উইকিপিডিয়া

বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার নিয়ে অসত্য বিভ্রান্তিকর তথ্য

মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়ায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের সম্পর্কে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর প্রচুর তথ্য রয়েছে। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে নেতৃত্বে দুর্বলতা ও স্বজনপ্রীতি ছিল, গণতন্ত্র ছিল দুর্বল এমন অসংখ্য কাল্পনিক তথ্যও রয়েছে এতে।

বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে উইকিপিডিয়ায় থাকা পেজ ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। অবশ্য এসব তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে উইকিপিডিয়ায় রেফারেন্স ব্যবহার করা হয়েছে। আর এসব রেফারেন্স নিয়েও আছে বিতর্ক।

গত এক যুগ ধরে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া সংগঠন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার পরও উইকিপিডিায়ার বিভ্রান্তিকর-কাল্পনিক এ তথ্য মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি।

তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের নিজস্ব গবেষণা সেল সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই) বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু সংশোধন করা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে তথ্য, যোগাযোগ ও প্রযুক্তি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তার ব্যক্তিগত সহকারী মোবাইল ফোন ধরে তিনি মিটিংয়ে আছেন বলে জানান।    

বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক (বিডিওএসএন) সভাপতি ও উইকিপিডিয়া বাংলাদেশ-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মুনির হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উইকিপিডিয়া ওপেন সোর্স এবং এটাকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহারে কোনো বাধা নেই। এখানে যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে ভুল বা বিতর্কিত তথ্য সন্নিবেশ থাকে তাহলে যে কেউ নিবন্ধন করে ওই অংশটুকু মুছে দিতে পারবেন, আটকে দিতে পারবেন। চাইলে এডিট করতে পারবেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘‘উইকিপিডিয়ায় ‘আলোচনা’ নামে ট্যাব আছে সেখানে তথ্যটি সঠিক নয় মর্মে রিপোর্ট করে সত্য তথ্য  লেখার জন্য বলতে পারে। তবে, যে তথ্যটি যুক্ত বা সংশোধন করতে চান তার  রেফারেন্স থাকতে হবে। তবে উপযুক্ত প্রমাণ থাকতে হবে। প্রিন্টেড প্রমাণ হলে উপযুক্ত মনে করা হয়।”

ভুল ও বিতর্কিত তথ্য নজরে এলে ভলান্টিয়ারই মুছে দেন উল্লেখ করে মুনির হাসান বলেন, ‘সাধারণত প্রশাসকরা (উইকিপিডিয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত ভলান্টিয়ার) কোনো  রেফারেন্স ছাড়া লেখা পেলে নিজেরাই মুছে দেন। কিন্তু প্রতিদিন কোটি কোটি লোক লেখে যা সব সময় ওনাদের নজরে আসে না।’

উইকিপিডিয়ার পেজে বঙ্গবন্ধু ও তার শাসনামল সম্পর্কে লেখা হয়েছে, ‘স্বাধীনতার পর অচিরেই মুজিবের সরকারকে ক্রমশ বাড়তে থাকা অসন্তোষ সামাল দিতে হয়। তার রাষ্ট্রীয়করণ ও শ্রমভিত্তিক সমাজতন্ত্রের নীতি প্রশিক্ষিত জনবল, অদক্ষতা, মাত্রাতিরিক্ত দুর্নীতি আর দুর্বল নেতৃত্বের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’ আরও লেখা হয়েছে, ‘মুজিব অতিমাত্রায় জাতীয় নীতিতে মনোনিবেশ করায় স্থানীয় সরকার প্রয়োজনীয় গুরুত্ব লাভে ব্যর্থ হয়। আওয়ামী লীগ ও কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ করায় গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। এ সময় তৃণমূল পর্যায়ে কোনো নির্বাচনই অনুষ্ঠিত হয়নি। বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ঘোষণা করায় ইসলামপন্থিদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়।’ গুরুত্বপূর্ণ পদে আপনজনদের নিয়োগ দেওয়ার জন্য মুজিবের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ আনা হয় উইকিপিডিয়ায়।

‘রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভাব, দ্রব্যমূল্যের অসামঞ্জস্য, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানসমূহের ব্যর্থতার কারণে মুজিবকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়’ বলে উইকিপিডিয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে। ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ বা বাকশাল গঠনের পর বঙ্গবন্ধু নিজেকে আমৃত্যু রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন- এমন তথ্য উইকিপিডিয়ায় দেওয়া আছে। জাতীয় রক্ষীবাহিনীর সহায্যে বাকশাল-বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার এবং সারা দেশের রাজনৈতিক কর্মকা-ের ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপের কথা রয়েছে এতে। 

