আবদুর রহমান বয়াতির জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

বাউল একটি বিশেষ লোকাচার ও মত। বাউলগান বাংলার একটি প্রধান লৌকিক ধর্ম-সম্প্রদায় ও দর্শন আশ্রয়ী সাধন সঙ্গীত। বাংলার এক শ্রেণীর অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত, একতারা-দোতরা আশ্রয়ী, ভাবদ্রোহি, স্বাধীন ও সমন্বয়মূলক মরমী গায়ক ও সাধকদের চিন্তাধারায় আত্মপলব্ধি ভাবনার নাম বাউল দর্শন। এ সাধকদের ভাবসংগীত ও মরমি কিংবা সুফি চিন্তার ফলে যে নতুন একটি দর্শনের উদ্ভব হয়েছে সেটাই আসলে হলো বাউল দর্শন।

বাউল কুলের শিরমনি ফকির লালন সাঁইজি এ মত কিংবা দর্শনের স্রষ্টা। যেখানে নেই কোনো ভেদাভেদ, নেই হিংসা, নেই অহংকার কিংবা আমিত্ববোধ। বাউলরা ক্রান্তিদর্শী, তারা অন্তরচক্ষুতে সমসাময়িক পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ দেখতে পান, তাই নিয়ে তারা গান লিখেন। তারা মানুষের মধ্যে ঈশ্বরকে খোঁজ করেন। নিগূঢ় আত্মশিল্প এখানে বিদ্যমান। বাউলরা তাদের গানে রূপকের মাধ্যমে অসীমকে সীমায় আবদ্ধ করেছেন আর সীমার মধ্যে থেকে অসীমের সাধনা করেছেন- এটাই বাউল সাধনার মূল কথা।

আমাদের এই বাংলাদেশে যারা সেই বাউল দর্শনকে মননে ধারণ করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এটা প্রচার ও প্রসার করে গেছেন এবং সুর ও গান নিয়ে ছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন বাংলাদেশের কিংবদন্তি বাউল আবদুর রহমান। যাকে সবাই আবদুর রহমান বয়াতি নামে বেশি চিনেন। তিনি ছিলেন আসলে চারণকবি। একাধারে তিনি গান লিখেছেন, সুর করেছেন এবং গেয়েছেন। তিনি তার জীবদ্দশায় পাঁচশত একক অ্যালবাম সৃষ্টি করে গিয়েছেন যা অনবদ্য এবং অসাধারণ সৃষ্টির প্রয়াস।

কিন্তু এই শিল্পীর জন্ম তার মতো বিখ্যাত কোনো শিল্পীর ঘরে হয়নি। ঢাকার দয়াগঞ্জে অতি সাধারণ পরিবারে ১৯৩৬ সালের এই দিনে (১ জানুয়ারি) তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা তোতা মিয়ার দয়াগঞ্জ বাজারে একটি ছোট্ট ভাতের হোটেল ছিল। দিনের বেচাবিক্রি শেষে সেই দোকানের সামনে রাতের বেলায় বাংলাদেশের প্রখ্যাত সব বাউল শিল্পীদের নিয়ে নিয়মিত বসতো গানের আসর। এই আসরে আসতেন বাংলাদেশের বাউল জগতের দিকপাল সাধক খালেক দেওয়ান, বাউল হালিম চিশতী, বাউল রজ্জব আলী দেওয়ান, বাউল দলিল উদ্দিন, বাউল মারফত আলী, আলাউদ্দিন বয়াতি প্রমুখ অন্যতম।

ছোট বেলা থেকেই গানের প্রতি প্রবল আকর্ষণ ছিল আবদুর রহমান বয়াতির। এই অদম্য আকর্ষণ তাকে ঘরছাড়া করেছে সেই কৈশোর থেকেই। যেখানেই বাউল গানের আসর বসতো, আবদুর রহমান হাজির। শুধু উপস্থিতিই নয়, তিনি গিয়ে বসতেন সামনের সারিতে। উদাস হয়ে গান শুনতেন, মাঝে মাঝে তালে তালে সুর ধরতেন, মন ভরে উঠতো তার সেই সুরে।

