সম্প্রতি, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস খোলার নীতিমালার খসড়া চূড়ান্ত করেছে। আশা করা যাচ্ছে, অচিরেই এটা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে হয়তো চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে, এবং অনুমোদিতও হবে হয়তো যথারীতি। এমন উদ্যোগে সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়তো হবে, সঙ্গে থাকবে ঝুঁকিও। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও দেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই নীতিমালার পক্ষে ও বিপক্ষে অবস্থান করছে নানা যুক্তিতে। এমনটা করবার পেছনে যুক্তি যা-ই থাক না কেন, লাভ-ক্ষতির এক অদৃশ্য খতিয়ান যে আছে, তা সহজেই অনুমেয়। এমন দোলাচালের সন্ধিক্ষণে, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাসের প্রয়োজনীয়তা আর ঝুঁকির প্রকৃত অবস্থান নিরূপণে এই প্রবন্ধের অবতারণা।
বাংলাদেশে আরও বিশ্ববিদ্যালয় দরকার, নাকি গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দরকার? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সংগত কারণে যথেষ্ট কঠিন। বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা আর উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে যা চলছে, তাকে কোনো শব্দে ব্যাখ্যা করা না গেলেও, এগুলোর ত্রাহি অবস্থা কারও উপলব্ধির বাইরে নয়। সরকারি ও বেসরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নিয়ে দেশের মানুষের পাশাপাশি, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনও যথেষ্ট উদ্বিগ্ন; তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সাম্প্রতিক কালে, সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাশাপাশি চলছে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার হিড়িক। কিন্তু, নামটুকু ছাড়া এগুলোর সেই ভাবে কোনো বিশেষ অ্যাকাডেমিক চরিত্র নেই। এগুলোতে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই সায়েন্স ও নন-সায়েন্স সব ধরনের বিভাগ খুলে, এগুলোর নামের ওপর সাংঘাতিক অবিচার করা হয়েছে। অথচ পাশের দেশ ভারতে, আইটি ইনস্টিটিউটগুলো তাদের নাম ও চরিত্রের সঙ্গে মিল রেখেই বিশ্বমানের শিক্ষা প্রদান করছে। তারই ফলে, তাদের গ্র্যাজুয়েটরা সারা বিশ্ব দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। গুগল, ইউটিউব এবং টুইটারেও আজ ভারতীয় গ্র্যাজুয়েটরা সিইওর পদে আসীন। এসব সম্ভব হয়েছে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা আর দীর্ঘমেয়াদি চেষ্টার ফলে। অথচ বাংলাদেশে, বুয়েট, কুয়েট, রুয়েট, চুয়েট আর ডুয়েট বাদ দিলে, অন্য বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলছে এক অনিয়ন্ত্রিত জগাখিচুড়ি অবস্থা। যথেষ্ট মেধাবী শিক্ষকের অভাব, অবকাঠামোর অভাব, আর প্রশাসনিক অনিয়ম ও অস্থিরতা এগুলোকে দুর্বল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। যদিও সরকার এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে যথেষ্ট বাজেট দিচ্ছে, কিন্তু তা শুধু দালানকোঠা বানানোর জন্য ব্যয় হচ্ছে। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাকে, আমরা ‘অ্যাকাডেমিক এক্সিলেন্স’-এর লেভেলে নিতে পারিনি; বরং বিল্ডিং বানানো আর নিয়োগ দেওয়াই যেন এই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান কাজ। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আর কর্মচারীদের যোগ্যতার আর কাজের প্রোফাইলের ওপর যদি একটা সমীক্ষা চালানো যেত, তাহলে এদের কর্মক্ষমতা আর দক্ষতার স্বরূপ উন্মচিত হতো, আর বোঝা যেত এগুলোতে শিক্ষার প্রকৃত অবস্থা!
