রাজনৈতিক বক্তব্যে মানুষের বিভ্রান্তি বাড়ছে

নীতি ও আদর্শহীন রাজনীতি আমাদের সব প্রতিষ্ঠানকেই নিষ্প্রভ করে দিচ্ছে। পালাক্রমে যে পক্ষই ক্ষমতায় এসেছে, ভোগবাদকেই সবাই প্রশ্রয় দিয়েছে। এ কারণে বড় রাজনৈতিক দলগুলো নৈতিকতা ও আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে ক্ষমতাসীন থাকতে এবং ক্ষমতায় যেতে অহর্নিশি ছুটছেন। আর প্রতিদিন ক্যামেরার সামনে পারস্পরিক দোষারোপের শব্দবাণ ছুড়ে যাচ্ছেন ক্লান্তিহীনভাবে এবং কোনোরূপ বিব্রত না হয়েই। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ প্রশ্নে কণ্ঠশীলন আরও বেড়ে গেছে এখন। আমাদের ক্ষমতার বণিকরা নানা প্রতিষ্ঠান দূষিত করে এখন শেষ ভরসাস্থল আদালতের মহিমাকেও খাটো করে দিচ্ছেন। নানাভাবেই আদালতের মর্যাদা ক্ষুণœ করে ফেলা হচ্ছে। এ নিয়ে তেমন কথা তুলছেন না সুশীলসমাজের মানুষজন। আদালতও পরম উদারতায় সব মেনে নিচ্ছে।

বেশ কয়েক বছর আগে শুনেছিলাম বিচার বিভাগ স্বাধীন হয়ে গেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ প্রতিদিনের অভিজ্ঞতায় তা বিশ্বাস করতে পারছে না। দেশের সরকারের বিধায়করাই বলতে পারবেন আদালত কতটুকু স্বাধীন। আমাদের ছেলেবেলা বা তরুণ বয়সেও আদালতের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে যে সম্ভ্রম প্রতিষ্ঠিত ছিল তা কেমন করে যেন ভেঙে যাচ্ছে। মনস্তাত্ত্বিকভাবেও যদি আদালতের মর্যাদা সাধারণের কাছে খাটো হয়ে যায় তবে এর মারাত্মক পরিণতি জাতিকে বহন করতে হবে। আমাদের লোভী রাজনীতি একে একে সব প্রতিষ্ঠানের মেরুদ- দুর্বল করে দিচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এর গৌরব হারাচ্ছে প্রধানত ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতির নষ্টচর্চার কারণে। আমলাতন্ত্র এর দুর্বল কাঠামোকে আরও ভঙ্গুর করে ফেলছে রাজনৈতিক প্রভাব বলয়ে আটকে গিয়ে। আর রাজনৈতিক নেতাদের বড় অংশ তো ভোগবাদী রাজনীতির পথেই হাঁটছে। তাই রাজনৈতিক ক্ষমতার বলয়ে তৃণমূল থেকে রাজনীতি করে বেরিয়ে আসা শুদ্ধ মানুষদের আর তেমনভাবে দেখা যায় না। আমলা, ব্যবসায়ী ও ভুঁইফোড় রাজনীতিকদেরই ছড়াছড়ি। পচা আমের পাশে রাখলে ভালো আমও নাকি দ্রুত পচে যায়। রাজনীতি অঙ্গনের মেজাজটাও এখন তেমন। রাজনীতির মধ্যে বোধ হয় একটি জাদু বা মায়ার ঘোর রয়েছে। তাই হাঁটতে-চলতে বা টেলিভিশন টকশোতে চোখ রাখলে দলীয় পরিচয়ের শিক্ষিত মানুষরা কীভাবে বিবেক ও সত্য আড়াল করে যার যার দলের সাফাই গেয়ে যেতে পারেন, এর নির্লজ্জ প্রকাশ দেখা যায়। এখন যেন বিবেক দিয়ে সত্য বলার সাহস বা সততা কারও মধ্যে নেই। তবে বলা যায় নানা কিছুর পরেও আদালতের প্রতি রাজনীতিকদের আচরণ-প্রতিক্রিয়া শুনে-দেখে আমাদের শঙ্কা প্রতিদিন বাড়ছে, তাহলে বোধহয় সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল বলে আর কিছু থাকল না। রাজনীতি হোক বা দুর্নীতি হোক আদালতে কোনো কিছুর রায় পক্ষে না গেলে এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে থাকেন রাজনীতিকরা। রাজনৈতিক নেতারা রায় প্রত্যাখ্যান করেন বা মিথ্যা রায় বলে মতামত ব্যক্ত করেন। অর্থাৎ মহামান্য বিচারপতি বা বিচারকদেরই যেন কাঠগড়ায় দাঁড় করান। আমরা বুঝে পাই না এসব যদি আদালত অবমাননা না হয় তাহলে অবমাননা কী? আমরা তো জানতাম আদালতে কোনো মামলার রায় প্রকাশিত হলে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায় না। শুধু চাইলে আপিল করা যায়। সর্বোচ্চ আদালতের রায় বিনা প্রশ্নে মেনে নিতে হয়। আগে শুনতাম ‘হাকিম নড়ে তো হুকুম নড়ে না’। এখন তো দেখছি রাজনীতির তোড়ে হাকিম-হুকুম সবই নড়ে।

