যে কলকাতায় মৃতরা কথা বলছে

এই কলকাতা আমার অচেনা। একদমই চিনতে পারছি না প্রিয় এই শহরকে। কয়েকদিন আগে স্নেহের সাহিত্যিক জাকির তালুকদার কোথায় যেন সখেদে বলেছেন যে ঢাকায় ওর নিজেকে রিফিউজি মনে হয়। কিন্তু কলকাতা একান্তই আমার শহর। দেশভাগের বহু বছর আগে আমার পূর্বপুরুষ বরিশাল থেকে কলকাতা এসে আস্তানা গেড়েছিলেন। তারপর থেকে এ শহরের সঙ্গে আমার অচ্ছেদ্য বন্ধন। জন্ম, শৈশব, স্কুল, কলেজ, রাজনীতি, প্রেম সব এই শহরকে ঘিরে। কত সময় রাগ হয়েছে, বিরক্ত হয়েছি, কিন্তু তবু খুব বেশি সময় মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারিনি এ শহরের ওপর থেকে।

কলকাতাকে চট করে চেনা মুশকিল। একে ধীরে ধীরে আবিষ্কার করতে হয়। ভালো না বাসলে আপনি এই শহরকে আবিষ্কার করতে পারবেন না। কিন্তু কদিন ধরে এই চেনা শহরই বড় অচেনা লাগছে। এখন এই গভীর রাতে অন্ধকার বড্ড গভীর, রহস্যময়। রাত আশৈশব আমার প্রিয়। রাতের প্রতি মুহূর্ত আমি অনুভব করি। নৈঃশব্দ্যের শব্দ বড় বাক্সময়। টুকরো টুকরো শব্দ মিলে নতুন এক সিম্ফনি জন্ম নেয় প্রতি রাতে। রাতের গভীর কালো অন্ধকারে চমৎকার আলো বিচ্ছুরিত হতে থাকে। অন্ধকার নিছক অন্ধকার নয়। সেখানেও আলো থাকে। উজ্জ্বলতা থাকে।

কত ভাবে কত রাতে আমি এ শহরকে দেখেছি। বহুতলের ওপর থেকে গভীর রাতে কলকাতা দেখা এক অন্য অভিজ্ঞতা। রাত কটা হবে! একটা দেড়টা। শুনশান রাস্তা। দূরে দূরে আলো জ্বলছে। সামনের পেট্রল পাম্পে গাড়িরা ঘুমোয়। গাড়ির সারি থেকে এক হাত দূরে যুবতী মা সন্তানকে পরম মমতায় বুকের দুধ খাওয়াতে ব্যস্ত। একটা রিকশা চলে গেল। ঠুনঠুন করতে করতে। কবে এসেছিল চীনদেশের এই যান এ শহরে কে জানে! এই ঘর এখন যে কোনো উড়োজাহাজের জানালা। মেঘের ওপর ডানা মেলে যন্ত্র পাখি উড়ে যাচ্ছে। কোথাও কোনো শিকড় নেই। মাটির কিছুমাত্র গন্ধ, স্পর্শ শব্দ পাওয়ার জো নেই।

কদিন ধরে মনের মধ্যে গুনগুন করে বাজছে একটা গানের কয়েকটি কথা ‘একদিন চলে যাব আমি, এঘর শূন্য করে, বাঁধন ছিন্ন করে যাব চলে, চলে যাব...’। আবার এইতো সেদিন অপারেশন থিয়েটারে জ্ঞান হারাবার ঠিক আগে ঝলমলে প্রাণবন্ত তরুণী ডাক্তার মুখ ঝুঁকিয়ে হাসিমুখে বললেন, নো চিন্তা, সব ঠিক হয়ে যাবে।

এই গভীর রাত্তিরে খুব ইচ্ছে করে এলোমেলো ঘুরে বেড়াতে। সাবেক কলকাতার গলির গলি, তস্য গলি সাতকড়ি মিত্তির লেন টপকে বাগমারির চুয়াল্লিশ বা বিয়াল্লিশ বস্তিতে। কাছেই বিখ্যাত মুরারিপুকুরের বোমার মাঠ। সেখানে স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস থেমে আছে।

