পুলিশ-বিজিবির গুলিতে পাঁচসহ সহিংসতায় নিহত ১১ জন

প্রাণহানি, সংঘর্ষ, বোমাবাজি ও গুলিবর্ষণ, কেন্দ্র দখল করে জাল ভোটদান ও ব্যালট পেপার-বাক্স ছিনতাই, প্রকাশ্যে নৌকায় সিল, এজেন্ট ও প্রার্থীদের লাঞ্ছিত, প্রিসাইডিং কর্মকর্তা এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলা, ভোটকেন্দ্র ও পুলিশের গাড়িতে আগুন, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ভোটারদের মধ্যে টাকা বিতরণ এবং ভয় দেখিয়ে নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দিতে বাধ্য করাসহ নানা অনিয়মের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে পঞ্চম ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন। গতকাল বুধবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ভোটগ্রহণের সময় ও ভোটপূর্ব নির্বাচনী সহিংসতায় এবং ভোট গণনাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে বগুড়া, নওগাঁ, মানিকগঞ্জ, চট্টগ্রাম, গাইবান্ধা, ঝিনাইদহ ও চাঁদপুরে কমপক্ষে ১১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বগুড়ার গাবতলীতে কেন্দ্রে ভোট গণনা না করেই ব্যালট বাক্স উপজেলা সদরে নেওয়ার সময় বাধা দিতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে এক নারীসহ চারজন নিহত হয়েছেন। আর নওগাঁতেও ভোট গণনাকে কেন্দ্র করে পুলিশের গুলিতে একজন নিহত হয়েছে। কয়েক ধাপে অনুষ্ঠিত এবারের ইউপি নির্বাচন ঘিরে এ নিয়ে ৯৯ জনের প্রাণ গেল। এছাড়া গতকাল ভোটগ্রহণের সময় দেশের বিভিন্ন জায়গায় নির্বাচনী সহিংসতায় আহত হয়েছে আরও কয়েকশ মানুষ।

এদিকে অধিকাংশ কেন্দ্রে সকাল সকাল ভোটারদের প্রচুর উপস্থিতি থাকলেও অনেক কেন্দ্রে ইচ্ছাকৃতভাবে ভোটগ্রহণে বিলম্ব করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমনকি পাঁচ-ছয় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও ভোট দিতে না পেরে অনেক ভোটার ফিরে যান। ভোটে কারচুপির জন্য প্রকৃত ভোটাররা যাতে ভোট না দিতে পারে এজন্যই এটা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট অনেকের মত।

অনিয়মের অভিযোগে গতকালের নির্বাচনে নয়টি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ বন্ধ করে দেয় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এমনকি অনিয়মের কারণে সিলেটের জকিগঞ্জে ভোটগ্রহণের দায়িত্বে থাকা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও কৃষি কর্মকর্তাকে (রিটার্নিং কর্মকর্তা) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে এতসব অনিয়ম ও সহিংসতার পরও কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টিতে ‘ভোট খুব ভালো’ হয়েছে। গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে ইউপি ভোটপরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে ইসি সচিব মো. হুমায়ুন কবীর খোন্দকার এমনটাই দাবি করেন। এছাড়া ভোটে প্রাণহানির দায় নিতেও রাজি নয় ইসি। কমিশনের দাবি, প্রাণহানির দায় প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের।

গতকালের নির্বাচনে ৭০ শতাংশের ওপরে ভোট পড়েছে বলে আশা করছেন জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনে ইসি সচিব বলেন, ‘বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা ছাড়া নির্বাচন ভালো হয়েছে। সামনে আরও ভালো হবে।’

তিনি জানান, প্রিসাইডিং কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত হয়ে পড়া ও অনিয়মের কারণে নয়টি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ভোট দিতে গিয়ে প্রাণহানির দায় কার সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবীর খোন্দকার বলেন, ‘প্রার্থী ও সমর্থকরা দায় নিবে। কারণ তারা কেন এটি করছেন?’ এই সময় প্রার্থী ও সমর্থকদের অতি আবেগী না হওয়ার জন্যও আহ্বান জানান সচিব।

তিনি বলেন, ‘সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলায় উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও কৃষি কর্মকর্তাকে (রিটার্নিং কর্মকর্তা) আইনবহির্ভূত কাজের জন্য জেলা প্রশাসক ও পুলিশের এসপি গ্রেপ্তার করেছেন। তাদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে এসেছি। ওই ইউনিয়নটির নির্বাচন বন্ধ করা হয়েছে।’