এই সুর ই একপর্যায়ে তাকে আরও বিবাগী করে। তিনি ধীরে ধীরে শিখতে লাগলেন দোতারা বাজানো, একতারা বাজানো, হারমোনিয়াম, খঞ্জনি, বেহালা সহ অন্যান্য সব যন্ত্র। কালক্রমে তিনি নিজেই হয়ে গেলেন একজন বাউল। ১৯৮২ সালে তিনি ‘আবদুর রহমান বয়াতি’ নামে বাউল দল গড়ে তোলেন। গানের সঙ্গে সঙ্গত করার সব ধরনের যন্ত্র বাজানোতে তিনি ছিলেন পারদর্শী। তাই তাকে সব্যসাচী বাউল বলা হয়।

গানই ছিল তার নেশা, পেশা এবং ধর্ম। তিনি তার গান, ভাব ও সুরের মূর্ছনায় শুধু বাংলাদেশের মানুষকেই মুগ্ধ করেননি, তার গানের দল নিয়ে তিনি পৃথিবীর প্রায় ৪২টি দেশের বাঙালিদের গান শুনিয়েছেন। তার গান ও সুরের অবগাহনে তাদের সিক্ত করেছেন। এর মধ্যে ভারত, নেপাল, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, চীন, রাশিয়া, মিসরসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ রয়েছে। তিনিই এ পর্যন্ত বাংলাদেশের একমাত্র বাউল যিনি বাংলাদেশের ঐতিহ্য বাউল গান নিয়ে পৃথিবীর এতগুলো দেশ ভ্রমণ করেছেন।

একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো আবদুর রহমান বয়াতি একমাত্র বাংলাদেশি বাউল যিনি যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের আমন্ত্রণে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ভবন হোয়াইট হাউসে যান এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট তার সম্মানে একটি ডিনার পার্টির আয়োজন করেন। আবদুর রহমান বয়াতি সেই পার্টিতে বাংলাদেশের বাউল গান গান। এটা জাতি হিসেবে এবং বাউল ও বাউল গানের জন্য একটা অনেক বড় সম্মানের বিষয়।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার আলোকপাত করতে চাই এখানে। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আবদুর রহমান বয়াতির গান শুনে খুব মুগ্ধ হন। তিনি তখন বাংলাদেশ টেলিভিশনের তৎকালীন মহাপরিচালক মোস্তফা মনোয়ারকে তাৎক্ষণিক টেলিফোন করেন এবং আবদুর রহমান বয়াতির জন্য পাঁচশত টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক আবদুর রহমান বয়াতির হাতে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে পাঁচশত টাকা পুরস্কার তুলে দেন।

তিনি প্রায় চার হাজার গান রচনা করেছেন, সুর দিয়েছেন এবং গেয়েছেন। তিনি আসলে একাধারে একজন বাউল ও চারণকবি। আবদুর রহমান বয়াতির ‘মন আমার দেহ ঘড়ি’- এই গান শুনেননি বাংলা ভাষার এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ঢের। তিনি সৃষ্টিতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, গুরুতত্ত্ব, প্রেমতত্ত্ব, বিরহতত্ত্বসহ বিভিন্ন আঙ্গিকের গান রচনা করে মানুষের মনের খোরাক জুগিয়েছেন পাশাপাশি মানুষের মনকে উদাস করেছেন, হৃদয়ে দ্যোতনা তৈরি করেছেন।

এক জীবনে ৫০০ একক গানের অ্যালবাম তৈরি করে যাওয়া নিঃসন্দেহে একটা অনেক বড় সাধনার বিষয় এবং একটি জাতির জন্য একটি বিশাল ভাণ্ডার। তার সবচেয়ে জনপ্রিয় গানের মধ্যে মন আমার দেহ ঘড়ি/ছেড়ে দে নৌকা আমি যাব মদিনা/ মা আমেনার কোলে ফুটলো ফুল/আমার মাটির ঘরে ইঁদুর ঢুকেছে/ আমি ভুলি ভুলি করি, প্রাণে ধৈর্য মানে না ইত্যাদি অন্যতম।

এখানে একটি বিষয় সুনির্দিষ্ট ভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ‘ছেড়ে দে নৌকা আমি যাব মদিনা’ এই গানটি বাংলাদেশে বর্তমানে অনেক জনপ্রিয় একটি গান। কিন্তু অনেক শ্রোতাই জানেন না যে এই গানের গীতিকার, সুরকার এবং প্রথম শিল্পী আবদুর রহমান বয়াতি।

