আর এক দিন পর আগামী রবিবার নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। গতকাল বৃহস্পতিবার শেষ মুহূর্তে ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণে প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করেছেন সাত মেয়র প্রার্থী। কিন্তু এ নির্বাচনের প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী আওয়ামী লীগের সেলিনা হায়াৎ আইভী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকারের নজরের বাইরেই রয়ে গেছেন নগরীতে বসবাস করা ফুটপাতের হকার ও অটোরিকশা চালকদের মতো খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষরা। নগর পিতা হতে যারা লড়াইয়ে নেমেছেন তারা নগরের এসব খেটে খাওয়া মানুষগুলোর কাছে এখনো যাননি বলে অভিযোগ উঠেছে।
নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে এবার ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ১৭ হাজার ৩৫৭ জন। এর মধ্যে শ্রমজীবী ভোটার সংখ্যা কত জানতে চাইলে আইভীর প্রচারণায় যুক্ত থাকা সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক রাফিউর রাব্বী বলেন, মোট ভোটার সংখ্যার ১০ শতাংশ হতে পারে। ২০১৮ সালে নারায়ণগঞ্জে হকারদের সঙ্গে বড় ঘটনা ঘটে এই মেয়রের। আইভী হকারদের জন্য একটি নির্দিষ্ট জায়গা বরাদ্দ দিয়ে দোকানও করে দেন। হকাররা তা বিক্রি করে অথবা সেখানে আত্মীয়স্বজনদের দিয়ে আবারও ফুটপাতে ব্যবসা শুরু করে। এই হলো অবস্থা।
তৈমূরের নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত এসএম আকরাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, শ্রমজীবী মানুষ ও হকারদের উচ্ছেদের আগে বিকল্প ব্যবস্থা করে দেওয়ার একটি প্রতিশ্রুতি মেয়র প্রার্থী তৈমূর দিয়েছেন। তিনি বলেন, এই মেয়র (আইভী) দায়িত্ব পালনের সময় এই শহরে হকারদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। তৈমূর মেয়র নির্বাচিত হলে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটবে না, পরিকল্পনা করেই উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
শ্রমজীবী খেটে খাওয়া মানুষদের কত ভোট এখানে রয়েছে জানতে চাইলে আকরাম বলেন, শতকরা ১৫ শতাংশ হতে পারে। গতকাল নগর ও নগরীর আশপাশের দরিদ্র শ্রমজীবী অন্তত ১০ জনের সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। যাদের মধ্যে রয়েছে চা, পান-সিগারেট বিক্রেতা, ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, অটোরিকশা ও রিকশাচালক। এসব খেটে খাওয়া কর্মজীবী বলছেন, মেয়র প্রার্থীদের নজরে তারা পড়েননি। তাদের ভোট মেয়র প্রার্থীদের কাছে ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয় বলেই নজরের বাইরেই রয়ে গেছেন তারা।
এমনিতেই পেশা টিকিয়ে রাখা নিয়ে সবসময় এক ধরনের অনিশ্চয়তায় ভোগা, আবার মেয়র প্রার্থীদের তাদের প্রতি নজর না থাকায় এসব মানুষের চেহারায় ক্ষোভ-আতঙ্ক দুটোই দেখা গেছে। ফুটপাত থেকে হকারদের উচ্ছেদ করা হবে এমন আওয়াজও তাদের ভেতরে ভীতির সঞ্চার করেছে।
হকাররা বলছেন, কোনো মেয়র প্রার্থীই প্রচারণায় তাদের নিয়ে কোনো প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরেননি। বরং তারা নির্বাচিত হলে হকার উচ্ছেদ করবেন এমন প্রচার চালিয়ে নজর কেড়েছেন উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভোটারদের। তবে স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী তৈমূর কিছুটা হলেও আশ্বাস দিয়েছেন বিকল্প ব্যবস্থা করে দেওয়ার। বর্তমান মেয়র আইভী শহরের যানজট নিরসনে হকার উচ্ছেদের পাশপাশি অটোরিকশার মতো অনিবন্ধিত সব যান অপসারণের ব্যাপারে কড়া বার্তা দিয়েছেন। তাই