পাকিস্তান আমলে বিরোধী জোট যুক্তফ্রন্ট ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে শেখ মুজিবুর রহমানের একরোখা কার্যকলাপকে দায়ী করা হয় উইকিপিডিয়ায়। বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে তার অনেক সহকর্মী নিজের প্রাধান্যপ্রীতির অভিযোগ তোলেন বলে উইকিপিডিয়ায় উল্লেখ রয়েছে।

‘পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ভেতরের সংঘাত এবং বৈষম্যগুলোকে শেখ মুজিব ও তার দল অতিরঞ্জিত করেছিল এবং স্বাধীনতা বাংলাদেশকে শিল্প ও মানবসম্পদের ক্ষেত্রে ক্ষতির সম্মুখীন করে’ এমন তথ্যও আছে উইকিপিডিয়ায়।

উইকিপিডিয়ার ‘শেখ মুজিবুর রহমান’ পেজে লেখা রয়েছে, ‘মুজিবের একদলীয় শাসন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের দমন জনগণের একটি বড় অংশের অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যা বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্রের চর্চাকে কক্ষচ্যুত করে।’

বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামাল সম্পর্কে লেখা হয়েছে, ‘১৯৭৩ এর শেষের দিকে শেখ কামাল একটি গুলিবর্ষণের ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন, যাতে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন।’ গুলিবর্ষণ কীভাবে ঘটে সে সম্পর্কে একাধিক দাবির কথা উল্লেখ রয়েছে উইকিপিডিয়াতে। ‘অনেকের দাবি, শেখ কামাল এবং তার বন্ধুরা একটি ব্যাংক ডাকাতির চেষ্টা করার সময় এই গুলিবর্ষণ হয়েছিল। তবে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল দাবি করেছেন যে, এটি আসলে বন্ধুত্বপূর্ণ গুলিবর্ষণের ঘটনা।’

উইকিপিডিয়ায় ‘শেখ কামাল’ পেজে ‘মেজর ডালিমকে অপহরণ’ শিরোনামের লেখায় ঘোরতর মিথ্যা অভিযোগ রয়েছে। লেখা হয়েছে ‘শেখ কামাল নিম্মি ডালিম ও তার স্বামী শরিফুল হক ডালিমকে (যিনি পরে শেখ কামাল ও তার পরিবারকে হত্যা করেছিলেন) ঢাকা লেডিজ ক্লাব থেকে অপহরণ করে এবং জাতীয় রক্ষীবাহিনী সদর দপ্তরে নিয়ে যান।’

বঙ্গবন্ধুকন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে নানা ইতিবাচক তথ্যের পাশাপাশি নেতিবাচক ও বিভ্রান্তিকর তথ্যও রয়েছে এতে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার শাসনামল ‘বহু কেলেঙ্কারি’ ও ‘স্বৈরাচারী চর্চা’ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে উইকিপিডিয়ায় বলা হয়েছে। এছাড়া ‘পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারি’, হলমার্ক-সোনালী ব্যাংক কেলেঙ্কারি, শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারি, রানা প্লাজা ধস ও সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলন হওয়ার প্রসঙ্গও রয়েছে ‘শেখ হাসিনা’ নামের পেজে।

বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ভাই পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট নিহত শেখ আবু নাসের সম্পর্কে লেখা হয়েছে, ‘তিনি তার ভাই শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন ভারতে পাট চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।’

বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনি সম্পর্কে লেখা হয়েছে ‘শেখ মনিকে মুজিব সরকারের আমলে সুবিধাভোগী পদমর্যাদা দেওয়া হয়। যখন ভারতের সঙ্গে বেসরকারি বাণিজ্যকে মুদ্রাস্ফীতি হ্রাসের উদ্দেশ্যে নিষিদ্ধ করা হয়, শেখ মনি তখন শেখ মুজিবের পৃষ্ঠপোষকতায় সক্রিয়ভাবে উক্ত পেশায় জড়িত ছিলেন।’

উইকিপিডিয়া বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাহিদ সুলতান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম। তারা একটি পলিসি তৈরি করে নিয়েছেন। তার আলোকে কাজ করেন। যদি কোনো ধরনের ভুল বা বিতর্কিত তথ্য থাকে, তাহলে রেগুলার কন্ট্রিবিউটাররা তা সংশোধন করেন বা প্রয়োজনে মুছে দেন। তবে, ভুল বা বিতর্কিত তথ্য কতক্ষণ থাকবে তা নির্ভর করে ভলান্টিয়ারের সংখ্যার ওপর। যেমন ইংরেজি কোনো কনটেন্টে ভুল থাকলে তা এক মিনিট বা তারও কম সময়ে কারেকশন হয়ে যায়। কিন্তু বাংলা বা অন্য ভাষার ক্ষেত্রে বেশি সময় লাগে।’