কক্সবাজারে স্বামী ও ৮ মাস বয়সী সন্তানকে আটকে রেখে এক নারীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় পুলিশ ও র্যাবের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্যে উষ্মা প্রকাশ করেছে উচ্চ আদালত। হাইকোর্ট বলেছে, ‘তদন্তের পর্যায়ে এ ধরনের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দুঃখজনক এবং এটি কাম্য নয়। তদন্তকালে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কথা কম বলাই সমীচীন।’
গতকাল মঙ্গলবার কক্সবাজারের ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়ে করা একটি রিট আবেদনের শুনানিকালে এমন মন্তব্য করে বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ। গত সোমবার রিট আবেদনটি করেন অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল হারুন ভূঁইয়া রাসেল।
রিটকারী আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল হারুন ভূঁইয়া রাসেল জানান, আবেদনে কক্সবাজারের দায়রা জজ বা জেলার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে ঘটনার তদন্ত এবং এর প্রতিবেদন ৩০ দিনের মধ্যে হাইকোর্টে দাখিলের নির্দেশনা চাওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় এটি শুনানির পর্যায়ে আসে।
হারুন ভূঁইয়া রাসেল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওই ঘটনার পর পুলিশ ও র্যাবের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে। যে কারণে বিভ্রান্তির এই বিষয়টি আমি আদালতে তুলে ধরে বিচারিক তদন্ত চেয়েছি। আদালত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্যকে দুঃখজনক এবং এটি কাম্য নয় বলে উল্লেখ করেছে।’
এদিকে আদলত সূত্র জানিয়েছে, শুনানিকালে রিট আবেদনকারী আদালতের উদ্দেশে বলেন, ‘কক্সবাজারের এ ঘটনায় পুলিশ ও র্যাব ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছে। তাদের বক্তব্যে অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার আগেই তারা যে বক্তব্য বা বিবৃতি দিচ্ছে, তাতে বিভ্রান্তি বাড়ছে। মনে হচ্ছে ভুক্তভোগী নারীর চরিত্র তাদের মতো করে প্রতিষ্ঠিত করবে। ফলে তদন্ত প্রতিবেদন বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে। এ জন্য গত ২২ ডিসেম্বরের ঘটনার বিচারিক অনুসন্ধানের নির্দেশনা চাচ্ছি।’
তখন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক ইনায়েতুর রহিম বলেন, ‘একটা অনুসন্ধান চলছে। এর মধ্যে কি আমরা আরেকটা অনুসন্ধানের আদেশ দেব? তবে তদন্তকালে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরস্পরবিরোধী বক্তব্য কাম্য নয়। ভুক্তভোগী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জবানবন্দি দিয়েছেন। এই পর্যায়ে এ ধরনের বক্তব্য দুঃখজনক। ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দেওয়া হলে পরে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন হলেও মানুষের মনে নানা রকম ধারণা হতে পারে।’
বিচারক আরও বলেন, ‘মিডিয়া তথ্য খুঁজবেই তাই মিডিয়াকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। গ্রেপ্তার-মামলা কিংবা তদন্তের স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি এজেন্সি আরেকটি এজেন্সিকে সহযোগিতা করতে পারে। আর তদন্ত চলাকালে তদন্ত কর্মকর্তাদের কথা কম বলাই ভালো।’
এ সময় ঘটনার তদন্তকালে এ সম্পর্কে কে কীভাবে এবং কতটুকু কথা বলবেন সে বিষয়ে নীতিমালা থাকা উচিত বলে অভিমত দেয় হাইকোর্ট। এ বিষয়ে একটি নীতিমালা করা যায় কি না, ঘটনা কিংবা তদন্তকালে কে কীভাবে কথা বলবেন এবং কক্সবাজারের ওই ঘটনায় ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্যের মাধ্যমে যাতে বিভ্রান্তি না ছড়ায় সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীকে কথা বলতে বলে হাইকোর্ট। পরে রিট আবেদনটির ওপর শুনানি মুলতবি রাখে আদালত।
ওই মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাগমার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনা বা তদন্তকালে সংশ্লিষ্ট এজেন্সির কে কীভাবে কথা বলবেন সে বিষয়ে হাইকোর্টের একটি রায় রয়েছে। যেটি আজ (গতকাল) শুনানির সময় উল্লেখ করেছেন আদালত। এই রায়ের আলোকে এ বিষয়ে একটি নীতিমালা করার নির্দেশনা ছিল। সেটি হয়েছে কি না এবং কক্সবাজারের ঘটনায় যাতে কোনো বিভ্রান্তিকর বক্তব্য না আসে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আমাকে কথা বলতে বলেছে হাইকোর্ট।’
সংশ্লিষ্ট ঘটনায় করা মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ২২ ডিসেম্বর স্বামী ও আট মাস বয়সী সন্তানকে নিয়ে কক্সবাজার সৈকতের লাবণী পয়েন্টে বেড়াতে যান ভুক্তভোগী নারী। সেখানে আশিক নামে এক যুবকের সঙ্গে তার স্বামীর ধাক্কা লাগা এবং এ নিয়ে বিতন্ডার জেরে স্বামী ও সন্তানকে হত্যার হুমকি দিয়ে ওই নারীকে তুলে নিয়ে শহরের কবিতা চত্বর রোডে ঝুপড়ি একটি চায়ের দোকানের পেছনে ধর্ষণ করে কয়েকজন। পরে কলাতলীর ‘জিয়া গেস্ট ইন’ হোটেলে তাকে নিয়ে যাওয়ার পর সেখানেও দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন ওই নারী। পরে ২৩ ডিসেম্বর রাতে ওই নারীর স্বামী বাদী হয়ে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় মো. আশিকুল ইসলাম আশিক, মো. বাবু, ইসরাফিল হুদা, রিয়াজ উদ্দিনসহ অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, আশিকের সঙ্গে আগে থেকেই পরিচয় ছিল ওই নারীর।
তবে প্রধান আসামি আশিককে গ্রেপ্তারের পর গত ২৬ ডিসেম্বর র্যাব কর্মকর্তারা জানান, দাবিকৃত চাঁদা না পেয়ে নারী পর্যটককে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছে প্রধান আসামি আশিক।