিফলেট বিতরণ করেন কর্মী-সমর্থকরা। পশ্চিমপাড়া ছাড়াও জালকুড়ির মাঝপাড়া, পূর্ব জালকুড়ি, উত্তরপাড়াপুল এলাকাসহ বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা ঘুরে প্রচার চালান তিনি। পথে জালকুড়িতে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডের কার্যালয়ে ফুল দিয়ে তাকে সংবর্ধনা জানায় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা। পূর্বের মতো এবারও তারা আইভীর পক্ষে আছেন বলে জানান।

নির্বাচন কমিশনকে বোবা ও অন্ধ হলে চলবে নাতৈমূর : নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা তৈমূর আলম খন্দকার বলেছেন, ‘আমি যা বলি, কাগজ-কলমে প্রমাণ নিয়েই কথা বলি, ডকুমেন্ট ছাড়া কোনো কথা বলি না। সিটি করপোরেশনের অনেক ডকুমেন্ট আমার হাতে আছে।’

 ট্যাক্স বৃদ্ধির বিষয়ে তৈমূরের বক্তব্যকে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী ‘স্ট্যান্টবাজি’ মন্তব্য করায় তিনি এসব কথা বলেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে নির্বাচনী প্রচারণায় নেমে তিনি এমন মন্তব্য শুরু করেন।

তিনি বলেন, ‘জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই নির্বাচনে আছে। আমি মনে করি, এটা একটি গণবিপ্লব হতে যাচ্ছে। এই বিপ্লবে জনগণের জয় হবে ইনশাআল্লাহ।’ নৌকার প্রার্থীর সাউন্ড সিস্টেমের প্রচারণার বিষয়ে তৈমূর আলম বলেন, উচ্চশব্দে গান বাজিয়ে প্রচারণার বিষয়টি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। বিজ্ঞানীরা বলেন, শব্দদূষণের কারণে বারো বছর হায়াত কমে যায়। নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে, টাকার জোরে কেউ যদি সাউন্ড সিন্টেম দিয়ে প্রচার চালায়, তাহলে এটা দেখার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচন কমিশনকে বোবা ও অন্ধ হলে চলবে না। তাদের চোখ-কান খোলা রেখে, নির্বাচনটা পরিচালনা করতে হবে। তবেই নির্বাচনটা সুষ্ঠু হবে। আমি মনে করি, যেখানেই আচরণবিধি লঙ্ঘন হবে, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব, এটাকে প্রতিহত করা। নতুবা আচরণবিধি লঙ্ঘন হতেই থাকবে।

হাতি মার্কার স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকার আরও বলেন, সরকারি দল তো সব সময় সরকারি আমলাদের সুবিধা পায়। সেটাকে তারা যেন কাজে না লাগাতে পারে, সে জন্য নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষতার সঙ্গে কাজ করার জন্য আমি অনুরোধ করছি।

আওয়ামী লীগের কারও কারও সঙ্গে আপনার আঁতাতের অভিযোগ আছে? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে তৈমূর আলম খন্দকার বলেন, আমি তো জনগণের প্রার্থী, আমাকে সর্বস্তরের জনগণের কাছে যেতেই হবে। আপনারা যদি সরকারি দলের কথায় এভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন, তাহলে এটা আমার জন্য ব্যাঘাত সৃষ্টি হবে।

এসময় তার সঙ্গে ছিলেন মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামাল, সাংগঠনিক সম্পাদক আবু আল ইউসুফ খান টিপু, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য জাহিদ হাসান রোজেল প্রমুখ।