বগুড়া থেকে ঢাকায় আসতে অন্তত সাতটি স্থানে পণ্যবাহী ট্রাক থেকে চাঁদা আদায় করা হয়। এর মধ্যে তিনটি স্থানে মাসিক হিসেবে পুলিশকে দিতে হয় ১ হাজার ৫০০ টাকা। বাকি চারটি স্থানে প্রতি ট্রিপে সর্বোচ্চ সাড়ে ৮০০ টাকা দিতে হয়। সবজির বাজার নিয়ে সম্প্রতি দেওয়া পুলিশের একটি প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি স্বরাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে পুলিশের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন।
প্রতিবেদনে চাঁদাবাজিসহ নানা কারণে ভরা মৌসুমেও সবজির বাজার চড়া বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে বাজারে কী ধরনের প্রভাব পড়েছে, সেটাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীরা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, প্রত্যন্ত এলাকা থেকে রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত সবজি পরিবহনে ঘাটে ঘাটে চাঁদাবাজি চলছে। এতে পণ্যের দাম দুই থেকে তিন গুণ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারও বেশি বেড়েছে। হাতবদলের সংখ্যা বেশি হওয়ায় কাঁচামালের বাজার অস্থির থাকছেই। তা ছাড়া ডিজেলের দাম বাড়ার দোহাই দিয়ে পরিবহন ব্যবসায়ীরা বেশি ভাড়া আদায় করছেন।
ব্যবসায়ীদের দাবি, কৃষকরা যে দরে সবজি বিক্রি করেন, ভোক্তাদের তা কিনতে তিন থেকে চার গুণ বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে। জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সবজির দাম নাগালের মধ্যে রাখতে সরকার নানাভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে। কেউ যদি ফায়দা লুটতে চায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সবজি ব্যবসায়ী বা বিক্রেতার কাছ থেকে কেউ চাঁদা আদায় বা কোনো ধরনের হয়রানি করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
পুলিশের প্রতিবেদনে থাকা তালিকা অনুযায়ী, বগুড়ার মোকাম থেকে সবজি আনতে প্রতিটি ট্রাককে বগুড়া পৌরসভার ৫০ টাকা টোল দিয়ে যাত্রা শুরু করতে হয়। এরপর শেরপুরে ৫০, সিরাজগঞ্জ ট্রাক মালিক-শ্রমিক সমিতিকে ৫০, সিরাজগঞ্জ শহরে গাড়ি ঢুকলে ৫০, সিরাজগঞ্জ মোড় হাইওয়ে পুলিশ খরচ (মাসিক) ৫০০, যমুনা সেতু গোল চত্বর হাইওয়ে পুলিশ খরচ (মাসিক) ৫০০, টাঙ্গাইল মোড় হাইওয়ে পুলিশ খরচ (মাসিক) ৫০০, সাভারের আমিনবাজারে (লাঠিয়াল বাহিনী) প্রতি ট্রিপ ১০০ থেকে ২০০, কারওয়ান বাজার পার্কিংয়ে ৫০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। এ ছাড়া প্রতি ট্রিপে যমুনা সেতুর টোল ১ হাজার ৪০০ টাকা রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বগুড়ার মহাস্থান হাট থেকে ঢাকায় আসতে প্রতিটি ৫ টনের ট্রাকের প্রতি ট্রিপে ডিজেলে সাড়ে ৬ হাজার, চালক-হেলপারের বেতন ২ হাজার এবং রাস্তায় ২ হাজার টাকা খরচ হয়। যদিও ৫ টনের ট্রাকে সাধারণত ১২ থেকে ১৩ টন সবজি পরিবহন করা হচ্ছে।
ডিজেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় খরচ কতটা বেড়েছে তা-ও পুলিশের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, একটি ৫ টন ক্ষমতার ট্রাক এক লিটার ডিজেলে আড়াই থেকে তিন কিলোমিটার চলে। তিন টনের মিনি ট্রাক এক লিটারে যায় ৫ থেকে ৬ কিলোমিটার। এক থেকে দুই টনের পিকআপ এক লিটারে যায় ৭ থেকে সাড়ে ৭ কিলোমিটার। এই হিসাবে মহাস্থান হাট থেকে ২০২ কিলোমিটার দূরত্বে ঢাকা যেতে গড়ে ডিজেল লাগে ৫ টন ট্রাকে ৮০ থেকে ৮১ লিটার। সম্প্রতি ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৬৫ থেকে ৮০ টাকা করায় বর্তমানে ডিজেল বাবদ খরচ হয় ৬ হাজার ৪৬৪ টাকা। ডিজেলের দাম বৃদ্ধির আগে খরচ হতো ৫ হাজার ২৫২ টাকা। এ হিসাবে বর্তমানে ডিজেল বাবদ অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে ১ হাজার ২১২ টাকা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিজেলের দাম বাড়ায় একটি ট্রাকের ভাড়া সর্বোচ্চ দেড় হাজার টাকা বাড়ার কথা। অথচ ট্রিপপ্রতি ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশের প্রতিবেদনে ‘পিক পয়েন্ট’ উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ডিজেলের দাম বাড়ার আগের ও পরের মূল্য পর্যালোচনায় দেখে গেছে, মাঠপর্যায়ে কাঁচামালের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। শীতকালীন সবজির উৎপাদন বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাজারে সবজির দাম তুলনামূলক কম হওয়ার কথা। অথচ সবজির দাম না কমে দেড় থেকে দুই গুণ বেড়েছে। কোনো কোনো পণ্যের ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধির হার আরও বেশি। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে যেকোনো সবজি শহরকেন্দ্রিক ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আগে বেশ কয়েকবার হাতবদল হয়। হাতবদল, যান ব্যবহার ছাড়াও অসাধু ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফালোভী মনোভাব, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যানজটসহ নানাবিধ কারণে বাজারে সবজির দাম বাড়ে। পাইকারি দামের শতকরা ৭০ থেকে ৮০ ভাগ বেশি লাভ করার প্রবণতা খুচরা ব্যবসায়ীদের মধ্যে লক্ষ করা গেছে। উত্তরবঙ্গ থেকে দেশের সবজির চাহিদার বড় অংশ পূরণ করা হলেও সেখানে তেমন বড় কোনো পাইকারি বাজার নেই। যার কারণে রংপুর, নাটোর, বগুড়াসহ আশপাশ জেলা থেকে সবজি গাড়িতে করে বড় পাইকারি বাজার কুমিল্লার নিমসার আড়তে আসে। এখান থেকে আবার হাতবদল হয়ে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ অন্যান্য জেলা শহরে এসব সবজি নিয়ে যাওয়ার জন্য আরেক দফা অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় ও হাতবদলের কারণে খরচ বাড়ছে। যারা কারওয়ান বাজার থেকে সবজি কিনে আবার পাইকারি বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় নেন, তাদেরও পরিবহনসহ বিভিন্ন ধরনের খরচ করতে হয়।
গত বুধ ও বৃহস্পতিবার কারওয়ান বাজারসহ কয়েকটি বাজারে সরেজমিনে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কৃষকরা সবজি বাজারে আনার পর একাধিক চক্রের হাতে চলে যায়। তারা কৃষকদের কাছ থেকে সবজি কিনে বিক্রি করছে আড়তে।
পাবনার ঈশ্বরদী থেকে আসা ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক বলছিলেন, তারা চার বন্ধু মিলে একটি ট্রাকে করে লাউ, কপি, মিষ্টিকুমড়াসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি নিয়ে এসেছেন কারওয়ান বাজারে। এখানে আনতে অন্তত ১০টি স্থানে টাকা দিতে হয়েছে। যাদের টাকা দিয়েছেন, তাদের বেশিরভাগই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য। আবার লাঠিয়াল বাহিনীকেও দিতে হয়েছে। চাঁদার হারও আগের চেয়ে বেড়েছে। কারওয়ান বাজারে বসার স্থানেও দিতে হয় টাকা। স্থানীয় কিছু লোক টাকা তোলে। তবে যারা টাকা নেয়, তাদের নাম বলতে চাননি তিনি। রাজ্জাক বলেন, চাঁদা ও তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সবজির দাম বাড়ছে।
আরও কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, প্রথমেই তাদের সবজিবাহী পিকআপকে ২-৩ হাজার টাকার বিনিময়ে কারওয়ান বাজার স্ট্যান্ডে বার্ষিক ভিত্তিতে তালিকাভুক্ত হতে হয়। এ ছাড়া প্রতি ট্রিপে শতকরা ১০ টাকা হারে স্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণকারীদের দিতে হচ্ছে। ৪০০ বর্গফুট জায়গা প্রতিরাতের জন্য ভাড়া ২ হাজার ১০০ টাকা এবং একই জায়গায় প্রতিদিনের জন্য সাড়ে ৩ হাজার টাকা দিতে হয়; যা পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলে।
আমাদের গাজীপুর প্রতিনিধি আমিনুল ইসলাম জানান, ওই এলাকার কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, শীতকালীন সবজির সরবরাহ পর্যাপ্ত হলেও দাম বেশ চড়া। গত বৃহস্পতিবার শহরের হাড়িনাল এলাকার বাড়িয়া গ্রাম থেকে ১০টি লাউ নিয়ে এসেছিলেন কৃষক সাদেক আলী। তিনি প্রতিটি লাউ ৩০ টাকা করে বিক্রি করেন পাইকারের কাছে। আর পাইকার এ লাউ নিয়ে খুচরা বিক্রি করেন নগরীর চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায়। চান্দনা চৌরাস্তা বাজারে খুচরা বিক্রেতা এমদাদুল একটি লাউয়ের দাম চাইলেন ৯০ টাকা। ৮০ টাকার কমে বিক্রি করবেন না বলেও জানিয়ে দিলেন। কৃষকের হাত থেকে খুচরা বিক্রেতার হাতে এসে লাউয়ের দাম এত বেশি হওয়ার কারণ জানতে চাইলে এমদাদুল বলেন, পাইকারি বাজার থেকে কেনার সময় টোল দিতে হয়েছে। রাস্তায় পরিবহন ও ওঠানো-নামানোর খরচ দিতে হয়েছে। এ ছাড়া আছে নিজের দোকানের ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল আর কর্মচারীর খরচ। ওঠানো-নামানোর সময় কিছু মাল নষ্ট হয়ে যায়। কিছু অবিক্রীত রয়ে যায়। এসব হিসাব করলে দাম এমনিতেই বেড়ে যায়। তার ওপর আছে রাস্তায় এখানে-সেখানে পুলিশ আর ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের চাঁদা।