কোন বিষাদে কে যেন ঘরে ফেরে এলোমেলো পায়ে। অবিশ্রান্ত জল পড়ে যায় ঘোলা কলের মুখ দিয়ে। নেপালি বুড়ো বাহাদুর খটখট করে লাঠির শব্দ করে। চিৎপুরের প্রাচীন বশরি শাহ মসজিদ এসময় বড় অসহায় হয়ে একা দাঁড়িয়ে থাকে। হাজরা, ল্যান্স ডাউনের কাছে লকার মাঠে ব্যস্ততা বাড়তে থাকে। ঝাঁ চকচকে সাদা মারুতি হাত বাড়িয়ে চোলাই খোঁজে। রাত নামে। রাত বাড়ে। ক্রমে দ্রুত হয় শীৎকারের শব্দ। কোনো শহরকে চেনা যায় না তার রাত না দেখলে। কোনো মানুষকেই কি চেনা যায় তার কালোটুকু বাদ দিয়ে!!

মা হয়ে পড়ে মেয়ে। সম্পর্কের ভাঙাচোরা চলতে থাকে আমৃত্যু। একটা মানুষ কতভাবে বদলে যায়। শিশু কাঁদছে। মা তাকে সান্ত¡না দিচ্ছে। শিশুরা দেওয়ালা করে। স্বপ্ন দ্যাখে বাবা চলে গেছে। তাই অভিমানে ঠোঁট ফোলায়। শিশু বড় হয়। আর সে ঠোঁট ফোলায় না। কখন যেন শিশু মস্ত গাছ হয়ে বাবাকে ছায়া দেয়। চোখ বুজলেই কোলাজের মতো কত স্মৃতি আচমকাই ভেসে ওঠে। আমার এক চীনা বন্ধু ছিল। মিষ্টি মেয়েটির নাম ওয়াং। মানে নাকি রানী। সত্যি মিথ্যে যাই হোক ওর হাবভাব, চলন মেজাজ মর্জি সব ছিল রানীর মতো। কত বন্ধন চারপাশে। স্নেহের, প্রেমের, শাসনের, হুকুমের, তাঁবেদারির, খ্যাতির, লোভের, যন্ত্রণারবললেই হবে মানব না এ বন্ধনে...!!

এমন দাম্ভিক, মুখ তুলে কারুর দিকে তাকাতোই না। কথা বলা দূরের কথা। কী করে যেন আমার সঙ্গে বেশ ভাব হয়ে গিয়েছিল। সবসময় আমাকে সাবধানে থাকতে বলা ওর এক মুদ্রা দোষ হয়ে গেছিল। একদিন সত্যিই একটু অসাবধানে রাস্তা পার হতে গিয়ে এক বাসের ধাক্কায় প্রায় যাই যাই অবস্থা। ওয়াং-এর সেকি কান্না। লোকজন জড়ো হয়ে আমাকে অসাবধানে না দেখে রাস্তা পার হচ্ছিলাম বলে ধমকাতে লাগল। তাকিয়ে দেখি ওয়াং তখন কান্না থামিয়ে মিটিমিটি হাসছে। ওই যে লোকজন আমাকে বকছে তাতেই উনার আনন্দ। ভাবখানা, বেশ হয়েছে। কেমন বকুনি খাচ্ছো। জীবনের নানা ওঠা-পড়ার মধ্যেও কোনো কোনো স্মৃতি কখনো ধূসর হয় না।

বরানগরের কুঠিঘাট জায়গাটা বেশ সুন্দর। গঙ্গার ধারে পুরনো ডাচ কুঠি। ব্রিটিশ আসার আগে এই ওলন্দাজ, ফরাসি ও পর্তুগিজরা বঙ্গে বিপুল দাপটে ব্যবসা করেছে। বরানগরের কুঠিও খুব পুরনো। জলটুঙ্গি আছে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাসের নানা উপাদান। কাছেই এক একতলা বাড়িতে লেখা আছে ‘এই ছিল এই নেই’। জীবনের এক্কেবারে সার কথা। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে জীবনবোধ পাল্টায়। মর্জি, মেজাজ, ভঙ্গি, রং, চাকচিক্য, চলন সবই বদলে বদলে যায়।

