করোনা মোকাবিলা

নতুন নির্দেশনা মেনে চলার অনুরোধ প্রধানমন্ত্রীর

করোনার সংক্রমণ রোধে অনুষ্ঠান-সমাবেশ বন্ধসহ ১১ দফা নির্দেশনা দেশের মানুষকে মেনে চলার অনুরোধ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘একটা জিনিস সবাই লক্ষ রাখবেন। নতুন ভ্যারিয়েন্ট (ওমিক্রন) দেখা দিয়েছে। এটা খুব দ্রুত ছড়াচ্ছে। এক একটা পরিবারসহ আক্রান্ত হচ্ছে। সবাইকে বলব, স্বাস্থ্য সুরক্ষাবিধি মেনে চলতে। আমরা এরই মধ্যে কিছু নির্দেশনা দিয়েছি, সেটা সবাই মেনে চলবেন। সেটাই আমি চাই।’ গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নবনির্মিত জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কমপ্লেক্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠানে যুক্ত হন।

সরকার প্রধান বলেন, ‘আর যারা টিকা নেননি, তারা দ্রুত টিকা নিয়ে নেবেন। আমরা স্কুলের শিক্ষার্থীদেরও টিকা দেওয়া শুরু করেছি। টিকা নিলে অন্তত জীবনে বেঁচে থাকা যায়।’ বিষয়টি অনুধাবনে সবাইকে অনুরোধ জানান তিনি।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী বিএনপির সমালোচনা করে বলেন, ‘দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে নেদারল্যান্ডসের একটি ফুলের নাম টিউলিপ আপনারা জানেন। তাদের কম্পিউটার প্রতিষ্ঠানের নামও টিউলিপ নামে। আমাদের অতিজ্ঞানী তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে কে জানি বোঝায় যে, শেখ রেহানার মেয়ের নাম টিউলিপ। কাজেই নেদারল্যান্ডসের সেই কোম্পানিটিও টিউলিপের নামে। এজন্য সেখান থেকে কম্পিউটার নেওয়া যাবে না। তাই উনি নেদারল্যান্ডস থেকে কম্পিউটার আনার বিষয়টি বাতিল করে দেন। ফলে নেদারল্যান্ডসের সেই কোম্পানি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মামলা করে। এ মামলা পরিচালনা করতে আইনজীবী নিয়োগ করতে হয়। এতে অনেক খরচ হয়। বাংলাদেশ একটি শাস্তি পায়। প্রায় ৬০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। ১০ হাজার কম্পিউটার তো গেলই, উল্টো আরও ৬০ কোটি টাকা দিতে হলো দেশের সরকার প্রধানের সিদ্ধান্তে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা ৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় গুরুত্বারোপ করি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিই, প্রযুক্তি শিক্ষার ব্যবস্থা করি এবং সস্তায় কেনার জন্য কম্পিউটার ও এর বিভিন্ন যন্ত্রাংশের ওপর থেকে শুল্ক কমিয়ে দিই, শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করি। সেই সঙ্গে আমরা আরেকটি উদ্যোগ নিয়েছিলাম যে, বিভিন্ন স্কুলে আমরা কম্পিউটার দেব। শিক্ষার্থীরা কম্পিউটার শিখবে। এজন্য বিভিন্ন কম্পিউটার সংগ্রহ করি। পরে ১০ হাজার কম্পিউটার কেনার একটি প্রকল্প হাতে নিই। কম্পিউটার কেনার জন্য তখন নেদারল্যান্ডসের সরকার একটা প্রস্তাব দিয়েছিল যে, তারা অর্ধেক খরচ দেবে, আমরা দেব বাকিটা। শর্ত হচ্ছে কম্পিউটার কিনতে হবে নেদারল্যান্ডসের কোম্পানি থেকে। আমরা এতে রাজি হয়ে যাই।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ ধরনের সরকার প্রধান থাকলে দেশের উন্নতি কীভাবে হবে আপনারাই ভালো জানেন। পরে আমরা ক্ষমতায় এসে অ্যানালগ টেলিফোনগুলো ডিজিটাল করে দিই। দেশে তখন একটা মাত্র মোবাইল ফোন কোম্পানি সেটিও খালেদা জিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোরশেদ খানের। এক একটা ফোন সেটের দাম ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। ফোন করলেও প্রতি মিনিটে ১০ টাকা, ধরলেও ১০ টাকা। আমি ৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে এটি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিই। ফলে প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়। দাম কমে এবং সারা দেশের টেলিযোগাযোগকে আমরা ডিজিটাল করি। সেই সঙ্গে স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ উৎক্ষেপণের উদ্যোগ নিই।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য দেশের একটি মানুষও গৃহহীন ও ভূমিহীন থাকবে না। বিদ্যুৎ আমরা শতভাগ পৌঁছে দিয়েছি মানুষের ঘরে ঘরে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন আমরা করে দিচ্ছি। সেই সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তা দিয়েছি। এখন আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম যেন উন্নত জীবন পায়, তার পদক্ষেপ নিয়ে প্রেক্ষিত পরিকল্পনাও তৈরি করে দিয়ে গেলাম। ডেল্টাপ্ল্যান-২১০০ করে দিয়েছি যেন এই ব-দ্বীপটা আগামী দিনে জলবায়ুর অভিঘাত থেকে রক্ষা পেয়ে দেশের প্রজন্মের পর প্রজন্ম একটা সুন্দর জীবন পায়।’