ইউপি নির্বাচন ঘিরে গতকাল মারা যাওয়াদের মধ্যে বগুড়ার গাবতলীতে ভোট গণনা না করেই ব্যালট বাক্স উপজেলা সদরে নেওয়ার চেষ্টাকালে বাধা দিতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে এক নারীসহ চারজন নিহত হন। সন্ধ্যায় বালিয়াদীঘি ইউনিয়নের কালাইহাটা উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে।

নিহতরা হলেন একই ইউনিয়নের কালাইহাটা গ্রামের খোকনের স্ত্রী কুলসুম আক্তার, মকবুল হোসেনের ছেলে আলমগীর হোসেন, মৃত ইফাত উল্লাহর ছেলে আব্দুর রশিদ ও আব্দুর রাজ্জাক। নিহত রাজ্জাকের বাবার নাম নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আলী হায়দার চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা তিনজন নিহত হয়েছে বলে শুনেছি। তবে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত কারও লাশই পুলিশ হেফাজতে নেওয়া সম্ভব হয়নি।’

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ভোট শেষে গণনা ও ফলাফল ঘোষণা না করেই কালাইহাটা উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ব্যালট বাক্স উপজেলা সদরে নেওয়ার উদ্যোগ নেন। এ নিয়ে নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তারা ওই কেন্দ্রেই ভোট গণনা করে ফলাফল ঘোষণার দাবি জানালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের হটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এতে ওই চেয়ারম্যান প্রার্থীর বিক্ষুব্ধ কর্মী-সমর্থকরা পুলিশ, বিজিবি ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়িতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করে। তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে গুলি চালায় পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা। পরে রাত ৮টার দিকে পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে আসলে ভোটকেন্দ্রেই ব্যালট পেপার গণনা শেষে ফলাফল ঘোষণা করা হয়।

নৌকার প্রার্থী ইউনুছ আলী ফকির স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করে বলেন, ‘নির্বাচন কর্মকর্তারা ভোট গণনা নিয়ে টালবাহনা করার কারণে ভোটাররা কেন্দ্রের বাইরে অবস্থান নেন। তাদের হটিয়ে দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। এতে ঘটনাস্থলেই তিনজন এবং রাজ্জাক নামে একজন গাবতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মারা গেছেন বলে তথ্য পেয়েছি।’

গাবতলী মডেল থানার ওসি জিয়া লতিফুল ইসলাম বলেন, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুলি ছোড়ে। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে। নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ফলাফল ঘোষণা শেষে নিরাপদে উপজেলা সদরে পৌঁছেছেন। এ ঘটনায় হতাহতদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তথ্য পেলে বিস্তারিত জানানো সম্ভব হবে।’

এদিকে জেলার গাবতলীতে ভোটগ্রহণ চলাকালে দুই সদস্য প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষের সময় একজনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তার নাম জাকির হোসেন (৩৫)। গতকাল দুপুরে রামেশ্বরপুর ইউনিয়নের জাইগুলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের বাইরে এ ঘটনা ঘটে।

নিহত জাকির জাইগুলি উত্তরপাড়ার মৃত লয়া মিয়ার ছেলে। তিনি রঙ মিস্ত্রির কাজ করতেন।

গ্রামবাসী জানায়, নিহত জাকির নির্বাচনে মেম্বার প্রার্থী সাইদুল ইসলামের (টিউবওয়েল প্রতিক) সমর্থক হিসেবে কাজ করছিলেন। ভোটকেন্দ্রের বাইরে ভোটারদের উৎসাহিত করছিলেন সাইদুল ইসলামের  টিউবওয়েল প্রতিকের কর্মী সমর্থকরা। এ সময় সেখানে আরেক মেম্বার প্রার্থী মিঠু মিয়ার (ফুটবল প্রতীক) কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে বিরোধ শুরু হয়। এক পর্যায়ে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হলে জাকির হোসেনকে প্রতিপক্ষের লোকজন ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করে। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান জাকির।

