ওমিক্রন প্রতিরোধে স্বাস্থ্যসচেতনতা

বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের মানুষ দুবছর ধরে করোনার সঙ্গে সংগ্রাম করে যাচ্ছে। কিন্তু ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’-এর মতো এখন করোনার ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট আমাদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। সারা বিশ্বে রোগটির দ্রুত সংক্রমণ অবিশ্বাস্য গতিতে বেড়েই চলেছে।

বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী করোনাভাইরাসের এই ভ্যারিয়েন্টটি অন্তত ৩২টি মিউটেশন (জিনগত গঠনের পরিবর্তন) ঘটিয়েছে, যার বৈজ্ঞানিক নাম বি.১.১.৫২৯। ওমিক্রন নিয়ে বিজ্ঞানীদের এত উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ হলো, মিউট্যান্ট ভাইরাসটি মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে এড়িয়ে দ্রুত এবং সহজে ছড়াতে পারে এবং এ কারণে ওমিক্রনের বিরুদ্ধে টিকা কম কার্যকর হবে বলে মনে করা হচ্ছে। করোনাভাইরাস যত সহজে ছড়াবে, ততই তাতে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি হবে, আর এর ফলে কভিড-১৯-এ গুরুতর অসুস্থ হওয়া ও মৃতের সংখ্যাও ততই বাড়তে থাকবে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ওমিক্রনে পুনঃসংক্রমণের ঝুঁকি বেশি রয়েছে। অর্থাৎ যারা আগে কভিডে আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের সাধারণত দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হওয়ার দৃষ্টান্ত এবং আশঙ্কা কম হলেও ওমিক্রনের ক্ষেত্রে আবার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বহু গুণে বেশি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অজস্র মানুষ এরই মধ্যে করোনাভাইরাসের টিকা নিয়েছে। তারা এখন কতটা নিরাপদ তা নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। ফাইজার, অ্যাস্ট্রাজেনেকা, মডার্না, জনসন অ্যান্ড জনসন, সিনোভ্যাক ও স্পুৎনিক এসব ভ্যাকসিন ওমিক্রনের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর তা আজ প্রশ্নের সম্মুখীন। আসলে ওমিক্রনসহ কভিড নিয়ে বিজ্ঞানীরা আরও বেশি আতঙ্কে এজন্য যে, ভবিষ্যতেও ভাইরাসটি নিজেকে প্রকৃতির বুকে টিকিয়ে রাখার জন্য আরও মিউটেশন ঘটাতে পারে। আর সেজন্য আমাদের আরও সতর্কসহ ভ্যাকসিনের কার্যক্ষমতা বহু গুণে বাড়ানোর দরকার পড়বে। ওমিক্রন কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে, সে বিষয়ে এখনো খুব বেশি কিছু জানা যায়নি। বিজ্ঞানীরা বলছেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ফলাফল পেতে আরও সময় লাগবে। সুতরাং ওমিক্রন নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করার সময় এখনো আসেনি। এর মধ্যে প্রতিদিনই বিভিন্ন দেশে ওমিক্রন আক্রান্ত ব্যক্তির খোঁজ মিলছে। মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা আর জনসমাগম নিরুৎসাহিত-সংক্রান্ত নানা নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।

বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, ওমিক্রনের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা কমে গেলেও টিকা যে পুরোপুরি অকার্যকর হবে তা নয়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, নভেল করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ওমিক্রন ফুসফুসের চেয়ে কণ্ঠনালিকে বেশি আক্রান্ত করে। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, এ গবেষণার ফলে ভাইরাসটি অন্য যেকোনো ধরনের চেয়ে কেন বেশি সংক্রামক কিন্তু কম মৃত্যুর কারণ তার ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে। সুতরাং ঘুরেফিরে সেই একই কথা, ওমিক্রনের বিস্তার রোধে টিকা নেওয়া, মাস্ক পরা, দূরত্ব বজায় রাখা এগুলোর কোনো বিকল্প নেই। ঘর থেকে বের হলে প্রত্যেক ব্যক্তিকে সব সময় সঠিকভাবে নাক-মুখ ঢেকে মাস্ক পরাসহ সব ধরনের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করতে হবে। ওমিক্রনে আক্রান্ত হওয়ার পর অপেক্ষাকৃত কম সময় কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হয়। কেননা ছোঁয়াচে হলেও তা থেকে নিয়মকানুন মেনে চললে এবং শরীরের যতœ নিলে দ্রুত আরোগ্য লাভ করা সম্ভব। এজন্য সিডিসি তাদের সাম্প্রতিক নিবিড় রোগ পর্যবেক্ষণের ধারণা থেকে (সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল) আক্রান্ত ব্যক্তি ১০ দিনের পরিবর্তে সাত দিন কোয়ারেন্টাইন শেষে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় শামিল হতে পারবেন বলে জানিয়েছেন। আমাদের সচেতনতা, দায়িত্ববোধ আর শৃঙ্খলাযুক্ত জীবনাচরণই এক দিন করোনার বিরুদ্ধে আমাদের জয়ী হতে সাহায্য করবে।