সরকারের ৩ বছর পূর্তি

আজ জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগ সরকারের বর্তমান মেয়াদের তিন বছর পূর্তি উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানান। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো ও রেডিও স্টেশনগুলোতে তার ভাষণটি সম্প্রচারিত হবে।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিজয়ী হওয়ার পর ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি শেখ হাসিনা চতুর্থবারের মতো (টানা তিনবার) প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহণ করেন।

এদিকে গতকাল সকালে আন্তর্জাতিক মানের স্থাপত্য কীর্তি বঙ্গবন্ধু সামরিক জাদুঘর উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় তিনি বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু সামরিক জাদুঘর (বিএমএম) দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দিতে তরুণ প্রজন্মের পাশাপাশি শিশুদেরও অনুপ্রাণিত করবে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু সামরিক জাদুঘর থেকে তরুণ প্রজন্ম দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হবে। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য সশস্ত্র বাহিনী সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীতে যোগদানে এবং দেশপ্রেমে তরুণরা উদ্বুদ্ধ হবে।’

প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রাজধানীর বিজয় সরণির বঙ্গবন্ধু জাদুঘর প্রান্তে মূল অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন।

সরকারপ্রধান বলেন, ‘জাদুঘরটি দেশের সশস্ত্র বাহিনীর জন্য একটি মাইলফলক হবে। যার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্ম ও শিশুরা মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর অবদান সম্পর্কে জানতে পারবে। আমি মনে করি এটা হবে সারা পৃথিবীর মধ্যে একটি শ্রেষ্ঠ প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক জাদুঘর। এখানে সেনা, নৌ এবং বিমানবাহিনীর জন্য পৃথক প্রদর্শনীর ব্যবস্থা থাকায় এখানে আসা তরুণ থেকে বয়োবৃদ্ধরা যেমন এ সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করতে পারবেন তেমনি তরুণ প্রজন্ম সশস্ত্র বাহিনীতে যোগদানে আরও আগ্রহী হবে। আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আরও উদ্বুদ্ধ হবে। কাজেই জাদুঘরটি শুধু প্রদর্শনীর জন্যই নয়, এটা তরুণ প্রজন্মকে যেমন আকর্ষণ করবে তেমনি তাদের দেশপ্রেমেও উদ্বুদ্ধ করবে।’

তিনি আরও জানান, যে কারণে ক্ষুদ্র পরিসরে থাকা আমাদের সামরিক জাদুঘরকে বৃহৎ পরিসরে এবং আরও আকর্ষণীয় করে বঙ্গবন্ধু নভো থিয়েটারের পাশে বিজয় সরণিতে তৈরির উদ্যোগ তার সরকার গ্রহণ করে। পাশাপাশি সেখানে সরকারি উপহারগুলো প্রদর্শনীর জন্য একটি তোষাখানা জাদুঘরও নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। যার নির্মাণের দায়িত্ব পায় সামরিক বাহিনী। পাশাপাশি সামরিক জাদুঘরটা যেন পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি সামরিক জাদুঘর হিসেবে গড়ে উঠতে পারে সেটাই তার আকাক্সক্ষা ছিল।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের যে ইতিহাস রয়েছে যেমন আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস। সশস্ত্র বাহিনী আমাদের সার্বভৌমত্বের প্রতীক, কাজেই সে সম্পর্কে যেন আমাদের দেশের মানুষ জানতে পারে, জ্ঞানার্জন করতে পারে, তাদের কর্মকা- উপলদ্ধি করতে পারে সে ব্যবস্থা আমরা করে যাচ্ছি।’

প্রতিটি উন্নয়ন কাজ করতে গেলেই তাকে বাধার মুখে পড়তে হয়েছে উল্লেখ করে সরকারপ্রধান জানান, সে বাধা অতিক্রম করেই তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন এবং আজকের এ দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। তাছাড়া দেশের মানুষের বিনোদনের জায়গা সীমিত হওয়ায় কোনো স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে তার সরকার শিক্ষার পাশাপাশি সে বিষয়টি মাথায় রাখে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, পার্শ্ববর্তী নভোথিয়েটারে আমাদের অনেক শিক্ষার্থী আসে তারা সেখানে অনেক কিছু দেখে এবং জানতে পারে। আমাদের সামরিক জাদুঘরেও এসে দেখতে ও জানতে এবং কিছু শিখতে পারবে। শিশু পার্কে তাদের জন্যও বিনোদনের ব্যবস্থা থাকছে। কাজেই সবকিছু মিলে আমাদের বিজয় সরণি বিজয়ের স্মৃতি নিয়েই চলবে। সেটাই হচ্ছে বড় কথা।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রেখে যাওয়া পররাষ্ট্রনীতি ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়,’ মেনেই আওয়ামী লীগ সরকার কাজ করছে উল্লেখ করে সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে তার সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপের কথাও জানান সরকারপ্রধান।