নওগাঁর পতœীতলায় ভোটগ্রহণ শেষে গণনার সময় পুলিশের সঙ্গে এক প্রার্থীর সমর্থকদের সংষর্ষে ১ জন নিহত হয়েছে। পুলিশের ছোড়া গুলিতে ওই ব্যক্তি মারা গেছেন বলে জানিয়েছে গ্রামবাসী। তবে নিহতের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। গতকাল সন্ধ্যার পর ঘোষনগর কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। এই সংঘর্ষে আরও দুজন আহত হয়েছেন। এ সময় পুলিশের দুটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আফতাব উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

গাইবান্ধায় কেন্দ্রের সামনে কুপিয়ে হত্যা : গাইবান্ধার সাঘাটায় ভোটকেন্দ্রের সামনে এক ইউপি সদস্য প্রার্থীর সমর্থককে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। তার নাম আবু তাহের (৪০)। গতকাল বিকেলে জুমারবাড়ী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের জুমারবাড়ী আদর্শ কলেজ কেন্দ্রের বাইরে এ ঘটনা ঘটে। নিহত আবু তাহের একই ইউনিয়নের মামুদপুর গ্রামের মো. ওমর আলীর ছেলে।

নিহতের পরিবারের সদস্যরা এবং গ্রামবাসী জানায়, ভোটগ্রহণ চলাকালে বিকেলে কেন্দ্রের বাইরে সদস্য প্রার্থী আইজল মিয়ার সমর্থক আবু তাহেরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী সদস্য প্রার্থী রাসেল আহমেদের কর্মী-সমর্থকদের কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে আবু তাহেরকে একা পেয়ে রাসেলের কর্মী-সমর্থকরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করে।

আবু তাহেরের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সাঘাটার ইউএনও সরদার মোস্তফা শাহিন।

আনোয়ারায় যুবক নিহত : চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় নির্বাচনী সহিংসতায় ওমকার দত্ত (৩৫) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। গতকাল বেলা ১টার দিকে চাতরী ইউনিয়নের সিংহরা ৭ নম্বর ওয়ার্ডে এ ঘটনা ঘটে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আনোয়ারা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা সাইয়েদ মো.আনোয়ার খালেদ।

চাঁদপুরে ছুরিকাঘাতে দুজন নিহত : নির্বাচনী সহিংসতায় চাঁদপুরের হাইমচরে একজনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল বিকেলে ছুরিকাঘাতে তিনি মারা যান। পুলিশ সুপার মিলন মাহমুদ সন্ধ্যায় বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

জানা গেছে, নীলকমল ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের বাহেরচর এলাকায় বিকেল সাড়ে ৩টায় দুই চেয়ারম্যান প্রার্থী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে ছুরিকাঘাতে একজন মারা গেছেন। তার নাম-পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তিনি পাশ্ববর্তী শরীয়তপুর জেলার বাসিন্দা বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

মানিকগঞ্জে সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে নারীর মৃত্যু: মানিকগঞ্জের দৌলতপুরে ভোটকেন্দ্রের পাশে দুই মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষের মাঝে পড়ে সমেলা খাতুন (৫০) নামের এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল দুপুরে বাচামারা ইউনিয়নের বাচামারা ২নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্রের পাশে এ ঘটনা ঘটে। মারা যাওয়া সলেমা ওই এলাকার মাহাতাবের স্ত্রী।  বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন শিবালয় সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তানিয়া সুলতানা।

তিনি বলেন, ‘বাচামারা ইউনিয়নের ২নং সরকারি প্রাথমিক বিদযালয়ের কেন্দ্রের পাশে দুই মেম্বার সমর্থকদের মাঝে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় সমেলা খাতুন নামে ওই নারী স্ট্রোক করে মারা যান।’

এছাড়া ঝিনাইদহে কয়েক দিন আগে নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনায় আহত একজন গতকাল চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। তার নাম অখিল সরকার। তিনি শৈলকূপার সারুটিয়া ইউনিয়নে গত ৩১ ডিসেম্বর নির্বাচন নিয়ে সংঘর্ষে আহত হয়েছিলেন।

সাভারে কেন্দ্র দখল করে প্রকাশ্যে নৌকায় সিল : ঢাকার সাভারে কেন্দ্র দখল করে প্রকাশ্যে নৌকায় সিল এবং এজেন্ট ও প্রার্থীদের লাঞ্ছিত করার মধ্য দিয়ে ১১টি ইউনিয়নে ভোটগ্রহণ হয়েছে। দিনভর বিভিন্ন কেন্দ্রে জালভোট প্রদান নিয়ে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে।

