রাত পোহালেই নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হবে আগামীকাল রবিবার। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপি নেতা তৈমূর আলম খন্দকার ছাড়াও আরও পাঁচ মেয়র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবারের নাসিক নির্বাচনে। তবে ভোটের মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, মূলত লড়াই হবে নৌকা প্রতীকের আইভী ও হাতি প্রতীকের তৈমূরের মধ্যে। দীর্ঘ প্রচার-প্রচারণা সেরে গতকাল শুক্রবার প্রচারণার শেষ দিনে নৌকা ও হাতির প্রতীকের প্রার্থী নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করার ষড়যন্ত্র চলছে বলে অভিযোগ তুলেছেন। মিছিল-সমাবেশ, শোডাউন, পাল্টা শোডাউনের মধ্য দিয়ে এ দুই প্রার্থী গতকাল প্রচারণার সমাপ্তি টানেন।
৫ লাখ ১৭ হাজার ২৩৭ জন ভোটারের এই সিটিতে ২৭টি ওয়ার্ডে ১৯৭ জন কাউন্সিলর প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে ৩৫ জন সংরক্ষিত নারী প্রার্থী রয়েছেন। নগর পিতা নির্বাচিত করার পাশাপাশি ভোটাররা তাদের ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচন করবেন রবিবারের ভোটে।
প্রচারণার শেষ দিনে গতকাল গণমিছিল-পূর্ব পথসভায় সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে আইভী বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য মরতেও প্রস্তুত আছি। আমার জীবনকে বাজি রেখেছি। যেকোনো সময় আমার জীবনে অনেক কিছু ঘটতে পারে। আপনাদের জন্য মৃত্যুবরণ করতেও রাজি আছি।’ একইভাবে সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকার। তিনি বলেন, ‘সরকারি দলের উচ্চপর্যায়ের মেহমানরা (আওয়ামী লীগ নেতারা) নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন।’
নিজেদের জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হলেও দুই প্রার্থীই গতকাল গণসংযোগে নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। শঙ্কা আছে এ দুই মেয়র প্রার্থীর সমর্থকদের ভেতরেও। আইভী নিজে ও তার সমর্থকরা দাবি করেছেন, নারায়ণগঞ্জ মহানগরের ২, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ১১, ১৪, ১৬, ১৮, ২২ ও ২৩ নম্বর ওয়ার্ডে নির্বাচনে সহিংসতা সৃষ্টি করার জন্য স্থানীয় প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের ও তার দলবলের পরিকল্পনা রয়েছে। নৌকার প্রার্থী আইভীকে পরাজিত করতে প্রতিপক্ষ প্রার্থী তৈমূরকে বিজয়ী করতে এ সহিংসতার ছক তৈরি করেছে তারা।
আইভী সমর্থকদের শঙ্কা, নির্বাচনে একটি বিশেষ গোষ্ঠী সহিংসতার সৃষ্টি করে ভোটারদের কেন্দ্রবিমুখ করা চেষ্টা করবে। আইভীর সবচেয়ে বেশি ভোট নারীদের। ভোটকেন্দ্রে আতঙ্কজনক পরিবেশ সৃষ্টি করে নারী ভোটাররা যেন কেন্দ্রে আসতে না পারে দলের স্থানীয় প্রভাবশালী পরিবার সেই চেষ্টা করবে বলে আশঙ্কা আইভী সমর্থকদের। আইভী নিজেও তার ঘনিষ্ঠজনদের কাছে নারী ভোটারদের নিশ্চিন্তে ভোট দেওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি এতদিন গণসংযোগে নারী ভোটার টানারই কাজ করেছেন বেশি। শেষ বেলায় নারী ভোটারদের ব্যাপারে উদ্বেগও দেখা দিয়েছে বেশি।
নির্বাচনে সহিংসতায় নিজেরই ক্ষতি দেখছেন আইভী। তিনি বলেন, ‘সহিংসতা হলে আমার ক্ষতি হবে। আমার ভোটাররা আসতে পারবে না। আমি যদি বলি একটি পক্ষ তাই চাচ্ছে? আমার নির্বাচন সবচেয়ে বেশি জমজমাট। সেই জায়গাগুলোর মধ্যে হয়তো কেউ সহিংসতা করে ভোটকেন্দ্রে আসা বাধা দিতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি প্রশাসনের কাছে বরাবরই বলে আসছি যে, ভোটের দিন যাতে উৎসবমুখর থাকে। আমার নারী ভোটাররা যেন আসতে পারে। আমার ইয়াং ভোটাররা যেন আসতে পারে। কারণ আমি জানি এ ভোটগুলো আমার। আমি নির্বাচনে জিতবই ইনশাআল্লাহ।’
অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূরের সমর্থকরা বলছেন, পুলিশি হামলা ও ভয়ভীতি দেখিয়ে ভোটারদের কেন্দ্রবিমুখ করে রাখার চেষ্টা করতে পারেন নৌকা প্রার্থীর নেতারা। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অবাধ-সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পরিবেশে ভোটগ্রহণ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। কোনো প্রভাব ভোটের পরিবেশ বিঘ্নিত করতে পারবে না।
