বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব যতই দুর্বল ও শিথিল হচ্ছে সেখানে যেন একধরনের নেতিবাচক শূন্যতা গ্রাস করছে। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের পতনের এক নতুন ধাপের সূচনা হয়েছিল ২০০১ সালে জর্জ বুশের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। মূলত পশ্চিমা করপোরেট পুঁজিবাদের পাওয়ার এলিটদের স্বার্থে মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সের বিনিয়োগ লাভজনক করতেই এই কথিত অন্তহীন যুদ্ধের সূচনা করা হয়েছিল। এই যুদ্ধের পর গত ১৬ বছরে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের শক্তি অনেক দুর্বল ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। সাম্রাজ্যবাদের শিথিল মুষ্ঠির ভেতর ঢুকে পড়ছে আরও কদাকার, বিশৃঙ্খল ও অনিশ্চিত আঞ্চলিক শক্তির খড়গ। বিশ্বের অন্যতম দারিদ্র্যপীড়িত ও ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল দক্ষিণ এশিয়ার এ অংশে ঘটে চলা রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে তারই প্রচ্ছন্ন ছায়া দেখা যাচ্ছে। যেখানে ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তানে প্রায় অর্ধশত কোটি মানুষের সামনে মিয়ানমারের জান্তা সরকার যখন আরাকান প্রদেশের প্রায় তিন মিলিয়ন রোহিঙ্গাকে ইতিহাসের নজিরবিহীন পন্থায় নিশ্চিহ্ন করার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে তখন পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পক্ষ থেকে কোনো শক্ত প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে দুই বৃহৎ পরাশক্তি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। তাইওয়ানের ঘনিষ্ঠ মিত্র আর চীনের প্রতিপক্ষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তাইওয়ানকে চীনের যে কোনো হামলা থেকে রক্ষা করতে তার দেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সঙ্গে ভার্চুয়াল সামিটে তাইওয়ানের ক্ষেত্রে আগুন নিয়ে খেলার বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং। তাই এটি বলা সংগত হবে যে স্ব-শাসিত দ্বীপটি দুটি পরাশক্তির মধ্যে গভীর বিরোধ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রস্থলে চলে গেছে, সামরিক উত্তেজনা প্রজ্বলিত করার এবং আঞ্চলিক শৃঙ্খলার পুনর্নির্মাণের সম্ভাবনাসহ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন ১৯৯৬ সালের তৃতীয় তাইওয়ান প্রণালী সংকটের পর বর্তমানের উত্তেজনাকর পরিস্থিতিই সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে। তাইওয়ানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী চিউ কুও-চেং বর্তমান উত্তেজনাকে চীনের সঙ্গে ৪০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ সামরিক উত্তেজনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বিদ্যমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় তাইওয়ান প্রণালী একটি সংঘর্ষের মুখোমুখি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যদি এই সংকট যুদ্ধে পরিণত হয় তবে এটি হবে বিশ্বে দেখা সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে প্রভাবশালী যুদ্ধ, বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্রিম্যান স্পোগলি ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর সেন্টার ফেলো মাস্ত্রো। বিশেষ করে, তাইওয়ানে চীনের সামরিক হস্তক্ষেপ মারাত্মক পরিণতির কারণ হতে পারে। বর্তমান বিশ্বের যেসব অঞ্চলকে সামরিক সংঘাতপ্রবণ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তার মধ্যে এই সময়ের সবচেয়ে সামরিক উত্তেজনাপূর্ণ অঞ্চল হলো তাইওয়ান প্রণালী।
তাইওয়ান গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের একটি বিচ্ছিন্ন ও বিদ্রোহী স্ব-শাসিত প্রদেশ হিসেবে পরিচিত, যদিও তাইওয়ানিরা নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে মনে করে। এর রাষ্ট্রীয় নাম হলো রিপাবলিক অব চায়না। ন্যাশনালিস্ট পার্টি বা কুওমিনটাং (কেএমটি) ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত তাইওয়ান শাসন করেছিল। ১৯৪৯ সালে মাও সে তুং-এর নেতৃত্বে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে জয়যুক্ত হলে তখনকার শাসক চিয়াং কাইশেক তার দলবল নিয়ে চীনের মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত তাইওয়ান দ্বীপে পালিয়ে গিয়ে সেখানে রিপাবলিক অব চায়না নামে শাসন অব্যাহত রাখেন। তাইওয়ানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট সাই ইং-ওয়েন ইতিমধ্যে বলে দিয়েছেন, তাইপে পেইচিংয়ের চাপের কাছে মাথা নত করবে না। চীন আমাদের জন্য যে পথ বেঁধেছে তা নিতে কেউ তাইওয়ানকে বাধ্য করতে পারবে না, বলেন ওয়েন। গণতান্ত্রিক এই দ্বীপের ভবিষ্যৎ তার ২৫ মিলিয়ন মানুষের দ্বারা নির্ধারিত হবে, কোনো বিদেশি শক্তির দ্বারা নয়।