১৯৯১ সালে বিনামূল্যে আন্তর্জাতিকভাবে দেশে প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তখন আমাদের এই অঞ্চলে সাবমেরিন কেবল আসে, বাংলাদেশকে অফার দেওয়া হয়েছিল বিনামূল্যে যুক্ত হওয়ার জন্য। এটা দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ওয়েস্টার্ন ইউরোপ অর্থাৎ সিমিইউ সংযোগ দেওয়ার সুযোগ আসে। আমাদের দুর্ভাগ্য তখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী। সে বলে দিল এটা করা যাবে না, এটা করলে বাংলাদেশের সব তথ্য বিদেশে চলে যাবে।’

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ইশতেহারে আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে সরকার গঠন করে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন ডিজিটাল বাংলাদেশ। প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে আমাদের ব্রডব্যান্ড সংযোগ পৌঁছে গেছে। যেখানে পারেনি, সেখানে আমাদের বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর মাধ্যমে সবাই অনলাইনে কাজ করছে। আমরা এখন ডিজিটাল ডিভাইস তৈরি করছি।’

গবেষণা বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ প্রদান করছি। আমরা শিক্ষার্থীদের বিনা পয়সায় বই দিচ্ছি। তবে আমরা জোর দিচ্ছি বিজ্ঞানের ওপর। এই শিক্ষায় যাতে শিক্ষার্থীরা এগিয়ে আসে সেজন্য আলাদাভাবে ফেলোশিপ দেওয়া হচ্ছে। এই যুগে যেসব দেশ বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এগিয়ে যাচ্ছে, তারাই অর্থনৈতিকভাবে দ্রুত উন্নতি লাভ করছে। কাজেই উন্নতি করতে হলে গবেষণা একান্ত প্রয়োজন।’

দেশে স্বাস্থ্য বিষয়ে গবেষণা কম হচ্ছে জানিয়ে সরকার প্রধান বলেন, ‘স্বাস্থ্য বিষয়ে আমাদের দেশে গবেষণাটা খুব কম হচ্ছে। আমাদের দেশে খুব কম চিকিৎসক আছে...। আসলে তারা যতটা না রোগীর সেবা দিতে আগ্রহী, ঠিক ততটা আগ্রহ গবেষণার দিকে নেই। হাতেগোনা কয়েকজন নিয়মিত গবেষণা করেন। এ ক্ষেত্রে আমরা পদক্ষেপ নিচ্ছি। আমাদের স্বাস্থ্য বিষয়ে গবেষণাটা একান্ত দরকার।’

সরকার প্রতি বছরই গবেষণায় বিশেষ বরাদ্দ রাখছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘মৌলিক গবেষণার সঙ্গে প্রায়োগিক গবেষণার দিকে জোর দিতে হবে। আমাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই গবেষণা প্রয়োজন। কারণ গবেষণা ছাড়া উৎকর্ষ লাভ করা যায় না। এসডিজি গোল অর্জন করতে গবেষণার প্রয়োজন। দেশের অনেক সম্পদ রয়েছে। সেগুলো ব্যবহার করতে গবেষণার প্রয়োজন।’

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান।