দুই দশকের সংসার। দীর্ঘ এই সময়ে গেছে নানান ঘাতপ্রতিঘাত। অশান্তি সহ্য করেই দুই সন্তানকে বড় করছিলেন স্কুল শিক্ষিকা ফাতেমা খাতুন। সংসারের আগুনেই দগ্ধ হয়ে এখন জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রাজশাহী মহানগরীর মহিষবাথান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফাতেমা খাতুন। তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়ার অভিযোগ স্বামীর বিরুদ্ধে।
বুধবার গভীর রাতে নগরীর বুলনপুর গোয়ালপাড়া এলাকায় নিজ বাড়িতেই অগ্নিদগ্ধ হন ফাতেমা খাতুন। ঘটনার পর থেকে সাদিকুল ইসলাম পলাতক রয়েছেন। তার মোবাইল ফোনটিও বন্ধ।
অগ্নিদগ্ধ ফাতেমার ছোট বোন নূরজাহান খাতুন জানান, বিয়ের পর থেকে গত ২০ বছর ধরেই স্ত্রীকে নির্যাতন করে আসছিলেন সাদিকুল। পারিবারিক ও সামাজিক চাপের কারণে বিষয়টি এতদিন ধরে ধামা চাপা দেওয়া হচ্ছিল। আবার দুই সন্তান থাকায় নির্যাতন সয়েই এত দিন সংসার করে আসছিলেন তার বোন ফাতেমা।
এরই মধ্যে ফাতেমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেন সাদিকুল।
নূরজাহান জানান, বুধবার দিবাগত রাত ১টার দিকে হঠাৎ করেই গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন সাদিকুল। এরপরই তিনি পালিয়ে যান। খবর পেয়ে পরে তারা গিয়ে ফাতেমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন।
ফাতেমা খাতুনের মেয়ে আফসানা ইসলাম জানায়, রাত একটার দিকে তার বাবা পাশের ঘর থেকে একটি দেশলাই নিয়ে যায়। এরপরপরই মায়ের চিৎকার শুনতে পাই। গিয়ে দেখি আগুন জ্বলছে। বাথরুম থেকে পানি এনে আগুন নেভাই। এরপরই আশপাশের লোকজন ছুটে আসে। নানির বাড়ি থেকে সবাই এসে মাকে হাসপাতালে ভর্তি করান।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের প্রধান ডা. আফরোজা নাজনীন জানান, ফাতেমা খাতুনের শরীরে আগুন লাগার আগে কেরোসিন ঢালা হয়েছিল বলে তারা জানতে পেরেছেন। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। শরীরের ২৫ ভাগ দগ্ধ হয়েছে। তার মুখমণ্ডল পুড়ে গেছে, সামনের গলা পুড়ে গেছে, দুই হাত, কান পুড়ে গেছে, বুক পুড়েছে। তার শ^াসনালীও পোড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ডা. আফরোজা বলেন, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মেঝেতে রেখে তার চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। রোগীর অবস্থা এমনিতেই ভালো না। মেঝেতে রাখতে হওয়ায় যে কোন সময় অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যেতে পারে।
এদিকে, অভিযুক্ত সাদিকুল ইসলামের বাবা রাসিকের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সাজ্জাদ হোসেন নিজেই তার ছেলের অপরাধের জন্য শাস্তি দাবি করেছেন।
তিনি জানান, ঘটনা শোনার পর তিনি সকালে হাসপাতালে গিয়ে ছেলের বউ এর সাথে কথা বলে এসেছেন।
সাজ্জাদ হোসেন জানান, বাড়ির পাশেই ওর শ্বশুর বাড়ি। সাদিকুল তখন এসএসসি পরীক্ষার্থী আর ফাতেমা ৮ম শ্রেণিতে পড়ে। ওই সময় তারা নিজেরাই পছন্দ করে বিয়ে করেছিল। অনেক দিন আগে থেকেই ওরা আলাদা বাড়িতে থাকে। বিয়ের পর থেকেই ওদের পরিবারে অশান্তি। মেয়েটা ভালোই, ভদ্র। সরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করে। কিন্তু সাদিকুল তেমন কিছুই করে না। ও অনেক আগে থেকেই মেয়েটাকে নির্যাতন করে বলে শুনতে পাই। মাঝেমধ্যে শাসন করে, ঠিক করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু ঠিক হয়নি। ও যে কাজ করেছে ওর যথাযথ শাস্তি হওয়া উচিত।
রাজপাড়া থানার ডিউটি অফিসার এসআই তসলিমা খাতুন জানান, অগ্নিদগ্ধ ফাতেমা খাতুন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। পুলিশ এটি তদন্ত করছে। ঘটনার পর থেকেই সাদিকুল পলাতক রয়েছে। পুলিশ তাকে ধরারও চেষ্টা করছে।