তারকাদের স্মৃতিতে নারায়ণ দেবনাথ

‘নন্টে ফন্টে’, ‘বাঁটুল দি গ্রেট’ কিংবা ‘হাঁদা ভোঁদা’র নাম শোনেনি এমন বাংলা ভাষাভাষী মানুষ কমই আছে। তুমুল জনপ্রিয় এই চরিত্রগুলোর স্রষ্টা কলকাতার নারায়ণ দেবনাথ। গতকাল চিরবিদায় নিলেন এই কিংবদন্তি কার্টুনিস্ট। তার মৃত্যুতে অনেকেই নস্টালজিক হয়ে পড়েছেন। শোবিজ তারকাদের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন মাসিদ রণ

তার হাত থেকেই পদক গ্রহণ করেছি

মেহেদী হক, ঢাকা কমিকসের কর্ণধার ও কার্টুনিস্ট

২০১৭ সালে কলকাতায় চালু হয় ‘বেস্ট কমিকস আর্টিস্ট অব দ্য ইয়ার’ পদকটি। সে বছরই ‘নারায়ণ দেবনাথ কমিকস পুরস্কার’ পায় বাংলাদেশের কমিকস প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘ঢাকা কমিকস’। পদক গ্রহণ করতে গিয়ে বাংলা কমিকসের প্রবাদপুরুষ নারায়ণ দেবনাথের সান্নিধ্য পাই। স্বয়ং নারায়ণ দেবনাথের হাত থেকেই পদক গ্রহণের সুযোগ হয় আমার। ৯২ বছর বয়সেও তিনি নিজে গত ২৮ ডিসেম্বর এসেছিলেন কলকাতার বাংলা আকাদেমির জীবনানন্দ সভাঘরে। অল্পবিস্তর কথাবার্তার পর আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি শুনে দাওয়াত করে বসলেন তার বাড়ি কলকাতার হাওড়ার শিবপুরে! আমরা পরদিনই হাজির তার বাড়িতে। জানলাম, এ বাড়িতেই তার জন্ম, আর বাড়ির বয়স প্রায় দেড় শ বছর! অবাক হয়ে গেলাম তাকে দেখে! দিব্যি আঁকছেন! এই বয়সেও সপ্তাহে দুই পৃষ্ঠা ‘নন্টে ফন্টে’ এঁকে নিজের হাতে সংলাপ লিখে পত্রিকায় পাঠান। আমাদের দেখে আবার উচ্ছ্বসিত হয়ে শোনাতে শুরু করলেন বিক্রমপুরে তার শৈশবস্মৃতি। বললেন, দেশভাগের পর আর দাদাবাড়ি বিক্রমপুরে যাওয়া হয়নি। ভোজনরসিক মানুষটি মজা করে বললেন, ঢাকার ‘প্যাঁচ পরোটা’ খাওয়ার জন্য হলেও আরেকবার বাংলাদেশে যেতে চাই। ফেরার সময় ফিসফিস করে জানতে চাইলেন, ‘আচ্ছা, বাংলাদেশে কি আমাকে কেউ চেনেটেনে? মানে আমার কমিকস পড়ে?’ আমি ভাষা হারিয়ে ফেললাম তার শিশুর মতো ব্যবহারে! শুধু বলতে পারলাম, ‘খালি পড়ে না, গিলে! পড়ুয়া যে কেউই আপনার কমিকস পড়েই বড় হয়েছে আমাদের ওখানেও।’

যতটা শোকের তার চেয়ে ক্ষতি

রুনা খান, অভিনেত্রী

নন্টে ফন্টে আমার খুবই প্রিয় কমিক বই এবং প্রিয় দুটি চরিত্র। তাই বড় হয়ে এর স্রষ্টা নারায়ণ দেবনাথের প্রতি অন্যরকম শ্রদ্ধাবোধ জন্মায়। তিনি চলে গেছেন, এটা যতটা শোকের খবর তার চেয়ে ক্ষতির। একদল চলে যাবেন, আরেকদল এসে সেই জায়গা পূরণ করবেনসেটাই তো নিয়ম। কিন্তু তা হচ্ছে না। যে মানের শিল্পীরা চলে যাচ্ছেন, সেই মানের নতুন শিল্পী তৈরি হচ্ছে না।  