যে কোনো সময় তাইওয়ানের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হতে পারে। আবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং প্রয়োজনে তাইওয়ান দখলের জন্য সামরিক শক্তি প্রয়োগের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করতে অস্বীকার করেছেন। শি চিনপিং বলেছেন, চীন ও তাইওয়ানের মধ্যে ‘পুনর্মিলন অনিবার্য’। তবে তার মূল লক্ষ্য হলো সামরিক বিকল্প হিসেবে শান্তিপূর্ণ উপায়ে তাইওয়ানকে মূল ভূখণ্ড গণচীনের সঙ্গে একত্রীকরণ করা। কিন্তু যদি তাইওয়ানের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয় তবে চীন সামরিক হামলার মাধ্যমে তাইওয়ান দখল করে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে একীভূত করবে।
বিগত প্রায় সত্তর বছর যাবৎ তাইওয়ানিরা চীনের একটি যুদ্ধের হুমকির ভীতির মধ্যে বসবাস করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চীন ও তাইওয়ানের মধ্যে সামরিক এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা তীব্রতা পেয়েছে, দ্বীপের আকাশ প্রতিরক্ষা অঞ্চলে চীনা যুদ্ধ বিমানের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। চীন টানা চারদিনে তাইওয়ানের বিমান প্রতিরক্ষা শনাক্তকরণ অঞ্চলে ১৫০টিরও বেশি সামরিক জেট পাঠিয়েছিল। যা এ যাবৎকালের মধ্যে একটি রেকর্ড সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এই অনুপ্রবেশ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো, তাইওয়ানকে ভয় দেখানোর জন্যই অনুপ্রবেশের ঘটনা। চীন মনস্তাত্ত্বিক ভয় সৃষ্টি করে তাইওয়ানিদের চীনের প্রতি নতজানু করার জন্যই এমনটি করে থাকতে পারে। এমনকি আমেরিকার থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক জার্মান মার্শাল ফান্ডের এশিয়া প্রোগ্রামের পরিচালক বনি গ্লেসার বলেছেন, ‘‘এটি বিমানের সংখ্যার দিক থেকে উদ্বেগজনক ছিল। এশিয়া প্যাসিফিকের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ওরিয়ানা স্কাইলার মাস্ত্রো বলেছেন, এটি একটি ‘আগ্রাসনের চিহ্ন’। আর চীনা সরকারের একটি বার্তা যে এটি তার বোমারু বিমান ও যোদ্ধাদের দিয়ে তাইওয়ানকে আঘাত করতে পারে।” তিনি আরও বলেন, ‘এটি জাতীয় ঐক্যের নিজস্ব লক্ষ্য অর্জনের জন্য সামরিক উপায়ে আরও বেশি নির্ভর করার চীনের অভিপ্রায়কেও ইঙ্গিত করে।’
চীন ও তাইওয়ানের মধ্যকার বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় যুদ্ধের আশঙ্কার বিষয়টি অস্বীকার করেননি বিশেষজ্ঞরা। ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থ এবং তাইওয়ানের ভূখণ্ড রক্ষার যুক্তি দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্র চীনের বিরুদ্ধে সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষকরা।
এমনিতেই চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিশ্বরাজনীতিতে আধিপত্য ও প্রভাব বিস্তারের একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতা দৃশ্যমান আছে। দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে রয়েছে দেশ দুটির মধ্যে কৌশলগত বিরোধ। অন্যদিকে এশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে তাড়িয়ে দিয়ে চীন এশিয়ায় তার একক কর্র্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কারণ চীন মনে করে বিশ্বব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের একক কর্র্তৃত্ব খর্ব করে চীনকে প্রতিস্থাপন করার জন্য সর্বাগ্রে এশিয়ায় চীনকে একক পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা অপরিহার্য। আবার যুক্তরাষ্ট্রও তার পরাশক্তির কর্র্তৃত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে এশিয়ায় প্রভুত্ব বজায় রাখতে ওই অঞ্চলের মিত্র দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়। মোটকথা ওই অঞ্চলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য দুই বৃহৎ শক্তি আটঘাট বেঁধেই নেমেছে এবং বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে নতুন মেরুকরণের আলামত দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।
লেখক গবেষক ও কলামনিস্ট
raihan567@yahoo.com