চিয়ান সুয়েসেন : যুক্তরাষ্ট্রের আফসোস ও চীনের গর্ব

চীনের মহাকাশ প্রযুক্তির জনক চিয়ান সুয়েসেন। তাকে বীর হিসেবে দেখে পেইচিং। দেখবে নাই-বা কেন, মহাকাশে চীনের অগ্রগতির অন্যতম কারিগর রকেট বিজ্ঞানী চিয়ান। যুক্তরাষ্ট্রের রকেট বিজ্ঞান বিকাশেও চিয়ানের অবদান অনেক। দেশটি তাকে না তাড়ালে এত দ্রুত মহাকাশ জয় করতে পারত না চীন। লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া  

চিয়ান সুয়েসেন

চীনের ক্ষেপণাস্ত্র ও মহাকাশ কর্মসূচির জনক চিয়ান সুয়েসেন। তার গবেষণা দেশটির রকেট প্রযুক্তি বিকাশে সহায়তা করে। চিয়ানের তত্ত্বাবধানেই মহাকাশে প্রথম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণে সক্ষম হয় চীন। দেশটির অত্যাধুনিক সামরিক অস্ত্র অগ্রগতির পেছনেও চিয়ানের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা অনস্বীকার্য। চিয়ানের জীবন বলতে গেলে প্রায় এক শতাব্দী পর্যন্ত বিস্তৃত। এই সময়ে অর্থনৈতিকভাবে নগণ্য একটি দেশ থেকে পৃথিবী ও মহাকাশে সুপারপাওয়ারে পরিণত হয় চীন। এই পরিবর্তনের একটি অংশ ছিলেন চিয়ান। চীনের সাংহাই শহরে চিয়ানকে উৎসর্গ করে গোটা একটি জাদুঘর নির্মাণ করে দেশটির সরকার। সেই জাদুঘরে ‘জনগণের বিজ্ঞানী’ চিয়ানকে ঘিরে ৭০ হাজারের মতো শিল্পকর্ম রয়েছে। চাঁদে অবতরণে বিশ্বের সুপারপাওয়ার চীন ও যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করেছিলেন চিয়ান। এক দশকের বেশি সময় পড়াশোনা ও কাজের স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন তিনি। তবে তার অবদান সেখানে তেমন একটা স্মরণ করা হয় না। চিয়ানের মতো মেধাবী ও দক্ষ রকেট বিজ্ঞানীকে বিতাড়িত করে যুক্তরাষ্ট্র যে ভুল করেছিল, তার জন্য দেশটির আফসোস করাই স্বাভাবিক।

পড়াশোনা

১৯১১ সালে সাংহাইয়ে জন্ম হয় চিয়ানের। সে সময় রাজার শাসন পেছনে ফেলে প্রজাতন্ত্র শাসনের দিকে এগোচ্ছিল চীন। চিয়ানের মা-বাবা দুজনই ছিলেন উচ্চশিক্ষিত। জাপানে কিছুদিন কাজ করার পর দেশে ফিরে চীনের জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন চিয়ানের বাবা। ছোটবেলা থেকে পড়াশোনায় মেধাবী ছিলেন চিয়ান। সাংহাই জিয়াও টং বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পরীক্ষায় প্রথম হন তিনি। পান যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এমআইটি) ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার স্কলারশিপ।  

১৯৩৫ সালে পরিপাটি পোশাক পরে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন শহরে হাজির হন তরুণ চিয়ান। সে সময় তিনি বিদেশাতঙ্কে ভোগার পাশাপাশি বর্ণবাদী আচরণের মুখে পড়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা ইউনিভার্সিটি অব নর্থ জর্জিয়ার ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ক্রিস জেসপারসেনের। তবে তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রে খুব বেশি নেতিবাচক পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়নি চিয়ানকে কারণ মার্কিনিরা সে সময় বুঝতে পেরেছিল, মৌলিক ও তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে চীন। তার মেধা ও প্রজ্ঞাকে শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাবে এমন মানুষদের মধ্যেই থাকতেন চিয়ান।