রাজনীতিবিদরা প্রায়ই তাদের বিরুদ্ধে করা মামলাকে রাজনৈতিক মামলা এবং মিথ্যা মামলা বলে অভিহিত করেন। এখন আবার আরেকটি শব্দ প্রচলিত হতে যাচ্ছে নাম যার ‘গায়েবি মামলা’। বুঝলাম আমাদের দেশের অসংস্কৃত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিপক্ষকে জব্দ করতে মিথ্যা বা সাজানো মামলা দেওয়া হতে পারে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়েও সাজানো মামলা দেয় কোনো পক্ষ। কিন্তু কোনো মামলা মিথ্যা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা তার বিচার করবে কে? ডাকাত বা দুর্নীতিবাজ ধরা পড়ার পরই কি স্বীকার করে সে দোষ করেছে। আদালতে কেইস উঠে গেলে বাকি নির্ধারণের দায়িত্ব তো আদালতেরই। প্রয়োজন হলে পুলিশ রিমান্ড চায় আদালতের কাছে। তাই কোনো মামলা মিথ্যা না সত্যি সে রায় তো আদালতের কাছ থেকেই আসতে হবে। এই যে খালেদা জিয়ার মামলা প্রসঙ্গ এলেই বিএনপি নেতারা বলতে থাকেন, মিথ্যা মামলা। অথচ তারা যথারীতি লড়াই করেন আদালতে। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। আদালতে মামলা উঠলে আর সেই মামলায় আসামি পক্ষ অংশ নেওয়ার পরও মামলা চলাকালীন দায়িত্বশীল জায়গা থেকে প্রকাশ্যে একে মিথ্যা মামলা বলা আদালতকে বিভ্রান্ত করা বা প্রভাবিত করার নামান্তর বলে সাধারণ যুক্তিতে মনে হয়। অথচ সেই অন্যায়টিই করতে থাকেন আমাদের রাজনৈতিক অঞ্চলের মানুষরা। শুনানি শেষে রায়ের দিন ধার্য হয়। উভয় পক্ষ এবং দেশবাসী অধীর আগ্রহ ও শঙ্কা নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। রায় ঘোষিত হয়। রায় পক্ষে না গেলেই আদালত প্রাঙ্গণ থেকে সেøাগান উঠতে থাকে সাজানো রায় বলে। ভাবখানা ‘আমরা যেমন চাইব তেমন রায় হতে হবে’। বিচারক ও বিচারব্যবস্থার প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শনের পর অবশেষে আপিল আদালতে যেতে থাকেন। সর্বোচ্চ আদালত থেকেও রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা অপরাধী সাব্যস্ত হলে আবারও সাজানো রায় বলে অভিযোগ আনা হয়। এমন হরহামেশাই হচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের বিরুদ্ধে সাধারণত আদালত অবমাননার দ- আরোপিত হয় না। অথচ সাধারণ মানুষ অমনটি করলে তার কি রেহাই মিলত? অমন বাস্তবতায় সাধারণ নাগরিক কি বিচার ব্যবস্থা নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়বে না?