এ শহরের খেটে খাওয়া দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষগুলো একরকম আইভীবিরোধী অবস্থান নিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহরের বিভিন্ন এলাকার ফুটপাতে বিভিন্ন জিনিসের পসরা বসিয়ে পেট চালাচ্ছে প্রায় হাজার পাঁচেক মানুষ। তাদের পরিবারের অন্য সদস্যদের ধরা হলে শ্রমজীবী পরিবারের ভোট রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার। অবশ্য সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করছে আড়াই হাজার মানুষ। পুরো নারায়ণগঞ্জ শহরের বিভিন্ন প্রান্তে অটোরিকশা ও অটো গাড়ির চালক-শ্রমিক আছে ১৫ হাজারের মতো। পরিবারের সদস্যসহ হিসাব করলে তাদের ভেতরে ভোট রয়েছে প্রায় ৩৫-৪০ হাজার। কোনো প্রার্থীই এসব শ্রমজীবী মানুষের বিকল্প কাজের ক্ষেত্র তৈরি করার আশ্বাস না দেওয়ায় তারা ফুঁসে উঠছে।
নির্বাচনী প্রচারে হকার ও অটোরিকশা শ্রমিকদের উচ্ছেদ নিয়ে অনেকটা কৌশলী স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম। আর দুবারের মেয়র নৌকার প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী শহরকে যানজটমুক্ত রাখতে হকার ও অটোরিকশা উচ্ছেদে অনড় অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। বিকল্প কাজ না দিয়ে হকার ও অটোরিকশা উচ্ছেদে কোনো প্রার্থীরই সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি নেই। খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষগুলো তৈমূরের কৌশলী বক্তব্যে তার দিকেই ঝুঁকে আছে। শহরের চাষাড়ায় সড়কে হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করে সংসার চালান উজ্জ্বল চন্দ্র দাশ। আদি বাড়ি কুমিল্লায় হলেও জন্ম এ শহরেই। পরিবারে ভোটার আছে চারজন। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভোট আসলে সবাই নানা আশা দেখায়। কিন্তু ভোট গেলে আর খবর রাখে না।’
১৪ নম্বর ওয়ার্ডের পপুলার গলিতে চায়ের দোকান রয়েছে অন্তত ২০টি। এসব দোকানির ভেতরেও বিরাজ করছে ভয়-অনিশ্চয়তা। পরিবারের সদস্যদের ভেতরে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে জানিয়ে সেখানকার দোকানি জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের ভেতরে একটি অনিশ্চয়তা রয়েছে। আইভী আসলে হকার, অটোরিকশা ও অটোগুলো তুলে দেবে। তখন আমরা কী খেয়েপরে বাঁচব? ভোটের পরে যদি সত্যিই আমাদের উচ্ছেদ করে দেয় তাহলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াব তা জানি না।’
শহরের বিভিন্ন এলাকায় অটোরিকশা চালিয়ে পাঁচজনের সংসার চালান মধ্যবয়সী শহীদুল। তিনি বলেন, ‘ভোটের পরে যদি সত্যিই বিকল্প ব্যবস্থা না করে দিয়ে আমাদের উচ্ছেদ করে দেয় তাহলে আমি নিশ্চিত করেই বলছি, আপনারা অনেক আত্মহত্যার গল্প লিখবেন।’
হকারদের বিষয়ে জানতে চাইলে মেয়র প্রার্থী আইভীর ছোট ভাই নগর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আলী রেজা উজ্জ্বল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নগরীর সব নাগরিকের সুবিধা-অসুবিধা মাথায় রেখেই মেয়র আইভী কাজ করেছেন। আগামীতেও তাই করবেন।’ শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আইভীর কথা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
পুলিশি হয়রানির অভিযোগ তৈমূরের, আইভী সমর্থকরা বলছেন অভিযোগ অমূলক : ভোটের মাঠের পরিবেশ এখন পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ থাকলেও তার কর্মী-সমর্থকদের পুলিশ হয়রানি করছে বলে দাবি করেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম। গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত নির্বাচনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রয়েছে। আমার কিছু লোককে গ্রেপ্তার ছাড়া বাকি সবই ঠিক চলছে।’ নির্বাচনে জয়ের ব্যাপার শতভাগ আশাবাদী জানিয়ে তিনি বলেন, পরিবেশ এমন থাকলে আমি সন্তুষ্ট।