নরসিংদীতে জালভোট ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া : জালভোট, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়াসহ বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে নরসিংদীর ১৫টি ইউপিতে ভোট হয়েছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটারের উপস্থিতির পাশাপাশি বাড়ে সংঘর্ষের ঘটনা। সকাল থেকে বিভিন্ন ইউনিয়নের ভোটকেন্দ্র দখল নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনায় অন্তত ৬ জন আহতের খবর পাওয়া গেছে।

সিলেটে ২ নির্বাচন কর্মকর্তা আটক, ১ ইউপিতে নির্বাচন স্থগিত : সিলেটের কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ উপজেলায় ১৮টি ইউপিতে গতকাল বুধবার ভোটগ্রহণ হয়েছে। এর মধ্যে জকিগঞ্জে বড় ধরনের ভোট জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়েছে। সিলমারা ব্যালট পেপার কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়ার সময় হাতেনাতে আটক হয়েছেন দুজন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা। তারা হলেন আরিফুল হক ও সাদমান সাকিব। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই ইউপির নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। এ ছাড়া একই উপজেলার আরেকটি ইউপির একটি কেন্দ্রের ভোট বাক্স ছিনতাই করে পুকুরে ফেলে দেওয়ার ঘটনায় ওই কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত হয়েছে।

ফেনীতে নৌকার ভোটদান প্রার্থীর এজেন্টের : ফেনী সদর উপজেলার ১২টি ইউপি গতকাল ভোট হয়েছে। কয়েকটি ইউনিয়নে ভোটারকে দাঁড় করিয়ে ব্যালট পেপারে নৌকার এজেন্টের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার অভিযোগ করেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। ভোটাররা শুধু ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বার সদস্য ও সংরক্ষিত মহিলা সদস্যদের ভোট দিতে পেরেছে।

ফরহাদ নগর ইউনিয়নে ফরহাদ নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নৌকা প্রতীকের এজেন্ট আনোয়ার হোসেনকে ব্যালট পেপার ছিনিয়ে ভোটদানের অভিযোগে আটক করা হয়েছে। এ সময় ৩০ মিনিট ভোটগ্রহণ স্থগিত করেন প্রিসাইডিং অফিসার। ধলিয়া ইউনিয়নের ধলিয়া উচ্চবিদ্যালয় মাঠে সত্তরোর্ধ্ব এক নারী জোরপূর্বক নৌকায় ভোট দেওয়ার অভিযোগ করেন জেলা প্রশাসকের কাছে। ফরহাদ নগরের নৈরাজপুর কেন্দে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মোশারফ হোসেন টিপুর সমর্থকরা জোর করে কেন্দ্রের ভেতরে ভোট দেওয়ার চেষ্টা করলে বিশৃঙ্খলার কারণে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়। আটক করা হয় ৬ জনকে।

জামালপুরে পুলিশের গাড়িতে আগুন, আহত ৩০ : জামালপুরের বকশীগঞ্জে মেরুরচর ইউনিয়নে দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় পুলিশের গাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। আহত হয়েছে ১০ পুলিশ সদস্যসহ ৩০ জন।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, দুপুরে মেরুরচর ইউনিয়নের হাছেন আলী উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী সিদ্দিকুর রহমান ও স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী মনোয়ার হোসেনের সমর্থকদের মাঝে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে তারা। ভাঙচুর করা হয় পুলিশের ৩টি গাড়ি। অগ্নিসংযোগ করা হয় পুলিশের একটি গাড়ি ও ৩টি মোটরসাইকেলে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ১৫০ রাউন্ড শটগানের গুলি ছোড়ে পুলিশ।

সিরাজগঞ্জে হামলা, ককটেল বিস্ফোরণ : সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার মেছড়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে রূপসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে জোর করে ভোট দেওয়াকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. আব্দুল মজিদ মাস্টার ও স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, হামলা, সংঘর্ষ ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ১ ঘণ্টাব্যাপী এ সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হয়।

শরীয়তপুরে কেন্দ্রে আগুন, সাংবাদিকদের ওপর গুলি ও বোমা হামলা :