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাশাপাশি, উচ্চশিক্ষার আর এক হতাশার চিত্র ফুটে ওঠে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান এবং প্রশাসনিক পরিকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ন্যায্যত দাবি করে যে, তারা আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। এমনটা সত্য হলেও, অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে অন্যখানে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত নামকরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বাদে, অন্যদের যাবতীয় ধ্যানজ্ঞান নিবদ্ধ রয়েছে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর লেভেলের তিন সেমিস্টারে শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে। গবেষণা বা রিসার্চ ডিগ্রি দেওয়াতে তাদের তেমন কোনো আগ্রহ লক্ষ করা যায় না। অনার্স, মাস্টার্স আর সার্টিফিকেট কোর্সেই তাদের বেশির ভাগ শিক্ষা কার্যক্রম সীমাবদ্ধ।
দেশীয় ব্যবস্থাপনায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এমন অসন্তোষজনক অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওভারসিস ক্যাম্পাস কিছুটা আশার সঞ্চার ঘটাতে পারে। তবে, সেটা যেন স্বনামধন্য বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাডি সেন্টার না হয়ে স্যাটেলাইট ক্যাম্পাস হয়। তাহলে অনেক মেধাবীই, এখানে শুধু টিউশন ফিস দিয়ে, দেশে থেকেই উচ্চতর এবং মানসম্মত ডিগ্রি নিতে সমর্থ হবে। তবে, যেটা সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সেটা হলো, দেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তখন এক অ্যাকাডেমিক প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হবে। শুধু বয়সে আর সাইজে বড় হলেই যে আর পার পাওয়া যাবে না, সে বিষয়টা তখন স্পষ্ট হবে। খুব সহজেই তখন একটা অভিন্ন র্যাংকিং সিস্টেম চালু করা সম্ভব হবে। যেখানে, শুধু শিক্ষক, কর্মচারী, শিক্ষার্থীদের আর বিল্ডিংয়ের সংখ্যা দিয়ে উৎরে যাওয়া যাবে না। গবেষণা ও মানসম্মত শিক্ষার তখন আর কোনো ব্যতিক্রম থাকবে না। সব বিশ্ববিদ্যালয় তখন এক ধরনের চাপ অনুভব করবে নিজেদের শিক্ষার মান ও পরিবেশ তৈরি করতে। এমনটা করতে পেরেছে মালয়েশিয়া, কাতার ও আরব আমিরাত। শিক্ষাক্ষেত্রে এদের সাম্প্রতিক সাফল্য ঈর্ষণীয়। এ সমস্ত দেশে, ব্রিটিশ, আমেরিকান আর অস্ট্রেলিয়ান নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের ক্যাম্পাস খোলার পর, তাদের উচ্চশিক্ষার পরিবেশ আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের পাশাপাশি, তারা তাদের দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মান উন্নত করতে বাধ্য করেছে।
তাই বাংলাদেশে, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের এক ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথমত, এর মাধ্যমে, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা দেশে বসেই বিদেশি শিক্ষার সুযোগ পাবে। দ্বিতীয়ত, দেশীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মানোন্নয়নের জন্য এক ধরনের চাপে পড়বে। তৃতীয়ত, বিদেশি র্যাংকিংয়ের পাশাপাশি, দেশীয় একটা অভিন্ন র্যাংকিং চালু করা সম্ভব হবে। চতুর্থত এবং শেষত, যেটা সবচেয়ে কার্যকর হবে, সেটা হচ্ছে গবেষণার নতুন পরিধি ও মাত্রা তৈরি হবে। তবে, এক্ষেত্রে অবশ্যই, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে শর্ত জুড়ে দিতে হবে যেন, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের গবেষণার ন্যূনতম ৫০ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশ বাজেট ও বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার ওপর। তাহলেই, সম্ভব হবে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার সুষম সুফল পাওয়া।
কিন্তু বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস খোলার মধ্য দিয়ে যদি শুধু অনার্স আর মাস্টার্সেই শিক্ষার্থী ভর্তি করাই লক্ষ্য হয়, তবে এমন বাণিজ্যিক চিন্তাভাবনা কোনোভাবেই দেশে শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে না। আর একটা বিষয় হচ্ছে, তারা কি শুধু নামকাওয়াস্তে উপনিবেশ তৈরির মতো শুধু ক্যাম্পাস খুলে ব্যবসা চালাবে, নাকি যথেষ্ট বিজ্ঞ-অভিজ্ঞ প্রফেসরসদের বছরের একটা নির্দিষ্ট সময় এখানে পাঠিয়ে সরাসরি তাদের থেকে শিক্ষালাভের সুযোগ করে দেবে? অর্থাৎ অন্তত এক-তৃতীয়াংশ বিদেশি শিক্ষক এসব ক্যাম্পাসে রাখা জরুরি হবে। নচেৎ, বিষয়টা দাঁড়াবে বিদেশি বোতলে, দেশি সুধা। তবে শুধু শিক্ষক নয়, সার্বিক লেখাপড়াতে মূল বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্যান্ডার্ড ধরে না রাখতে পারলে, লাভের লাভ কিছুই হবে না। এ বিষয়টা অনেক জরুরি, কারণ কিছু বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের মূল প্রতিষ্ঠান আর স্যাটেলাইট ক্যাম্পাসের ভেতর কোয়ালিটির ব্যালান্স রাখতে পারে না। সেক্ষেত্রে, কেউ আমাদের দেশে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শুধু সার্টিফিকেট বাণিজ্য দেখতে চাইবে না।
তবে, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস খোলার মূল ঝুঁকি অন্যখানে। যেমন, দেশীয় উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা শুধু বিদেশি প্রতিষ্ঠান নির্ভর হওয়ার আশঙ্কাও আছে। তখন, অনেক দেশীয় মেধাবী আকাশছোঁয়া টিউশন ফির অভাবে বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে, উচ্চশিক্ষার স্কিম থেকে বাদ পড়তে পারে। এর পাশাপাশি অনেক দেশীয় গুণী ও মেধাবী শিক্ষক দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার আগ্রহ হারিয়ে উঁচু বেতনের বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি নিতে পারেন। তাতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানে এক ধরনের মেধাশূন্যতা তৈরি হতে পারে। তাই, শুধু বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস খুললেই চলবে না, বরং দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক ব্যালান্সটা বজায় রাখবার পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় পরনির্ভরশীলতা, আমাদের দেশীয় উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন ও বিচার বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়