নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের শিক্ষা

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ব্যতিক্রমী কিছু ঘটেনি। প্রত্যাশিত ফলই হয়েছে। মেয়র পদে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা মার্কার প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী স্বতন্ত্র প্রার্থী সদ্য সাবেক বিএনপি নেতা তৈমূর আলম খন্দকারের চেয়ে প্রায় ৬৬ হাজার বেশি ভোট পেয়ে জয়লাভ করেছেন। তবে, বিএনপি দলীয়ভাবে এবারের নির্বাচন বর্জন করেছে। বিএনপি নেতা তৈমূর আলম খন্দকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দিলে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। যদিও বিএনপি নেতাকর্মীরাই ছিলেন তার নির্বাচন-যুদ্ধের প্রধান সেনানী। দলীয়ভাবে বিএনপি নির্বাচনে না থাকায় এবং এর আগে পরপর দুবার নির্বাচিত মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ায় একতরফা ফলাফল হবে বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অভিমত ব্যক্ত করছিলেন। তবে সাবেক বিএনপি নেতা তৈমূর যতটা শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়বেন বলে আশা করা হয়েছিল, তেমনটি ঘটেনি। এটা নিঃসন্দেহে সেলিনা হায়াৎ আইভীর ব্যক্তিগত ইমেজের ফল। পরিচ্ছন্ন ও সৎ রাজনীতিবিদ হিসেবে খ্যাতি পাওয়া আইভী টানা তৃতীয়বার বিপুল ভোটে নারায়ণগঞ্জের মেয়র হয়ে নতুন ইতিহাস গড়লেন।

বিএনপি অংশগ্রহণ না করলেও তৈমূর আলম খন্দকার প্রার্থী হওয়ায় মোটামুটি একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। আইভী ও তৈমূরের কর্মী-সমর্থকদের মুখর পদচারণায় উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়। নির্বাচন নিয়ে বড় কোনো অনিয়ম, কারচুপি বা সন্ত্রাসের অভিযোগ পাওয়া যায়নি। ইভিএম নিয়ে যান্ত্রিক ত্রুটি এবং কিছু ভোটারের প্রযুক্তিভীতির কারণে খানিকটা ভোগান্তি হলেও শান্তিপূর্ণভাবেই ভোটগ্রহণ ও গণনা শেষ হয়েছে। এবারই প্রথম নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে শতভাগ ইভিএম ব্যবহার করা হয়েছে।