অনুষ্ঠানে শোষিত-বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজীবন সংগ্রামের কথা তুলে ধরার পাশাপাশি স্বাধীনতার পর সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়নে জাতির পিতার নেওয়া নানা পদক্ষেপেরও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে নির্মমভাবে হত্যার প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা জানান, সেই হত্যাকা-ে তিনি আপনজনহারা হলেও দেশের মানুষ কিন্তু তাদের সব সম্ভাবনাকে হারিয়ে ফেলে। এরপর একের পর এক ক্যু হয়েছে। কত সামরিক অফিসার, সৈনিককে জীবন দিতে হয়েছে। অনেক পরিবার এখনো তাদের আপনজনের খোঁজ পায়নি। পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাদের ওপর চলেছে অত্যাচার-নির্যাতন। যে আদর্শ নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল সে আদর্শ থেকে দেশ একেবারেই বিচ্যুত হয়ে যায়।

তিনি বলেন, পরবর্তী সময়ে ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকারে এসে দেশের উন্নয়নের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভরভাবে গড়ে তোলার পদক্ষেপ নেয়। যেন বিশ্ব দরবারে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা মাথা উঁচু করে চলতে পারে।

মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিতে আওয়ামী লীগ সরকার বেসরকারি খাতগুলোকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, পাঁচটি বছর আমরা ক্ষমতায় ছিলাম। অন্তত এটুকু দাবি করতে পারি বাংলাদেশের জন্য সেটা ছিল স্বর্ণযুগ। বাংলাদেশের মানুষের মাঝে একটা আশার প্রদীপ জ¦লে উঠেছিল, তারাও জীবনে সুন্দরভাবে বাঁচতে পারে। সরকার যে জনগণের সেবক, সেটাও আমরা প্রমাণ করেছিলাম।

বারবার দেশের মানুষ আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়ায় তাদের প্রতি অনুষ্ঠানে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ সময় সরকারে থাকার ফলে আজকে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছি। যেটা ২০০৮-এর নির্বাচনের ইশতেহারে আমাদের ঘোষণা ছিল। সেজন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেছি বলেই এটা সম্ভব হয়েছে।

জাদুঘর থেকে অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এসএম শফিউদ্দিন আহমেদ, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম শাহীন ইকবাল, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল শেখ আবদুল হান্নান, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আবু হেনা মোস্তফা কামাল প্রমুখ। মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, পদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

বঙ্গবন্ধু সামরিক জাদুঘরটি বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটারের পশ্চিম পাশে ১০ একর জমিতে নির্মিত হয়েছে। যেখানে স্বাধীনতার আগে ও পরে সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন সরঞ্জামাদি উপস্থাপন করা হয়েছে। জাদুঘরটিতে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর জন্য নির্ধারিত গ্যালারিসহ ছয়টি পৃথক অংশ রয়েছে। প্রতিটি বাহিনীর গ্যালারিতে রয়েছে বঙ্গবন্ধু কর্নার।

এখানে আর্ট গ্যালারিসহ মাল্টিপারপাস এক্সিবিশন গ্যালারি, ব্রিফিং রুম, স্যুভেনির শপ, ফাস্ট এইড কর্নার, মুক্তমঞ্চ, থ্রিডি সিনেমা হল, মাল্টিপারপাস হল, সেমিনার হল, লাইব্রেরি, আর্কাইভ, ভাস্কর্য, ম্যুরাল, ক্যাফেটেরিয়া, আলোকোজ্জ্বল ঝরনা ও বিস্তীর্ণ উন্মুক্ত প্রান্তর সবকিছু মিলে একটি চমৎকার দৃষ্টিনন্দন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

সামরিক বাহিনীর গৌরবময় ইতিহাস সম্পর্কে জনগণকে শিক্ষিত করার জন্য বাংলাদেশ সামরিক জাদুঘর ১৯৮৭ সালে মিরপুর সেনানিবাসে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল; যা পরে ১৯৯২ সালে বিজয় সরণি রোডের পাশে বঙ্গবন্ধু প্ল্যানেটরিয়ামের পশ্চিম পাশে বর্তমান অবস্থানে স্থানান্তরিত হয়। জাদুঘরটি সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর গৌরবময় অতীত, চ্যালেঞ্জ, অর্জন এবং মূল অগ্রগতি সম্পর্কে দেশের জনগণকে, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে প্রামাণিক তথ্য প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেয়। প্রদর্শিত তথ্য গবেষণার উদ্দেশে ব্যবহার করা যেতে পারে।