গতকাল গণসংযোগে নৌকার প্রার্থী আইভী বলেন, ভেতরের ও বাইরের একটি অংশ তাকে নির্বাচনে পরাজিত করতে উঠেপড়ে লেগেছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি ও আইভীর নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা আনোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কাছে তথ্য আছে দলের স্থানীয় একটি বড় অংশ যারা আইভীর বিরোধিতা করেছেন এবং করে আসছেন তারা সহিংসতার আশ্রয় নিতে পারেন। ভোটের পরিবেশ নষ্ট করে ভোটার উপস্থিতি কমাতে চান তারা।’ ওই অংশটি কারা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সবাই জানে তারা কারা। একটি সংবাদ সম্মেলন করে পক্ষে কাজ করার ঘোষণাই সব নয়। তলে তলে তার অনুসারীরা হাতির পক্ষেই কাজ করছে এখনো।’
স্থানীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের সমর্থক কাউন্সিলর যারা ভোটে দাঁড়িয়েছেন তারাই মূলত সহিংসতা সৃষ্টি করবে বলে তাদের কাছে তথ্য আছে দাবি করে আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘ওই কাউন্সিলর প্রার্থীরা হাতির পক্ষেই কাজ করছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের এসব তথ্য জানানো হয়েছে। তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন ভোটের পরিবেশ যেকোনো মুল্যে স্বাভাবিক রাখা হবে।’
নির্বাচনী পরিবেশ অশান্ত করে তুলতে সরকার সমর্থকরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে দাবি করেছেন হাতি প্রতীকের নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা এসএম আকরাম হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভোটের পরিবেশ সুষ্ঠু থাকলে নারায়ণগঞ্জবাসী তৈমূরকেই নগর পিতার আসনে বসাবেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আমরা জানিয়েছি কারা ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ নষ্ট করতে পারে। তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চাই সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ বজায় থাকুক। হামলা-মামলা এসব কিছু থেকে পুলিশ বিরত থাকুক। নারায়ণগঞ্জবাসী একটি সুষ্ঠু ভোটের মাধ্যমে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করার সুযোগ পাবেন।’
তবে এসব শঙ্কার বিষয় উড়িয়ে দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করে যাচ্ছি। আমরা নির্বাচনী মাঠের পর্যবেক্ষণ করেছি। কিছু কিছু ওয়ার্ডে টানটান উত্তেজনা আছে। বিশেষ করে সিদ্ধিরগঞ্জ অঞ্চলের ১, ২, ৬ নম্বর ওয়ার্ডসহ শহর ও বন্দরে কয়েকটি ওয়ার্ড আছে। সেখানে তিন স্তরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখানে সাদা পোশাকে পুলিশ, জেলা পুলিশ ও র্যাবের টহল অব্যাহত রয়েছে। এভাবে নির্বাচনের আগে কাজ চলমান আছে। আর নির্বাচনের দিন প্রতিটি কেন্দ্রে কমপক্ষে পাঁচজন করে পুলিশ সদস্য থাকবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে দুয়ের অধিক মোবাইল টিম থাকবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে স্ট্রাইকিং পার্টি থাকবে। ২০০ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন থাকবে। এছাড়াও জলযান, প্রিজন ভ্যানসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম থাকবে। তাছাড়া র্যাব, বিজিবি, আনসার থাকবে। সব মিলিয়ে পাঁচ হাজারের বেশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নির্বাচনের দিন কাজ করবে।’
জেলার পুলিশ প্রধান আরও বলেন, ‘আমাদের ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ১৯২টি। আর অল্প জায়গার ভেতরে আমাদের সিটি করপোরেশন। এমনও দেখা যাবে একটি প্রতিষ্ঠানেই একাধিক ভোটকেন্দ্র থাকবে। অর্থাৎ একটি প্রতিষ্ঠানেই শতাধিক পুলিশ সদস্য থাকবে। এমনও সময় আসবে ভোটারের চেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই বেশি দেখা যাবে। আমি বলতে পারি যেকোনো নির্বাচনে এত অল্প জায়গায় এতসংখ্যক ফোর্স কখনো মোতায়েন হয়নি, যেটি নারায়ণগঞ্জের এ নির্বাচনে হচ্ছে এবং হবে। নির্বাচনের পরও আমাদের বেশিরভাগ ফোর্স মোতায়েন থাকবে।’
নির্বাচন অফিস থেকে পাওয়া তথ্যমতে, পুরো সিটি করপোরেশনে ভোটের দিন পুলিশের স্ট্রাইকিং ফোর্স থাকবে ২৭টি। এছাড়া পুলিশের মোবাইল টিম থাকবে ৬৪টি। প্রতিটি টিমে পাঁচজন করে সদস্য থাকবেন। এর বাইরে ১৪ প্লাটুন র্যাব মোতায়েন থাকবে। অতিরিক্ত ছয় প্লাটুন র্যাব রাখা হয়েছে জেলা প্রশাসকের জন্য। এর পাশাপাশি র্যাবের স্ট্রাইকিং ফোর্স থাকবে তিনটি। চেকপোস্ট থাকবে ছয়টি। টহল টিম থাকবে সাতটি এবং স্ট্যাটিক টিম থাকবে দুটি।
প্রচারণার শেষ দিনে বিশাল মিছিলে শোডাউন আইভীর : প্রচারণার শেষ দিনে গতকাল শহরের প্রাণকেন্দ্র ২ নম্বর রেলগেট এলাকায় সমাবেশ ও গণমিছিলের মাধ্যমে বিশাল শোডাউন করেছেন মেয়র প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী। বেলা ৩টায় শুরু হওয়া সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সমন্বয়ক জাহাঙ্গীর কবির নানক। বিশেষ অতিথি ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুর রহমান, যুগ্ম সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম এবং নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের এমপি নজরুল ইসলাম বাবুসহ দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা।
সমাবেশে নানক বলেন, ‘নেত্রী (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) বলেছেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন নিয়ে কোনো আলোচনা হবে না। আমার প্রার্থী হলো আইভী এবং আইভী। সেই আইভীকে নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। এই আইভী হঠাৎ করে আসা কোনো মানুষ নয়। অগ্নিপরীক্ষায় পরীক্ষিত সেলিনা হায়াৎ আইভী।’
সমাবেশে সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের মানুষকে ভালোবেসে আস্থা রেখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমার হাতে নৌকা তুলে দিয়েছেন। সেজন্য কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রতি কৃতজ্ঞ তারা মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে দেখেছেন, এই নারায়ণগঞ্জের মানুষের মনের অবস্থান বুঝতে পেরেছেন। এই নৌকাকে রোধ করার ক্ষমতা কারও নেই।’
সমাবেশ শেষে আইভীর নেতৃত্বে একটি বিশাল মিছিল শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
ভোটের ফলাফল নিয়ে কেন্দ্র ছাড়ার আহ্বান তৈমূরের : নির্বাচনী প্রচারণার শেষ দিনে গতকাল নগরীর বন্দর ২২ নম্বর ওয়ার্ডে প্রচারণা চালিয়েছেন স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকার। বিকেলে বন্দরের সিরাজদৌলা ক্লাবের মাঠ থেকে তার বিপুলসংখ্যক কর্মী-সমর্থক মিছিল নিয়ে প্রচারণায় অংশ নেন। কয়েক হাজার মানুষের মিছিলটিতে বিভিন্ন আকৃতির হাতি প্রতীক, ব্যানার ও ফেস্টুন দেখা গেছে।
এ সময় তৈমূর বলেন, ‘আমি ভোট চাই, দোয়াও চাই। আপনারা ভোটকেন্দ্রে যাবেন এবং ফলাফল নিয়ে কেন্দ্র ছাড়বেন, এটাই আমার বিশ্বাস।’ তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচনের ভোটকেন্দ্রগুলোর সিসিটিভি বন্ধ রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে চাপ দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন কক্ষের সিসিটিভি বন্ধ রাখতে বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রের কেন্দ্রপ্রধানদের প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। আমি মনে করি, ভোট চুরিতে সুবিধার জন্যই এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেখানে অপরাধ দমনের জন্য পুলিশের পক্ষ থেকেই সিসিটিভি স্থাপনের জন্য বলা হয়, সেখানে ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি বন্ধের নির্দেশনার অর্থ কী দাঁড়ায়, সেটা না বোঝার কিছু নেই।’