পুলিশের এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত করতে চারটি ক্যাম্পের জন্য বন বিভাগের কাছে ১২ একর জমি চেয়েছে। চার ক্যাম্পের মধ্যে তিনটিই সংরক্ষিত বনের ভেতর। র্যাবের এই চারটি ক্যাম্প হবে সাতক্ষীরার মুন্সীগঞ্জ, বাগেরহাটের দুবলার চর, কটকা ও সুপতিতে। বন বিভাগের কাছে ওই আবেদন তিন বছর আটকে থাকলেও সম্প্রতি র্যাব থেকে দুবলারচরে সংরক্ষিত বনে দেড় একর জমি চাওয়া হয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সর্বশেষ গত বছর ২৮ এপ্রিল র্যাব প্রধান কার্যালয় থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে সুন্দরবনের দুবলারচরে দেড় একর জমি চেয়ে আরেকটি চিঠি দেওয়া হয়।
সুন্দরবনের ভেতর র্যাবের ক্যাম্প স্থাপনের বিষয়ে জানতে চাইলে গত রবিবার র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন টেলিফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত করতে চারটি ক্যাম্প তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্ল্যান প্রোগ্রাম জমা দিয়েছি। বন বিভাগের কাছেও চাহিদাপত্র দিয়েছি। কিন্তু এখনো বন বিভাগের অনুমোদন পাওয়া যায়নি। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে।
তিনি বলেন, ক্যাম্প তৈরির বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আন্তরিক। তারাও চাইছে অন্তত সাতক্ষীরা ও দুবলারচর এলাকায় একটি করে ক্যাম্প হোক।
২০১৮ সালের ৫ নভেম্বর তৎকালীন র্যাবের মহাপরিচালক বর্তমানে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ সুন্দরবন সন্নিহিত এলাকায় র্যাবের জন্য চারটি ক্যাম্প স্থাপনের জমি চেয়ে সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদের কাছে আবেদন করেন। প্রতিটি ক্যাম্পের জন্য তিন একর করে মোট ১২ একর জমি চেয়ে এই আবেদন করা হয়। এর মধ্যে সাতক্ষীরার মুন্সীগঞ্জে ও বাগেরহাটের দুবলারচরে স্থাপন করা ক্যাম্পটি হবে র্যাব-৬-এর অধীনে। বাগেরহাটের কটকা ও সুপতিতে স্থাপিত ক্যাম্পটি র্যাব-৮-এর অধীনে হবে।
বেনজীর আহমেদের চিঠিতে বলা হয়, ২০১২ সাল থেকে সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত করার প্রচেষ্টায় র্যাব কাজ করে যাচ্ছে। এরই প্রক্রিয়ায় ২০১৬ সালের ২৯ মে মাস্টার বাহিনীর ১০ জন আত্মসমর্পণ করে। অবশিষ্ট জলদস্যুদের আত্মসমর্পণে উদ্বুদ্ধ করতে প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে তাদের পরিবারপ্রতি ১ লাখ টাকা করে দেওয়া হয়। সরকারের এই যুগান্তকারী পদক্ষেপের কারণে ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর পর্যন্ত ৩২টি জলদস্যু বাহিনীর ৩২৮ জন বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করে। একই দিন প্রধানমন্ত্রী সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত ঘোষণা করেন। সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত করা গেলে এর ওপর নির্ভরশীল ২৫ লাখ মানুষের জীবন মান বৃদ্ধি পাবে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, সাতক্ষীরার মুন্সীগঞ্জ ও বাগেরহাটের দুবলারচর, কটকা ও সুপতিতে চারটি স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা প্রয়োজন। এর মধ্যে মুন্সীগঞ্জ ও দুবলারচরে র্যাবের দুটি অস্থায়ী ক্যাম্প রয়েছে। এই এলাকায় চারটি স্থায়ী ক্যাম্প করা গেলে র্যাব দ্রুত পেশাজীবীদের পাশে দাঁড়াতে পারবে এবং একই সঙ্গে সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত করা সম্ভব হবে।
প্রস্তাবিত চারটি ক্যাম্পের মধ্যে কটকা থেকে দুবলারচরের দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার। আর কটকা থেকে সুপতির দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার। প্রস্তাবিত এই তিন ক্যাম্পই সংরক্ষিত বনের ভেতর। বাকি ক্যাম্পটি সংরক্ষিত বনের এক কিলোমিটারের দূরে সাতক্ষীরার শ্যামনগরের মুন্সীগঞ্জে।
২০২১ সালের ২৮ এপ্রিল র্যাব মহাপরিচালকের পক্ষে র্যাবের পরিচালক অপারেশন দুবলারচরে ক্যাম্প স্থাপনের জন্য দেড় একর জমি চেয়ে পুলিশের সদর দপ্তরে চিঠি দেন। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ২০২১ সালের ১৯ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগে চিঠি দেওয়া হয়। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন খান ২৮ জুন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে র্যাবের ক্যাম্প স্থাপনের জন্য দেড় একর জমি চেয়ে চিঠি দেন।
ওই চিঠিতে তিনি বলেন, র্যাব-৬ খুলনার আওতাধীন সুন্দরবন ও তৎসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় বাগেরহাটের শরণখোলার দুবলারচরস্থ আলোরকুলে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের আউটপোস্ট রয়েছে। এই আউটপোস্টের পশ্চিম পাশে র্যাবের ক্যাম্প করার জন্য সংরক্ষিত বনের দেড় একর জমি পুলিশ ইউনিটের অনুকূলে বরাদ্দ বিষয়ে মতামত দেওয়ার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।
কী থাকবে ক্যাম্পে? : পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুবলারচরের সংরক্ষিত বনের দেড় একর জমি চেয়েছে র্যাব। ৬৫ হাজার ৩৪০ বর্গফুটের এই জমিতে র্যাব বেশ কিছু স্থাপনা করবে। এগুলো হলো চেকপোস্ট, রান্নাঘর, ফোর্স ব্যারাক, বোট পুল, ক্যাম্প কমান্ডারের বাসভবন, চিত্তবিনোদনের ঘর ও ফোর্স মেস, খেলাধুলার মাঠ, অফিস, মিঠা পানির পুকুর, নামাজের ঘর, গোসলখানা, হেলিপ্যাডসহ অন্যান্য।