এমআইটিতে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৩৬ সালে ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (ক্যালটেক) ভর্তি হন চিয়ান। সেই যুগে বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে প্রভাবশালী উড়োজাহাজ প্রকৌশলী হাঙ্গেরিয়ান থিওডর ফন কারমানের অধীনে ক্যালটেকে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। সেখানে বিখ্যাত বিজ্ঞানী ফ্র্যাঙ্ক ম্যালিনার সঙ্গে দেখা হয় চিয়ানের। সুইসাইড স্কোয়াড নামে উদ্ভাবকদের নিয়ে গড়া ছোট্ট একটি দলের মূল সদস্য ছিলেন ম্যালিনা।      

সুইসাইড স্কোয়াড

ক্যালটেকে রকেট বানানোর চেষ্টার কারণে ওই দলকে ক্যাম্পাসে সুইসাইড স্কোয়াড নামে ডাকা হতো। ‘এসকেইপ ফ্রম আর্থ : এ সিক্রেট হিস্টোরি অব দ্য স্পেস রকেট’ নামে বইয়ের লেখক ফ্রেসার ম্যাকডোনাল্ড সুইসাইড স্কোয়াড সম্পর্কে জানান, রকেট তৈরির চেষ্টার পাশাপাশি ওই দলের সদস্যরা ভলেটাইল কেমিক্যাল নিয়ে ভুল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন। সৌভাগ্যের বিষয়, ওইসব পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তাদের কারও মৃত্যু হয়নি।       

বিজ্ঞানী ফ্র্যাঙ্ক ম্যালিনাসহ সুইসাইড স্কোয়াডের অন্য সদস্যদের সঙ্গে একদিন গণিতের জটিল সমস্যা নিয়ে আলোচনায় মেতে ওঠেন চিয়ান। আলোচনার একপর্যায়ে রকেট নিয়ে তাদের ব্যাপক আগ্রহ দেখে মুগ্ধ হন তিনি। দুদিন পরই সুইসাইড স্কোয়াডের সদস্য হয়ে যান চিয়ান। রকেট পরিচালনা সংক্রান্ত গবেষণাপত্র সে সময় তৈরি করছিলেন তিনি। ফ্রেসার ম্যাকডোনাল্ড বলেন, ‘ওই সময় রকেট বিজ্ঞানকে পাগলাটে ও উদ্ভট কল্পনাকারীদের বিষয় বলে বিবেচনা করা হতো। কেউই এটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে রাজি ছিলেন না। রকেট বিজ্ঞানই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ এটা বলে কোনো প্রকৌশলী তাদের সুনাম ক্ষুণ্ন করার ঝুঁকি নিতেন না।’

সেনাবাহিনীর নেকনজর

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর পর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টাতে শুরু করে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর নজরে পড়ে সুইসাইড স্কোয়াড। জ্যাটো বা জেট অ্যাসিস্টেড টেক অফের (বিমানে রকেট যুক্ত করে ওড়ানো) বিষয়ে গবেষণার পেছনে সে সময় টাকা ঢালছিল মার্কিন সেনাবাহিনী। ১৯৪৩ সালের দিকে থিওডর ফন কারমানের নেতৃত্বে জেট প্রপালশন ল্যাব (জেপিএল) প্রতিষ্ঠা করতে আর্থিক সহায়তা দেয় সেনাবাহিনী। চিয়ান ও ম্যালিনা ছিলেন ওই প্রকল্পের প্রধান দুই বিজ্ঞানী।     

ফ্রেসার ম্যাকডোনাল্ড বলেন, ‘সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ছিল প্রজাতন্ত্রী চীন। এ কারণে আমেরিকার মহাকাশ প্রকল্পের কেন্দ্রে চীনা এক বিজ্ঞানীর থাকা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি।’ সামরিক অস্ত্র নিয়ে গবেষণা করার সময় চিয়ানকে নিরাপত্তা ছাড়পত্র দেয় মার্কিন সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞান উপদেষ্টা বোর্ডেও ছিলেন চিয়ান।    