একদিন যে বই ছাড়তে চাইতাম না। এখন তাকে কাঁচা জোলো লাগে। ছোটবেলায় যে বন্ধুকে না দেখলে মনে হতো জীবন বৃথা। এখন হয়তো তাকে দেখলে দেখিনি দেখিনি বলে পাস কাটাতে ইচ্ছে করে। উল্টোটাও হয়।

বিষণœ শীতের দুপুর। আমার কলকাতার কোনোদিনই সেরকম কোনো বড়লোকি চাল ছিল না। ধনী সে কোনোদিনই নয়। একের পর এক যুদ্ধ, বিদ্রোহ, মহামারী, গণআন্দোলন তার বুকের ওপর আছড়ে পড়েছে। সে হয়ে উঠেছে মিছিলনগরী। এ শহর জন্ম দিয়েছে বিশ্বখ্যাত সব মনীষার। সবচেয়ে বড় এ শহরের প্রাণ। বড় বেশি জীবন্ত আমার শহর।

এ শহর এখন শঠ-লুটেরা-বেনিয়াদের স্বর্গে পরিণত হচ্ছে। সারল্য এখান থেকে বিদায় নিচ্ছে। কবি হয়ে পড়ছেন সোনার খাঁচায় বন্দি। প্রতি দিন ডাকঘরের অমলের মতো অসহায় শিশু তাকিয়ে আছে বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুলের দিকে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সব সার দিয়ে বন্ধ। গঙ্গা সাগর মেলা হতে যাচ্ছে রমরম করে।

কিন্তু এখন এই চেনা শহর আমার সত্যিই খুব অচেনা লাগছে। এখানে রাত শেষে পাশের ফ্ল্যাটের কার্নিশে শুয়ে আছে মৃত পায়রার শব। শীতের ঠান্ডায় নীল হয়ে গেছে ছোট্ট শরীর। এখানে এখন রোদের রং কেমন ফ্যাকাশে হলুদ। ভোর হচ্ছে। শহর জাগছে। বাজার বসছে। গাড়ি ছুটছে। সব কেমন যন্ত্রের মতো। মানুষের মুখ এখন রোবটের মতো। সারা শরীরে এখন এ শহরে অসুখের গন্ধ। ঘরে ঘরে জ্বর। কাশি। সর্দি। ওমিক্রন। ডেল্টা। করোনা। এখানে এখন শরীরের নিয়ন্ত্রণ করপোরেট পুঁজি সরকার আর কোর্টের হাতে।

আমার শহর এখন বিচ্ছিন্ন দ্বীপের চেহারা নিয়েছে। এই বদ্ধ জলাশয়ে কখনো প্রাণের জন্ম হতে পারে না। জানি না কীভাবে এখানে ফের জন্ম নেবে মহতী সাহিত্য, নাটক, সংগীত বা ধ্রুপদী সিনেমা!

হসপিটালে ভিড় বাড়ছে। গরিব মানুষ ছুটে যাচ্ছে কভিড পরীক্ষা করতে। পুলিশ মাইক নিয়ে সতর্ক করছে জনতাকে। মাস্ক পরুন। দূরত্ব বজায় রাখুন। পাশ দিয়ে রাজনৈতিক দলের মিছিল যাচ্ছে। অনেকের মুখেই মাস্ক নেই। এভাবেই খুলে যাচ্ছে গণতন্ত্রের মুখোশ।

এক কলকাতার মধ্যে থাকে অনেক কলকাতা। কিন্তু কোনো কলকাতার ভেতরেই এরকম বিবর্ণ কলকাতার কোনো জায়গা নেই। এই মøান শহরকে আমি দেখিনি। চিনি না। মৃতরা এখানে পরস্পরের সঙ্গে কথা বলে। কথা বলছে। বলতেই থাকছে।

লেখক ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

sdastidar27@gmail.com