এর আগে শহরের ১১ নম্বর ওয়ার্ডে নির্বাচনী প্রচারণায় নেমে পুলিশের কার্যক্রমের কারণে একটা ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি করেন তৈমূর আলম। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আন্তর্জাতিক দূতাবাসের যারা আছেন, পাশাপাশি মানবাধিকারকর্মী যারা আছেন তাদের সবাইকে বলব আমার নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে। কেন আমাদের নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি পুলিশ যাচ্ছে।’
তৈমূরের কর্মী-সমর্থকরা বলছেন, নির্বাচনের প্রচার শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত তাদের ১৭ জন নেতাকর্মী ও সমর্থককে পুরনো মামলায় পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। ভোটের আগে দুদিনে গ্রেপ্তারের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এ প্রসঙ্গে তৈমূরের প্রধান নির্বাচন সমন্বয়কারী নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব এটিএম কামাল বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের বড় সমস্যা হচ্ছে পুলিশ আমাদের নেতাকর্মীদের হয়রানি করছে।’
এ প্রসঙ্গে আইভীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির দায়িত্বে থাকা নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘নির্বাচনে যারা সহিংসতা সৃষ্টি করতে পারে শুধু তাদেরই পুলিশ নজরে রেখেছে এবং গ্রেপ্তার করছে।’
নির্বাচনে কাউন্সিলর প্রার্থীদের অনেকেই সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টির পাঁয়তারা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আইভী সমর্থকদের সঙ্গে কথা বলেও কাউন্সিলর ভোট নিয়ে সহিংসতার আশঙ্কার কথা জানা গেছে। তারা বলেন, ২৭টি ওয়ার্ডের অন্তত দেড় ডজন কাউন্সিলর সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত। ভোটের দিন নিজেদের জয় নিশ্চিত করতে তারা সহিংসতার আশ্রয় নিতে পারেন।
জনস্রোত সঙ্গে আছে দাবি আইভীর : মেয়র প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীর দাবি, জনস্রোত তার সঙ্গে আছে। তিনি বলেছেন, ‘জনগণ যখন আমার পাশে আমি কেন বাড়তি সুবিধা নিতে যাব। প্রশাসন কখনো আমার হাতের মুঠোয় ছিল না, আমি হাতের মুঠোয় নেওয়ার চেষ্টাও করিনি। আমি সবসময় মানুষের দোরগোড়ায় গিয়েছি, তাদের পাশে রাখার চেষ্টা করেছি।’ গতকাল দেওভোগে নিজ এলাকায় গণসংযোগে নেমে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
আইভীকে আনুষ্ঠানিক সমর্থন ইসলামিক ফ্রন্টের : আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন জানিয়েছে রাজনৈতিক দল ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ। আইভীর উপস্থিতিতে তার বাসভবনসংলগ্ন প্রচারণাস্থলে গতকাল ইসলামিক ফ্রন্টের চেয়ারম্যান বাহাদুর শাহ মোজাদ্দেদি তার দলীয় কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিক সমর্থনের এ ঘোষণা দেন।
আজ মধ্যরাতে শেষ হচ্ছে প্রচার : নগরবাসীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে নির্বাচনী প্রচার শেষ হচ্ছে আজ শুক্রবার মধ্যরাতে। গতকাল শেষ মুহূর্তে ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণে প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করেছেন সাত মেয়র প্রার্থী। একই সঙ্গে ২৭টি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত আসনের প্রার্থীদের মাঝেও চলছে সর্বশেষ প্রস্তুতি।