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে বিশ্বের প্রথম সারির জেট বিমান পরিচালনা সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন চিয়ান। সে সময় থিওডর ফন কারমানের সঙ্গে তাকে জার্মানিতে একটি অসাধারণ মিশনে পাঠানো হয়। ওই মিশনের লক্ষ্য ছিল, জার্মানির শীর্ষস্থানীয় রকেট বিজ্ঞানী ভেনহার ফন বাউনসহ অন্য নাৎসি প্রকৌশলীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া। জার্মানরা আসলে মহাকাশ বিষয়ে ঠিক কতটুকু জানে এটা জানা জরুরি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। এ কারণে চিয়ান ও থিওডরকে জার্মানির আলোচিত রকেট বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথা বলতে পাঠানো হয়।

কমিউনিস্ট অভিধা

চল্লিশের দশকের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্রে চিয়ানের উজ্জ্বল ক্যারিয়ার হঠাৎ থেমে যায়। ইতিহাসবিদ ক্রিস জেসপারসেন  বলেন, ‘১৯৪৯ সালে চীনকে কমিউনিস্ট গণপ্রজাতন্ত্রী দেশ হিসেবে ঘোষণা দেন বিপ্লবী নেতা মাও সে তুং। এর ফলে দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের রোষানলে পড়ে দেশটি। একসময়ের মিত্র দেশ চীনের নাগরিকদের মার্কিন সরকার শত্রু হিসেবে দেখতে শুরু করে। চীনকে গালাগালি দেওয়া শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র।’        

চল্লিশের দশকের শেষে চীনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় যুক্তরাষ্ট্রে মহাকাশ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের মধ্যে সহকর্মীদের নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে। জেট প্রপালশন ল্যাবের (জেপিএল) নতুন পরিচালকের মনে হয়, ল্যাবেরই কয়েকজন কর্মকর্তা গুপ্তচরের কাজ করছেন। তাদের ঘিরে সন্দেহের বিষয়টি তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইকে জানান। এ বিষয়ে ফ্রেসার ম্যাকডোনাল্ড বলেন, ‘আমি খেয়াল করলাম, সন্দেহের তালিকায় থাকা ব্যক্তিরা হয় ইহুদি নয়তো চীনা।’ 

১৯৪৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাজনীতিক জোসেফ ম্যাকার্থি স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি থেকে শুরু করে অন্য কর্মক্ষেত্রে কমিউনিস্ট ও সোভিয়েত গুপ্তচরদের ব্যাপক অনুপ্রবেশ ঘটে বলে প্রচার শুরু করেন। ম্যাকার্থি আমলেই বিজ্ঞানী চিয়ান, ম্যালিনাসহ জেট প্রপালশন ল্যাবের অন্য কর্মকর্তাদের কমিউনিস্ট হিসেবে অভিহিত করে এফবিআই। তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হয়। 

১৯৩৮ সালে ইউএস কমিউনিস্ট পার্টির এক নথির ওপর ভিত্তি করে মূলত চিয়ানের বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট মতাদর্শ অনুসরণের অভিযোগ আনা হয়। নথিতে বলা হয়, চিয়ান রাজনৈতিক এক বৈঠকে যোগ দেন। এফবিআইয়ের ধারণা ছিল, ওই বৈঠক প্যাসাডিনা কমিউনিস্ট পার্টির বৈঠক ছিল (প্যাসাডিনা ক্যালিফোর্নিয়ার একটি শহর)। প্যাসাডিনা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হওয়ার এফবিআইয়ের অভিযোগ সে সময়ই নাকচ করেন চিয়ান। অবশ্য নতুন এক গবেষণায় জানা যায়, ১৯৩৮ সালে প্রায় একই সময়ে ফ্র্যাঙ্ক ম্যালিনা ও চিয়ান প্যাসাডিনা কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন।   

এ বিষয়ে ফ্রেসার ম্যাকডোনাল্ড বলেন, ‘সে সময় কেউ বর্ণবাদবিরোধী অবস্থান নিলে তাকে কমিউনিস্ট হিসেবে দেখা হতো। এর অর্থ এ নয়, তিনি মার্ক্সিস্ট হয়ে গেছেন। প্যাসাডিনা কমিউনিস্ট পার্টি তখন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্যাসিস্ট শাসনের ওপর জোর দেয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে চলমান বর্ণবাদ নিয়েও কাজ করছিল ওই রাজনৈতিক দল। যেমন: প্যাসাডিনার সুইমিং পুল ব্যবহারের ক্ষেত্রে বর্ণভেদে পৃথকীকরণ নীতির বিরুদ্ধে কাজ করছিলেন দলের সদস্যরা। কমিউনিস্ট পার্টিটি তাদের আয়োজিত বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনাও করত।

গৃহবন্দি চিয়ান

ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটির ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক জুইয়ে ওয়াং জানান, চীনের হয়ে চিয়ান যুক্তরাষ্ট্রে গুপ্তচরের কাজ করতেন, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সময় তিনি চীনের গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট ছিলেন, তারও পক্ষে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার হাতে কোনো প্রমাণ নেই। কোনো প্রমাণাদি না থাকলেও চিয়ানের নিরাপত্তা ছাড়পত্র বাতিল করা হয়। গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে তাকে গৃহবন্দি করে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন সরকার। চিয়ান নিরপরাধ, তিনি কোনো এজেন্ট নন এই লিখে বিজ্ঞানী থিওডর ফন কারমানসহ ক্যালটেকের বেশ কয়েকজন সহকর্মী মার্কিন সরকারের কাছে বারবার আবেদন করলেও কোনো লাভ হয়নি। 

টানা ৫ বছর যুক্তরাষ্ট্রে গৃহবন্দি ছিলেন রকেট বিজ্ঞানী চিয়ান। একপর্যায়ে ১৯৫৫ সালে দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার তাকে চীনে বিতাড়নের সিদ্ধান্ত নেন। স্ত্রী ও যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া দুই সন্তানকে নিয়ে নৌকায় দেশের উদ্দেশে রওনা দেন চিয়ান। নৌকা ছাড়ার আগে অপেক্ষারত সাংবাদিকদের জানান, আর কখনো যুক্তরাষ্ট্রে পা দেবেন না তিনি। চিয়ান তার কথা রেখেছিলেন। বাকি জীবনে কখনো যুক্তরাষ্ট্রের মুখ দেখেননি তিনি। সাংবাদিক ও লেখক তিয়ানয়ু ফ্যাং বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সবচেয়ে বিখ্যাত বিজ্ঞানী ছিলেন চিয়ান। মহাকাশ প্রযুক্তি বিকাশে ওই দেশকে অনেক কিছু দিয়েছেন তিনি, আরও অনেক কিছু দিতে পারতেন। তার সঙ্গে মার্কিন সরকার কেবল অপমানজনক ব্যবহারই করেনি, বেইমানিও করেছে।’ 

স্বদেশ প্রত্যাবর্তন

পরিবার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে সুখেই ছিলেন চিয়ান। সেখানে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার কোনো ইচ্ছাই তার ছিল না। জীবনে কখনো মার্কিন সরকারের বিরাগভাজন হবেন, তা কখনো কল্পনা করেননি তিনি। তাকে বিতাড়নের প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ারের সিদ্ধান্তের পর  নায়কের বেশে দেশে ফেরেন চিয়ান। চীনে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেননি তিনি। বরং সময় নিয়ে ১৯৫৮ সালে পার্টিতে যোগ দেন চিয়ান। তার কাজে কমিউনিস্ট সরকার বিরক্ত হতে পারে, এমন কোনো কিছু করা থেকে সচেতনভাবে বিরত থাকতেন তিনি। ওই সরকারের অধীনেই অসাধারণ ক্যারিয়ার গড়েন চিয়ান।

চিয়ান যখন দেশে ফেরেন, সে সময় রকেট বিজ্ঞান নিয়ে খুব বেশি জানাবোঝা ছিল না চীনের মেধাবীদের। তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ১৫ বছর পর মহাকাশে প্রথম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে দেশটি। বলা বাহুল্য, পুরো প্রকল্প চিয়ানের তত্ত্বাবধানেই হয়। কয়েক দশকের মধ্যে চীনে বিজ্ঞানীদের নতুন এক প্রজন্মকে প্রশিক্ষিত করেন তিনি। তার কাজ চীনের চাঁদবিষয়ক গবেষণা কর্মসূচির ভিত্তি স্থাপন করে। ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি উন্নয়নেও চীনকে সহায়তা করেন চিয়ান। ওই কর্মসূচি একপর্যায়ে দেশটির অত্যাধুনিক সামরিক অস্ত্র তৈরিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। মজার বিষয় হলো, এসব অস্ত্র পরে যুক্তরাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করা হয়। চিয়ানের সিল্কওয়ার্ম ক্ষেপণাস্ত্র ১৯৯১ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ছোড়া হয় এবং ২০১৬ সালে ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীরা ওই ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন যুদ্ধজাহাজে নিক্ষেপ করে।

ফ্রেসার ম্যাকডোনাল্ড বলেন, ‘পৃথিবী যে গোল তা ফের প্রমাণ করেন চিয়ান। যুক্তরাষ্ট্র তার দক্ষতাকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই দক্ষতা পরে যুক্তরাষ্ট্রকেই কামড়ে দেয়। নিজের দেশে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে গিয়ে অন্যতম প্রধান কমিউনিস্ট শত্রু ও প্রতিদ্বন্দ্বী চীনকে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও মহাকাশ কর্মসূচি বিকাশে সহায়তা করে তৎকালীন মার্কিন সরকার। এর চেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক ভুল আর হয় না।’ যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সেক্রেটারি অব দ্য নেভি ও রকেট পরিচালনা প্রতিষ্ঠান অ্যারোজেটের প্রধান ড্যান কিমবল একবার বলেছিলেন, ‘চিয়ানকে নির্বাসনে পাঠানোর মতো এত বড় মূর্খামি যুক্তরাষ্ট্র আর কখনো করেনি।’ 

লেখক ও সাংবাদিক তিয়ানয়ু ফ্যাং বলেন, ‘চিয়ান সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ নাগরিকের কোনো ধারণা নেই। দেশটির মহাকাশ কর্মসূচিতে তার অবদান সম্পর্কেও সেখানে কেউ তেমন কিছু জানে না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত চীনের শিক্ষার্থী ও চীনা বংশোদ্ভূত নাগরিকরা চিয়ান ও তার কাজ সম্পর্কে ভালোই জানেন। কেন তাকে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে হয়েছিল, এটা তাদের অজানা নয়। চল্লিশের দশকে চিয়ানের সঙ্গে যা করা হয়েছিল, আজকের দিনে তা হতে পারে না, এসব শিক্ষার্থী ও নাগরিকরা তা মনে করেন না। কারণ সেই সময়ের তুলনায় এখন অনেক বেশি খারাপ হয়েছে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক। চিয়ানকে সে সময় যেভাবে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা হয়েছিল, তার পরের প্রজন্মের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্র সরকার একই কাজ করতে পারে বলে মনে করে তারা।’ ফ্রেসার ম্যাকডোনাল্ড বলেন, ‘চিয়ানের গল্প যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি সতর্কবার্তা। মেধাবীদের বিতাড়িত করা হলে পরিণাম কী হতে পারে, তা দেশটি সে সময় হারে হারে টের পায়। যুক্তরাষ্ট্র আজ জ্ঞান-বিজ্ঞানে বিশ্বে শীর্ষে। মূলত বাইরের দেশের মানুষরাই দেশটিকে এই পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। এই সত্য অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র স্বীকার করতে চায় না।’