আমি তো বটেই, মাও ভক্ত

মৌটুসী বিশ্বাস, অভিনেত্রী

আমি তখন চট্টগ্রামে থাকি। বাবা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তিনি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে গবেষণা করছিলেন। সেই সুবাদে প্রায় বাই রোডে কলকাতা যাতায়াত করতে হতো। একবার সেখান থেকে তিনি আনলেন ‘হাঁদা ভোঁদার কা-কারখানা’। বইটি আমি যেন গো-গ্রাসে গিলেছিলাম। এক কথায় নেশা হয়ে গিয়েছিল। এরপর মাঝে মাঝে কলকাতা বেড়াতে গেলে ট্রেন থেকে নেমেই আমার চোখ চলে যেত ছোট ছোট স্টলে। চকলেটের চেয়ে আকৃষ্ট করত ‘নন্টে ফন্টে’, ‘বাটুল দ্য গ্রেট’ বইগুলো। বাবা শিক্ষক, হিসাব করেই চলতে হতো। কিন্তু কমিকস কেনায় কোনোদিন আপত্তি করতেন না বাবা-মা। এরপর তো একটা সময় চট্টগ্রামেও দেখি ‘নন্টে ফন্টে’ চলে এসেছে। তখন বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে কার কোনটা কোনটা পড়া হয়নি সেই কমিকসগুলো আদান-প্রদান করা হতো। আমার শৈশবের উজ্জ্বল স্মৃতি নারায়ণ দেবনাথের কমিকস। আমি তো বটেই, মাও ভক্ত। ক’বছর আগে কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে ‘নন্টে ফন্টে সংকলন’ দেখে মা এক মুহূর্ত দেরি করলেন না। কিনে নিয়ে এলেন। শুধু আমাদের দুই জেনারেশন নয়, এর পরের জেনারেশনও তার কমিকসের ভক্ত। আমার মেয়েও তার কমিকসের সঙ্গে পরিচিত, তবে বইয়ের পাতায় নয়। কলকাতায় তার কমিকস নিয়ে অ্যানিমেশন কার্টুন তৈরি হয়েছে। সেগুলো দেখেছে। তবে আমার মতো আরও অনেকের উচিত সন্তানকে তার কমিসকসের সঙ্গে পরিচয় করানো।

টিফিনের টাকা জমিয়ে কিনতাম

রাহুল আনন্দ, জলের গান (ব্যান্ড)

নারায়ণ দেবনাথের চলে যাওয়ার খবরে শৈশবের ছেঁড়া ছেঁড়া চিত্র মনে ভাসছে। তখন নারায়ণগঞ্জে থাকি। টিফিনের হয় দুই-এক টাকা পেতাম। মনে আছে, সেই টাকা বাঁচিয়ে বন্ধুরা নন্টে ফন্টের কমিকসগুলো কিনতাম। বইগুলো এমন আনন্দ দিত, যার সঙ্গে কিছুর তুলনা হয় না। আমার প্রিয় চরিত্র ছিল হোস্টেল সুপারিন্টেনডেন্ট। তাকে সারাক্ষণ জ¦ালাত নন্টে ফন্টে। তবে কমিকসগুলো আমার কাছে অন্য কারণে বেশি আকর্ষণীয় ছিল। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি ঝোঁক ছিল। বইয়ের অলংকরণগুলো খুব ভালো লাগত। কমিকসের ছবিগুলো আমার কাছে নতুন এক দিগন্ত খুলে যাওয়ার মতো। চরিত্রগুলোর এক্সপ্রেশন খুব ভালো লাগত। কেউ আছাড় খেলে উফফ কিংবা ইশশ বলে যে এক্সপ্রেশন, কেউ মাথার মধ্যে দুষ্টু বুদ্ধি আঁটছে তখনকার যে এক্সপ্রেশনএসব এখনো মনে আছে।

ধন্যবাদ দারুণ ছোটবেলার জন্য

রাফিয়াত রশিদ মিথিলা, অভিনেত্রী

বাটুল, হাঁদা ভোঁদা, নন্টে ফন্টের স্রষ্টাকে শ্রদ্ধা। ধন্যবাদ বাংলা কমিকসের সঙ্গে একটা দারুণ ছোটবেলা উপহার দেওয়ার জন্য।