এটি ছিল বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদে সর্বশেষ সিটি করপোরেশন নির্বাচন। এ প্রসঙ্গে ভিন্নধর্মী বক্তব্য প্রদানের জন্য আলোচিত নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেছেন, ‘এই নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য কোনো সংঘর্ষ ও সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেনি। বিগত পাঁচ বছরে যত সিটি করপোরেশন নির্বাচন হয়েছে, আমার বিবেচনায় আমাদের প্রথম কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন ও সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন সর্বোত্তম।’ তবে নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হওয়ার পর স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকার এই পরাজয়ের জন্য ইভিএম কারচুপি, ইন্টারনেট লাইনের জটিলতা, ভোটের আগে নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার এসব কারণকেই দায়ী করেছেন। যদিও তার এই দাবি পরাজিত প্রার্থীর গৎবাঁধা বুলি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। এমনিতে সিটি করপোরেশন হিসেবে নারায়ণগঞ্জের আলাদা কোনো তাৎপর্য নেই। তার পরও ঢাকার সন্নিকটে এই ছোট্ট সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে প্রতিবারই এক ধরনের বাড়তি আকর্ষণ তৈরি হয়। এক ধরনের উত্তেজনাও তৈরি হয়। এর প্রধান কারণ স্থানীয় আওয়ামী রাজনীতির দুটি পক্ষের মুখোমুখি অবস্থান। এর একপক্ষে রয়েছেন মেয়র আইভী এবং অপর পক্ষে রয়েছেন শামীম ওসমান এমপি। এই দুই পরিবারের মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। ১৯৭৩ সালে পৌর চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করার জন্য আলী আহাম্মদ চুনকা (আইভীর বাবা) নিজের দল আওয়ামী লীগের সমর্থন চেয়েও পাননি। সেসময় শামীম ওসমানের বাবা এ কে এম শামসুজ্জোহার সমর্থনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান মহিউদ্দিন আহম্মেদ খোকা ওরফে খোকা মহিউদ্দিন। আওয়ামী লীগের সমর্থন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে বিপুল ব্যবধানে জয়ী হন আলী আহাম্মদ চুনকা। এরপর থেকে চুনকা পরিবার ও ওসমান পরিবারের মধ্যে শীতল দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এরপর ১৯৮০ সালে জেলা আওয়ামী লীগ সম্মেলনে শামসুজ্জোহা ও চুনকা সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, এতে চুনকা জয়ী হন। ১৯৮৪ সালে আলী আহাম্মদ চুনকা মারা যান। ১৯৮৫ সালে তার মেয়ে সেলিনা হায়াৎ আইভী বিদেশে পড়তে গেলে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির মাঠে একক কর্র্তৃত্ব করতে থাকে ওসমান পরিবার। যদিও শহর আওয়ামী লীগ সভাপতি অধ্যাপিকা নাজমা রহমানের নেতৃত্বে সংগঠিত থাকেন চুনকার সমর্থকরা। ১৯৮৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে নৌকা নিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে নির্বাচন করেন নাজমা রহমান। ১৯৯২ সালে চুনকার মেয়ে সেলিনা হায়াৎ আইভী দেশে ফিরে আসেন। ২০০৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচনে জয়লাভ করে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্রথম নারী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পৌরসভা বিলুপ্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি এই পদে বহাল ছিলেন। ২০১১ সালের ৫ মে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা, সিদ্ধিরগঞ্জ পৌরসভা ও কদমরসূল পৌরসভাকে বিলুপ্ত করে ২৭টি ওয়ার্ডের সমন্বয়ে গঠিত হয় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন। ওই বছরের ৩০ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জে প্রথমবারের মতো সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে সেলিনা হায়াৎ আইভী মেয়র হিসেবে জয়লাভ করেন। তিনি বাংলাদেশের সিটি করপোরেশনের প্রথম নারী মেয়র। এই নির্বাচনকে ঘিরেই ওসমান ও চুনকা পরিবারের দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছায়। কারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আইভী ও শামীম ওসমান। ৩৭ বছর আগে ১৯৭৩ সালে যা হয়েছিল তারই পুনরাবৃত্তি ঘটে ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচনে। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে সমর্থন মেলেনি সেলিনা হায়াৎ আইভীর। নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে শামীম ওসমানকে এক লাখের বেশি ভোটে পরাজিত করে জয় ছিনিয়ে নেন আইভী। ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর দ্বিতীয় নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে আবার নির্বাচিত হন।

মূলত আইভীর সঙ্গে শামীম ওসমানের দ্বন্দ্বের কারণেই নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে বাড়তি আগ্রহ লক্ষ করা যায়। আইভী ও শামীম ওসমান একে অপরের সম্পর্কে কী বলেন, তা হয়ে ওঠে সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নির্বাচনী ডামাডোলের মধ্যেই আইভী শামীম প্রতিপক্ষ সম্পর্কে বলেন, ‘তৈমূর আলম খন্দকার গডফাদার শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের প্রার্থী। তিনি বিএনপিরও প্রার্থী নন, জনতার প্রার্থীও নন। শামীম ওসমান তাকে প্রার্থী করেছেন। তিনি বিএনপির প্রার্থী হলে ধানের শীষেই নির্বাচন করতেন। তিনি গডফাদারের প্রার্থী। তিনি দন্তবিহীন গডফাদার, নতুন করে আবার উত্থান হতে শুরু করেছেন।’ আইভীর এমন মন্তব্যের পর আর চুপ থাকেননি শামীম ওসমান। ১০ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, ‘এখানে কে প্রার্থী, হু কেয়ারস। কলাগাছ না আমগাছ সেটা দেখার বিষয় না। এটা আমার স্বাধীনতার নৌকা, এটা বঙ্গবন্ধুর নৌকা, এটা আমাদের ৪৯ জন লাশের নৌকা, চন্দন শীলের ২ পায়ের বিনিময়ের নৌকা। নৌকার বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’ আইভীর মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় শামীম ওসমান আরও বলেন, ‘দুদিন আগে একটি ভিডিও দেখলাম, সেখানে উনি (আইভী) বলছেন, শামীম ওসমান আমাদের নেতা। উনি বড়ভাই, আওয়ামী লীগের এমপি। দুদিনের মধ্যে গডফাদার হয়ে গেলাম। আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে আমার দল। আমি যদি গডফাদার হই, তাহলে আমাকে মনোনয়ন দিয়েছেন কে? কাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হলো? যে বলেছে, তার (আইভী) কাছে জিজ্ঞেস করেন, আপনি দুদিন আগে এটা বলেছেন, দুদিন পরে এটা বললেন। কোনটা সঠিক। তিনি প্রশ্ন রেখে আরও বলেন, দুদিন আগে ছিলাম ভাই, এখন গডফাদার হলাম কীভাবে?’