এ দেশে দেখা যায় অনেক বেশি ‘গণতান্ত্রিক’ চেতনা ধারণ করেন দলীয় পরিচয় গায়ে আঁটা আইনজীবীরা। বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী ছাত্ররা এবং আদালত প্রাঙ্গণে দলীয় আইনজীবীরা প্রায়ই দলীয় ইস্যুতে মিছিল করেন। সেøাগান তোলেন। এমন দৃশ্য খুব কম দেশেই আছে। যারা আইনজীবী, আইনচর্চাই যাদের কাজ তারা যখন বিচারক-বিচারপতিদের রায়ের বিরুদ্ধে অন্ধ দলীয়কর্মীর মতো প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন, রায়কে নির্দেশিত বা সাজানো রায় বলতে থাকেন তখন সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বিভ্রান্ত হবেন। এভাবে আদালত ও উচ্চ আদালতের গরিমা সাধারণের চোখে নিষ্প্রভ হতে বাধ্য। তার পরও এর প্রতিবিধান হতে আমরা দেখি না। আদালতকে এভাবে নিরীহ দশায় দেখতে এ দেশের সাধারণ মানুষ চায় না। আদালতকে কি আমাদের ক্ষমতার রাজনীতি দুর্বল করে ফেলেছে? বিরোধী দলের প্রকাশ্য অভিযোগের মতো আদালত কি ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছে পূরণে ব্যবহৃত হয়? এভাবে যদি আদালতকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলা হয় তা কি কোনো পক্ষের জন্য স্বস্তির কারণ হবে? এ দেশের নষ্ট রাজনীতির বাস্তবতায় লাভ ও লোভের জগতে একে একে সব প্রতিষ্ঠান রাজনীতির বলয়ে বন্দি হয়ে যাচ্ছে। আদালতের মর্যাদাও যদি সাধারণ মানুষের চোখে নিষ্প্রভ হয়ে যায় তাহলে খুব অসহায় হয়ে পড়বে এই জাতি। রাজনীতিকদের বড় অংশই ক্রমে গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। তাদের সততা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে প্রতিদিন। ডিগবাজির রাজনীতিতে আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়েছেন অধিকাংশই। আজকাল যেকোনো নির্বাচনে বিপুল মনোনয়নপত্র জমা হওয়ায় একটি বিস্ময় তৈরি হয়েছে বৈকি! রাজনীতির সঙ্গে কখনো সম্পর্ক ছিল না এমন অনেক বণিক, শিক্ষক, আমলা, তারকা সবাই নির্বাচন করতে মরিয়া কেন! পরিপার্শ্ব দেখে সাধারণ ধারণা এমপি হতে পারাটা লাভজনক ব্যবসা। এই ব্যবসায় অনেকেই সফল হতে চান। অথবা অনেক দুর্নীতিবাজ আছেন যারা মনে করেন কোনো বড় দলের সঙ্গে ভিড়তে পারলে এবং এমপি হতে পারলে সাত খুন মাফ হবে। এই যদি সত্য হয় তাহলে দেশ ও জনগণের কল্যাণ চিন্তায় কারা আসবেন?

বিগত জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের খবর গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছিল। এতে বিএনপি, জাপা, গণফোরামসহ ঐক্যজোট, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দু-চারজন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছিল। বাতিলের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। এদের কেউ সাজাপ্রাপ্ত আসামি বলে আবার অনেকে ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে। এমনই দুর্ভাগ্য যে শর্তপূরণ না করা এসব বাতিলের দলে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রধান, কোনো দলের মহাসচিব, কোনো বড় দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য, প্রাক্তন এমপি অনেকেই ছিলেন। এই যদি হয় বাস্তব চিত্র তাহলে ত্রাতা হবেন কে? আইনপ্রণেতা হওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে যারা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন তাদের এই যদি হয় পরিচিতি তাহলে ঘোর অমানিশা ছাড়া আর কী দেখব? রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারকদের সবিনয়ে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয় এমন যদি হয় নিজ দলের প্রার্থীদের আমলনামা, তাহলে দল থেকে প্রার্থী বাছাই করলেন কেমন করে? এবার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনেও কি অনেক ক্ষেত্রে অভিন্ন ছবি দেখা যায়নি! এভাবে আমাদের রাজনীতিতে শুধু অন্ধকারই দেখতে হচ্ছে। আর অমন একটি দমবন্ধকর অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সবার আগে প্রয়োজন আইনের শাসন প্রবর্তন করা। আদালতের শক্ত অবস্থান থাকা এর পূর্বশর্ত। এ কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর যেমন উচিত দলীয় স্বার্থ অর্জনের জন্য আদালতকে ব্যবহার না করা আর আদালতেরও কর্তব্য হবে এর ঐতিহ্যিক মর্যাদার জায়গাটিতে ফিরে যাওয়া।

রাজনীতিকদের তথাকথিত রাজনৈতিক বক্তব্য যদি আদালতের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে তাহলে দল পরিচয় বিচার না করে আদালতের কাছ থেকে কাম্য প্রতিক্রিয়াই আমরা প্রত্যাশা করব। আদালত কঠিন হতে পারলে এবং আইনের পথটাকে শক্তিশালী করতে পারলে রাজনৈতিক ভ্রষ্টাচার অনেকটাই কমে যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

লেখক অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com