সংগীতের বাইরেও তার ছিল বিচরণ। তিনি ১৯৮৯ সালে হাফিজুদ্দিন পরিচালিত ‘অসতী’ নামক একটি সিনেমায় অভিনয় করেন। এরপর তিনি ‘হৃদয় থেকে হৃদয়’ নামক সিনেমায় বাউল চরিত্রে অভিনয় করেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিশেষ গ্রেডের শিল্পী।

গুণী এই বাউল তার সংগীত সাধনা ও বাউল গানে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। তার এই অবদানের জন্য বাংলাদেশের মানুষ তাকে দিয়েছে অনেক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। তার জীবদ্দশায় তিনি অসংখ্য পুরস্কার পান। এর মধ্যে সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড, সোলস অ্যাওয়ার্ড, টেলিভিশন দর্শক ফোরাম লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড, সমর দাস স্মৃতি সংসদ পুরস্কার, ইউএসএ জাগরণি শিল্পী গোষ্ঠী পুরস্কার, মীর মোশাররফ হোসেন স্মৃতি স্বর্ণপদক, সুরবিথী থিয়েটার সংবর্ধনা, কায়কোবাদ সংসদ আজীবন সম্মাননা, সিটি কালচারাল সেন্টার গুণীজন সম্মাননা, বাংলাদেশ বাউল সমিতি আজীবন গুণীজন সম্মাননা, ২০০৪ সালে পান তিনি নজরুল একাডেমি সম্মাননা, ২০০৬ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি কর্তৃক গুণীজন সম্মাননা অন্যতম। ২০১৫ সালে তিনি (মরণোত্তর) একুশে পদক লাভ করেন।

সারাজীবন সুর ও সংগীতের সাধনা নিয়ে কাটিয়ে দেওয়া এই গুণীজন শেষ জীবনে এসে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন। প্রায়ই তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হতো। একপর্যায়ে জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল তার চিকিৎসার দায়িত্ব নেন। এই হাসপাতালে তিনি অনেক দিন চিকিৎসারত অবস্থায় ছিলেন।

বরেণ্য এই বাউলের মেজো ছেলে আলম বয়াতির সঙ্গে আলাপ হয়। তার বাবার জীবনের শেষ দিনগুলো নিয়ে তিনি কথা বলেন, স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘শেষ সময়ে এসে বাবা ওষুধ খেতে চাইতেন না। কী যেন এক অজানা অভিমানে তিনি ভুগতেন। আমরা অনেক জানার চেষ্টা করেও জানতে পারিনি।’

অবশেষে ২০১৩ সালের ১৯ আগস্ট জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে ৭৭ বছর বয়সে বাংলাদেশের বরেণ্য এই বাউল তার অভিনয়কৃত ‘হৃদয় থেকে হৃদয়’ চলচ্চিত্রের সেই গানের মতো এই পৃথিবী যেমন আছে তেমন রেখে, সুন্দর এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন ওপারে। তার ইচ্ছা অনুযায়ী দয়াগঞ্জে তার বাবা-দাদার কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।

আবদুর রহমান বয়াতি স্মরণে ২০১৭ সালের ০১ জানুয়ারি বর্তমান মন্ত্রিপরিষদের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নজরুল হামিদ বিপুর প্রত্যক্ষ উদ্যোগে ‘আবদুর রহমান বয়াতি ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন আবদুর রহমান বয়াতির ছেলে আলম বয়াতি। প্রতি বছর এই স্মৃতি সংসদ থেকে তার কর্ম ও সাধনা নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠান ও মেলা হয়। এই স্মৃতি সংসদ থেকে দুস্থ মানুষ ও বাউলদের সহায়তা করা হয়।

আজ ১ জানুয়ারি বাংলাদেশের প্রখ্যাত এই বাউলের ৮৬তম জন্মদিন। জন্মদিনে এই মহাজনের প্রতি রইলো আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

লেখক: রুবেল সাইদুল আলম

কবি, বাউল গবেষক

ডেপুটি কমিশনার অব বাংলাদেশ কাস্টমস