শরীয়তপুরের নড়িয়ার ভোজেশ্বর ইউপি নির্বাচনে ৫ নম্বর ওয়ার্ডের দুলুখ- সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আগুন ধরিয়ে দেয় সন্ত্রাসীরা। এ ছাড়া ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ও গুলি ছুড়ে কেন্দ্র দখল করা হয়। এ সময় সাংবাদিকদের অবরুদ্ধ করে তাদের ওপর গুলি ও বোমা হামলা করা হয়। সেখানে যমুনা টেলিভিশনের প্রতিবেদক কাজী মনিরুজ্জামান, কালের কণ্ঠের প্রতিনিধি শরীফুল আলম ইমন ও সহকারি প্রিসাইডিং কর্মকর্তা জাকারিয়া মাসুদের মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়া হয়। গতকাল বেলা সোয়া ২টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। অভিযোগ উঠেছে চেয়ারম্যান প্রার্থী দেলোয়ার হোসেনের সমর্থকরা এ হামলা করেছেন। পরে ওই কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ সময় নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করা ১০ ব্যক্তি আহত হয়েছেন।

শ্রীপুরে কেন্দ্র দখল, ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের চেষ্টা : গাজীপুরের শ্রীপুরে ব্যালট পেপার ছিনতাই ও কেন্দ্র দখল নিয়ে একাধিক মেম্বার প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকের মধ্যে মারামারি হয়।  গুলি ছোড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নির্দেশ দেন প্রিসাইডিং কর্মকার্ত। দুটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ সাময়িক বন্ধ রাখা হয়। এ ঘটনায় একাধিক প্রার্থীর অন্তত বিশ কর্মী-সমর্থক আহত হয়েছে।

যশোরের দুই কেন্দ্রে বোমাবাজি : যশোর সদর উপজেলায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দুটি কেন্দ্রে বোমাবাজি ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় এক পুলিশ সদস্যসহ ৫ জন আহত হয় ও ৫ জনকে আটক করেছে পুলিশ। কাশিমপুর ইউনিয়নের ডাকাতিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে জালভোট দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। এ সময় ১৫ মিনিট ভোটগ্রহণ বন্ধ ছিল। 

ভোটকেন্দ্রে টাকাসহ চেয়ারম্যান প্রার্থীর ভাই আটক : ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ভোটকেন্দ্রের ভেতরে মো. কারিফ (৩৮) নামে এক পোলিং এজেন্টকে নগদ টাকাসহ পাওয়ায় এক মাসের কারাদ- দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সদর উপজেলার নাটাই উত্তর ইউনিয়নের ভাটপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্র থেকে তাকে আটক করা হয়। দ-প্রাপ্ত কারিফ ওই ইউনিয়নের স্বতন্ত্র প্রার্থী আনারস প্রতীকের হালিম শাহ লিল মিয়ার ছোট ভাই ও পোলিং এজেন্ট।

এদিকে সদর উপজেলার বাসুদেব ইউনিয়নের দতাইসার এলাকায় দুই মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়েছে। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

নেত্রকোনায় সংঘর্ষ, ভোটগ্রহণ স্থগিত: নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায় চিরাং ইউনিয়নের ছিলিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে দুই সাধারণ সদস্য প্রার্থীর এজেন্টের মধ্যে কথা-কাটাকাটির জের ধরে দুই গ্রুপ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে এবং ব্যালট বাক্সে অবৈধভাবে সিল মারার কারণে বিকেল সোয়া ৩টার দিকে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়।

এদিকে দুপুর পৌনে ২টার দিকে একই ইউপির পূর্বরায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দরজা ভেঙে ছিনিয়ে নেওয়ার সময় পাঁচ রাউন্ড গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে।

মানিকগঞ্জে ১০ ছাত্রলীগ কর্মীর কারাদন্ড : মানিকগঞ্জের হরিরামপুরের গালা ইউনিয়ন পরিষদের কামার ঘোনা ভোটকেন্দ্রে প্রভাব বিস্তার করার দায়ে ১০ জনকে ৭ দিনের কারাদ- দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক।

ঝিনাইদহে ১০৯ বছরের বৃদ্ধার ভোট দিল কে : ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার কৃপালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের ১০৯ বছরের বৃদ্ধা জেবুন্নেছা ঘন কুয়াশা আর কনকনে শীত উপেক্ষা করে ভোট দেওয়ার জন্য আসেন কেন্দ্রে। সেখানে এসে জানতে পারেন অন্য কেউ তার ভোটটি আগেই দিয়ে ফেলেছে।

প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা এবং সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলার প্রতিনিধিরা