পিআরআইয়ের ওয়েবিনারে বক্তারা

বাণিজ্য ঘাটতি মোকাবিলায় টাকার ৫% অবমূল্যায়ন দরকার

বৈদেশিক বাণিজ্যে রপ্তানি খাত ও রেমিট্যান্স বাড়াতে এখনই টাকার ৫ শতাংশ অবমূল্যায়ন করা দরকার। বর্তমানে এক ডলারের পেছনে ব্যয় করতে হয় ৮৬ টাকার বেশি। টাকার ৫ শতাংশ অবমূল্যায়ন হলে এক ডলারের পেছনে ব্যয় হবে ৯০ টাকা।

গতকাল মঙ্গলবার গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) ওয়েবিনারে এসব কথা বলেন আলোচকরা।

২০২১-২২ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৫৩ কোটি ডলার। যা গত ২০২০-২১ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪৮ শতাংশ বেশি।

অনুষ্ঠানে মূল উপস্থাপনা দেন পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান জাঈদি সাত্তার। তিনি বলেন, ‘আমদানি বেড়ে যাওয়া বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার টাকার অবমূল্যায়ন করা হলে মূল্যস্ফীতি বাড়ে।’ সেজন্য তিনি একরকম ক্ষতিপূরণ দিয়ে টাকার অবমূল্যায়নের কথা বলেন। সেটা হলো, শুল্ক হার সমন্বয় করা। আর বাকি সব ঠিক রাখা হলে সমস্যা নেই, এতে শুধু রপ্তানি খাত প্রণোদনা পাবে। এই মুহূর্তে টাকার ৫ শতাংশ অবমূল্যায়ন করার প্রস্তাব দেন তিনি।

ওয়েবিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, বাংলাদেশ যেমন বটমলেস বাস্কেটকেস বা তলাবিহীন ঝুড়ির তত্ত্ব ঝেড়ে ফেলতে পেরেছে, তেমনি প্যারাডক্স, বিস্ময় এ জাতীয় অভিধাও পরিত্যাগ করতে পারবে। সেখানেই দেশের জনগণের বিজয়।

সরকার দেশে বড় বড় উন্নয়নযজ্ঞ চালাচ্ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়ছে। চলতি হিসাবের অবস্থা ভালো নয়। এ পরিস্থিতিতে রপ্তানিকারকদের উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি টাকার যে অবমূল্যায়ন করেছে তা জরুরি ছিল, কিন্তু যথেষ্ট নয়। এ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, টাকার মান একধাপে বেশি অবমূল্যায়ন করা হলে বেশি ফল মেলে। অন্যদিকে বাজেটেও চাপ আছে। গত অর্থবছরে ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত ছিল ৭ শতাংশের মতো। এ পরিস্থিতিতে রাজস্ব ঘাটতি ৩৫ হাজার কোটি টাকা দাঁড়াবে। অথচ সরকারের ভর্তুকি অনেকটাই বেড়েছে। এতে ঋণের টাকা দিয়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি পরিচালনা করতে হচ্ছে।

মূল্যস্ফীতি দৈত্যাকার প্রাণীর মতো মাথা তুলছে উল্লেখ করে আহসান মনসুর বলেন, এ বাস্তবতায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন কাজ। একদিকে ভর্তুকি আছে, বিনিময় মূল্য কমানো হচ্ছে, প্রণোদনা আছে, এসব কিছুর চাপে মূল্যস্ফীতি বাড়বে।

বিকেএমইএ নেতা ফজলুল হক বলেন, মানুষ ওমিক্রন নিয়ে চিন্তিত নয়। টিকা আছে, ওষুধ আছে, মানুষও আর বিধিনিষেধ মানতে রাজি নয়। তবে কিছু চ্যালেঞ্জ আছে, যেমন শ্রমিক সংকট। শিল্পে এখন ১৫-২০ শতাংশ শ্রমিক সংকট আছে কিন্তু তা মোকাবিলা করা হচ্ছে না। নতুন শ্রমিকদের শিখিয়ে-পড়িয়ে নেওয়ার মতো অবস্থায় নেই শিল্প। তৈরি পোশাক খাতের এখন বহুমুখীকরণ দরকার, নতুন বাজার ধরতে এর বিকল্প নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়েমা হক কভিডের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোকাবিলায় গুরুত্ব দেন । তিনি বলেন, দেশে বড় একটি অরক্ষিত জনগোষ্ঠী আছে। তাদের লক্ষ্য করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি প্রণয়ন করা দরকার। এছাড়া কভিডের প্রভাবে দীর্ঘদিন বিদ্যালয় বন্ধ ছিল। সে কারণে বাল্যবিবাহ বেড়ে গেছে। এটা রোধে সায়েমা হকের প্রস্তাব, যেসব অঞ্চলে বাল্যবিবাহ বেড়েছে, সেসব অঞ্চল লক্ষ্য করে উপবৃত্তির কর্মসূচির আওতা বাড়ানো।

বক্তারা বিদ্যালয় বন্ধ রাখা নিয়ে আক্ষেপ করে বলেন, সবকিছু খোলা রেখে বিদ্যালয় বন্ধ রাখায় ক্ষতি ছাড়া লাভ হয়নি। অথচ উন্নত দেশে বিদ্যালয় খোলা রাখায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বৈষম্য প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, নিচের সারির মানুষের দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সমাজের উঁচুতলার মানুষরা আরও ওপরে যাবে, কিন্তু নিচুতলার মানুষের সীমা আছে। তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা উচিত।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি রিজওয়ান রাহমান, বিজেএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী নাসের এজাজ প্রমুখ।