নির্বাচনী সহিংসতায় চাঁদপুরে আরও ২ জনের মৃত্যু

পঞ্চম ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে চাঁদপুরে ভোটের দিন সহিংসতায় আহত আরও দুজন মারা গেছেন। এর মধ্যে গতকাল শুক্রবার সকালে চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মিজান গাজী (৫৫) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। তিনি হাইমচরে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হয়েছিলেন। এর আগে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে শরীফ হোসেন নামে এক যুবক ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তিনি কচুয়ায় নির্বাচনী সহিংসতায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন। এ নিয়ে জেলাটিতে ভোটের দিনের সহিংসতায় এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যু হলো।

এদিকে প্রাণহানিসহ বিভিন্ন অনিয়মের মধ্যে দিয়ে পঞ্চম ধাপে গত বুধবার ৭০৭টি ইউপির নির্বাচনে ভোটগ্রহণের পর এ নির্বাচন ঘিরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে নীলফামারীর ডোমারে পরাজিত দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকের মধ্যে সংঘর্ষে উভয়পক্ষের কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়েছে। এছাড়া ঝিনাইদহের শৈলকুপায় বিজয়ী ও পরাজিত চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের সময় বেশ কয়েকটি বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়েছে। এ ঘটনায় উভয়পক্ষের পাঁচজন আহত হয়েছেন। সেখানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে ফাঁকা গুলি ছুড়তে হয়।

চাঁদপুরে গতকাল মারা যাওয়া মিজান গাজী গত বুধবার হাইমচরের ২ নম্বর উত্তর আলগী ইউনিয়নে জামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা ভোটকেন্দ্রে নির্বাচনী সহিংসতায় আহত হয়েছিলেন। তাকে চাঁদপুর ২৫০ শয্যার সরকারি জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল সকাল ৯টার দিকে মারা যান। নিহত মিজান গাজী উত্তর আলগী ইউনিয়নের ভিঙ্গুলীয়া গ্রামের বাসিন্দা।

প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতের স্বজনরা জানান, ভোটের দিন বিকেলে মেম্বার প্রার্থী মিন্টু কবিরাজের সমর্থকদের সঙ্গে প্রতিপক্ষ নাজিম উদ্দিনের সমর্থকদের সংঘর্ষ বাধে। এ সময় মিজান গাজী ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হন।

হাইমচর থানার ওসি মাহবুবুর রহমান মোল্লা গতকাল বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিহত মিজান গাজী নির্বাচনের দিন আহত হন বলে খবর পেয়েছি। তার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে এখনো কোনো অভিযোগ দায়ের হয়নি। তবে আমাদের পক্ষ থেকে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’

এর আগে কচুয়ায় নির্বাচনী সহিংসতায় গুরুতর আহত শরীফ হোসেন বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। পরিবারের সদস্যরা তার মরদেহ বাড়ি নিয়ে এলে খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। ভোটের দিন কচুয়ার সাচার ইউনিয়নের নয়াকান্দি ভোটকেন্দ্রের বাইরে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের সময় ছুরিকাঘাতে আহত হয়েছিলেন শরীফ।

কচুয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) তাজুল ইসলাম জানান, শরীফের মরদেহ ঢাকা থেকে নিয়ে আসার পর পুলিশ ময়নাতদন্তের জন্য চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। তার মৃত্যুর ঘটনায় কচুয়া থানায় মামলা হয়েছে।

ডোমারে সংঘর্ষে আহত ১০ : নীলফামারীর ডোমারের পাঙ্গামটকপুর ইউনিয়নে পরাজিত দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও সংঘর্ষে উভয়পক্ষের ১০ জন আহত হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চামারপাড়ার মোড় এলাকায় এ সংঘর্ষ চলে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

আহতের মধ্যে দুজনকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং বাকিদের ডোমার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।

জানা গেছে, ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী এমদাদুল ইসলাম ও স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুর রাজ্জাক পরাজিত হন আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুল হাকিম ভুট্টুর কাছে। এমদাদুল ও রাজ্জাক সমর্থকদের মধ্যে ভোটের দিন ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটকেন্দ্রে বাগ্বিতণ্ডা হয়। এর জেরে বৃহস্পতিবার রাতে চামারপাড়া মোড় এলাকায় দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে।

ডোমার থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। দুপক্ষ দুটি অভিযোগ দিয়েছে। তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

শৈলকুপায় বাড়িঘর ভাঙচুর, আহত ৫ : ঝিনাইদহের শৈলকুপার দুধসর ইউনিয়নে বিজয়ী ও পরাজিত চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের মাঝে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় বেশ কয়েকটি বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন উভয়পক্ষের পাঁচজন। গতকাল সকালে দুধসর ইউনিয়নের দুধসর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ৩৮ রাউন্ড শটগানের গুলি ও ৩ রাউন্ড রাবার বুলেট ছোড়ে পুলিশ।

শৈলকুপা থানার ওসি মো. রফিকুল ইসলাম জানান, দুধসর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী সাহাবুদ্দিন সাবু। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পরাজিত স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী টিএ রাজুর সমর্থক শহীদ নামে এক ব্যক্তির মুদি দোকান বন্ধ করে দেয় নবনির্বাচিত চেয়ারম্যানের সমর্থকরা। এর জেরে গতকাল সকালে উভয়পক্ষের লোকজনের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। ভাঙচুর করা হয় পরাজিত চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের প্রায় ২৫টি বাড়িঘর। এ সময় উভয়পক্ষের পাঁচজন আহত হয়। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। এলাকায় বর্তমানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

সাতক্ষীরায় বিজয়ী ও পরাজিত চেয়ারম্যান প্রার্থী গ্রেপ্তার : সাতক্ষীরার আশাশুনিতে পরাজিত চেয়ারম্যান প্রার্থীর ছোড়া গুলিতে কয়েকজন আহতের ঘটনায় পুলিশ গুলিবিদ্ধ বিজয়ী চেয়ারম্যান শাহনেওয়াজ ডালিম ও পরাজিত অহিদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে। এছাড়া ডালিমের আরেক আহত সমর্থক এবং হামলাকারী আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এদিকে হামলায় আহতদের গ্রেপ্তার এবং তাদের বিরুদ্ধে উল্টো মামলা হওয়ায় এলাকায় হাজারো নারী-পুরুষ বিক্ষোভ করেছে। তারা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সামনে মানববন্ধন ও সমাবেশ করে।

প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট জেলার প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা