জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুসারে সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশে^ তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশে এখন ৬০ ধরনের ২০০ জাতের সবজি উৎপাদিত হচ্ছে। ১ কোটি ৬২ লাখের মতো কৃষক পরিবার সবজি চাষের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু বৈশি^কভাবে উৎপাদনে সেরা অবস্থানে থাকলেও সবজির বিপণন ও বাজার নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে নানা প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান। দুঃখজনক বিষয় হলো সেরা উৎপাদক হওয়া সত্ত্বেও দেশের কৃষকরা সবজির ন্যায্যমূল্য পান না। আবার শহুরে ভোক্তাদেরও উচ্চমূল্যে সবজি কিনতে হয়। একদিকে সবজি মজুদে কৃষকের অক্ষমতার সুযোগ নিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীরা তৃণমূল পর্যায় থেকে কম দামে সবজি কিনে নেন, আরেক দিকে আধুনিক বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা না থাকার কারণে দেশের বাজারে দফায় দফায় হাতবদলের সঙ্গে সঙ্গে সবজির দাম বাড়তে থাকে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা-এর মতো জেলা পর্যায় থেকে রাজধানীসহ শহর-বন্দরগুলোতে পরিবহনের সময় নানারকম চাঁদাবাজির কারণে সবজির দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। ভয়াবহ বিষয় হলো সড়ক-মহাসড়কে এই চাঁদাবাজি যাদের বন্ধ করার কথা সেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথা পুলিশের চাঁদাবাজিই এক্ষেত্রে এক বিরাট সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শনিবার দেশ রূপান্তরে ‘পুলিশের চাঁদাবাজির তথ্য পুলিশের প্রতিবেদনে’ শিরোনামের সংবাদে দেশে সবজি বিপণনের ঘাটে ঘাটে চাঁদাবাজির বিশদ তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, বগুড়া থেকে ঢাকায় আসতে অন্তত সাতটি স্থানে পণ্যবাহী ট্রাক থেকে চাঁদা আদায় করা হয়। এর মধ্যে তিনটি স্থানে মাসিক হিসেবে পুলিশকে দিতে হয় ১ হাজার ৫০০ টাকা। বাকি চারটি স্থানে প্রতি ট্রিপে সর্বোচ্চ সাড়ে ৮০০ টাকা দিতে হয়। সবজির বাজার নিয়ে সম্প্রতি দেওয়া পুলিশের একটি প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি স্বরাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে পুলিশের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন। পুলিশের ওই প্রতিবেদনে চাঁদাবাজিসহ নানা কারণে ভরা মৌসুমেও সবজির বাজার চড়া বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীরা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, প্রত্যন্ত এলাকা থেকে রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত সবজি পরিবহনে ঘাটে ঘাটে চাঁদাবাজি চলছে। এতে পণ্যের দাম দুই থেকে তিন গুণ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারও বেশি বেড়েছে।
সবজির বাজার নিয়ে পুলিশের প্রতিবেদনে থাকা তালিকা অনুযায়ী, বগুড়ার মোকাম থেকে সবজি আনতে প্রতিটি ট্রাককে বগুড়া পৌরসভার ৫০ টাকা টোল দিয়ে যাত্রা শুরু করতে হয়। এরপর শেরপুরে ৫০, সিরাজগঞ্জ ট্রাক মালিক-শ্রমিক সমিতিকে ৫০, সিরাজগঞ্জ শহরে গাড়ি ঢুকলে ৫০, সিরাজগঞ্জ মোড় হাইওয়ে পুলিশকে (মাসিক) ৫০০, যমুনা সেতু গোল চত্বর হাইওয়ে পুলিশকে (মাসিক) ৫০০, টাঙ্গাইল মোড় হাইওয়ে পুলিশকে (মাসিক) ৫০০, সাভারের আমিনবাজারে (লাঠিয়াল বাহিনী) প্রতি ট্রিপ ১০০ থেকে ২০০, কারওয়ান বাজার পার্কিংয়ে ৫০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। এ ছাড়া প্রতি ট্রিপে যমুনা সেতুর টোল ১ হাজার ৪০০ টাকা রয়েছে। অন্যদিকে সম্প্রতি ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাত দেখিয়েও পরিবহন মালিকরা অযৌক্তিক হারে পরিবহন ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন বলেও জানানো হয়েছে পুলিশের ওই প্রতিবেদনে। একটি ৫ টন ক্ষমতার ট্রাক বগুড়ার মহাস্থান হাট থেকে ২০২ কিলোমিটার দূরত্বে ঢাকায় আসতে গড়ে ডিজেল লাগে ৮০ লিটারের মতো। ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৬৫ থেকে ৮০ টাকা করায় এই দূরত্বে বর্তমানে ডিজেল বাবদ খরচ হয় ৬ হাজার ৪৬৪ টাকা। আগে খরচ হতো ৫ হাজার ২৫২ টাকা। অর্থাৎ ডিজেলের দাম বাবদ অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে ট্রাকপ্রতি ১ হাজার ২১২ টাকা। পুলিশ বলছে, ডিজেলের দাম বাড়ায় একটি ট্রাকের ভাড়া সর্বোচ্চ দেড় হাজার টাকা বাড়ার কথা। অথচ ট্রিপপ্রতি ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা বেশি ভাড়া নিচ্ছেন পরিবহন মালিকরা।
লক্ষ করা দরকার, উত্তরবঙ্গ থেকে দেশের সবজির চাহিদার বড় অংশ পূরণ করা হলেও সেখানে তেমন বড় কোনো পাইকারি বাজার নেই। যার কারণে রংপুর, নাটোর, বগুড়াসহ আশপাশের জেলা থেকে সবজি গাড়িতে করে বড় পাইকারি বাজার কুমিল্লার নিমসার আড়তে আসে। এখান থেকে আবার হাতবদল হয়ে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ অন্যান্য জেলা শহরে এসব সবজি নিয়ে যাওয়ার জন্য আরেক দফা অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় ও হাতবদলের কারণে খরচ বাড়ছে। এক্ষেত্রে অবশ্যই কৃষি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে সবজিসহ অন্যান্য কৃষিপণ্যের বিপণন প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য আঞ্চলিক বাজার প্রতিষ্ঠাসহ প্রাসঙ্গিক জরুরি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এছাড়া শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রেলওয়ে ওয়াগনের মাধ্যমে স্বল্প ভাড়ায় সবজি পরিবহনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অন্যদিকে, এটা মন্দের ভালো যে, পুলিশের নিজস্ব প্রতিবেদনেই এখন পুলিশের চাঁদাবাজির কথা উঠে আসছে। সেক্ষেত্রে পথে পথে চাঁদাবাজি বন্ধের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবশ্যই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।