আইভী-শামীম ওসমানের দ্বন্দ্বকে উসকে দেওয়া, তাদের খুঁচিয়ে এক-অপরের বিরুদ্ধে কিছু একটা বলানোর ক্ষেত্রে আমাদের দেশের গণমাধ্যমের ভূমিকাও একেবারে কম নয়। রাজধানীর সন্নিকটে অবস্থিত এমন একটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পাওয়ার কথা, সেগুলো অনালোচিতই থেকেছে। নারায়ণগঞ্জের সমস্যা, মেয়র হিসেবে দীর্ঘদিন একটানা দায়িত্ব পালনকালে আইভী কী করেছেন, কী করেননি, তৈমূর নতুন কী করতে চান, নাগরিক সমস্যা সমাধানে কী পরিকল্পনা এসব বিষয় হারিয়ে গেছে আইভী-শামীম দ্বন্দ্বের ঝড়ে। আমাদের সামগ্রিক অধঃপতনের এটাও একটা নমুনা। সদিচ্ছা থাকলে যে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা যায়, তার উদাহরণ নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন। একটি ভালো নির্বাচনের জন্য প্রশাসনও বদলাতে হয়নি, নির্বাচন কমিশনকেও পরিবর্তন করতে হয়নি। সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আসলে শাসক দলসহ রাজনৈতিক কর্র্তৃপক্ষের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার ওপর নির্ভর করে। নারায়ণগঞ্জে তা আবারও প্রমাণ হলো।

নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনে ভোটাররা তাৎপর্যপূর্ণ একটি বার্তা দিয়েছেন দেশের জন্য, রাজনীতিকদের জন্য। সাধারণভাবে ক্ষমতাসীন দলের প্রতি মানুষের নানা ক্ষোভ-বিক্ষোভ থাকে, থাকে নানা সমালোচনা। কিন্তু আইভীর পরিচ্ছন্ন, দুর্নীতিমুক্ত ইমেজ সেসব ক্ষোভ-বিক্ষোভকে বড় করে তোলেনি। তার প্রমাণ আইভীর প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা। নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলো এই বার্তাটুকু বিবেচনায় নিতে পারে। বিএনপিরও এই নির্বাচন থেকে শিক্ষা নেওয়ার আছে। রাজনীতির ইতিবাচক ধারায় অবশ্যই তাদের ফিরে আসতে হবে। বর্জন-প্রতিরোধ কিংবা জ্বালাও-পোড়াওয়ের ইমেজ থেকে তাদের বের হয়ে আসতে হবে। গণতন্ত্রে ক্ষমতা পরিবর্তন বা নিজের পছন্দের ব্যক্তির মাথায় মুকুট পরাতে কিংবা অপছন্দের ব্যক্তিকে প্রত্যাখ্যান বা জব্দ করতে নির্বাচন বা ভোটই হচ্ছে একমাত্র লাগসই অস্ত্র। এর কোনো বিকল্প নেই। কোনো, শর্টকাটও নেই।

লেখক লেখক ও কলামনিস্ট

chiros234@gmail.com