দেশে করোনার সর্বোচ্চ সংক্রমণ ছিল গত বছরের জুলাইয়ে। সে মাসে মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৩৬ হাজার ২২৬ জন। গড়ে দৈনিক শনাক্ত হয়েছে ১০ হাজার ৮৪৬ জন করে। অথচ এ মাসের গত ৫ দিনেই ছাড়িয়ে গেছে সে মাসের দৈনিক গড় শনাক্ত রোগীর সংখ্যা। গত পাঁচ দিনে (২২-২৬ জানুয়ারি) মোট শনাক্ত হয়েছে ৬৬ হাজার ৯০৮ জন ও দৈনিক গড় শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৩৮২ জন। হিসাব করে দেখা গেছে, বর্তমান গতিতে রোগী শনাক্ত হতে থাকলে দুদিন পর অর্থাৎ আগামী ২৮ জানুয়ারি শেষে এ সপ্তাহে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা হবে প্রায় ১ লাখ ও দৈনিক গড় শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়াবে ১৪ হাজার ২৮৬ জনে।
এমনকি গত ১ জানুয়ারি থেকে যে হারে রোগী বাড়ছে, তাতে আগামী সপ্তাহ শেষে অর্থাৎ ৪ ফেব্রুয়ারিতে চলতি সপ্তাহের তুলনায় রোগী দ্বিগুণ হয়ে ২ লাখে পৌঁছতে পারে। কারণ এ মাসের প্রথম ৭ দিনের তুলনায় শেষ পাঁচ দিনে রোগী বেড়েছে ১৭ গুণ বেশি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ মাসের প্রথম সপ্তাহে (১-৭ জানুয়ারি) মোট শনাক্ত হয়েছে ৫ হাজার ৫৫৪ জন ও দৈনিক গড় শনাক্তের সংখ্যা ছিল ৭৯৪ জন। পরের সপ্তাহে রোগী বেড়েছে তিনগুণ। এ সময় মোট শনাক্ত হয়েছে ১৭ হাজার ৯৪৯ জন ও দৈনিক গড় শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৫৬৪ জন। এরপরের সপ্তাহে (১৫-২১ জানুয়ারি) আড়াইগুণ বেশি রোগী বেড়েছে। এ সময় মোট শনাক্ত হয়েছে ৪৫ হাজার ৭৭৪ জন ও দৈনিক গড় শনাক্ত রোগী ছিল ৬ হাজার ৫৩৯ জন। আর শেষ পাঁচ দিনেই শনাক্তের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে আগের তিন সপ্তাহের রেকর্ড। করোনার নতুন ধরন ওমিক্রনের এমন ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকলে আগামী ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহের দিকে সংক্রমণ ‘সর্বোচ্চ চূড়া’ বা ‘পিক’-এ যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)।
এ ব্যাপারে আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের দেশে সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ বা ৮ জানুয়ারির পর থেকে। সে হিসাবে কমপক্ষে আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সংক্রমণ বাড়বে। তবে সেটাই ‘পিক’ বা সংক্রমণের ‘সর্বোচ্চ চূড়া’ বলা যাবে কি না, সেটা নির্ভর করবে যখন সংক্রমণ কমতে শুরু করবে। তখন ‘পিক’ বোঝা যায়। তবে সংক্রমণের গতি অনুযায়ী ৭-১০ দিনের মধ্যেই চূড়ায় যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু সেটা নির্ভর করে নানা বিষয়ের ওপর। তবে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হলো ৪-৬ সপ্তাহ পর্যন্ত বাড়ে, তারপর কমতে শুরু করে। সেটাও যদি হয় তা হলে ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে আস্তে আস্তে কমতে শুরু করার কথা।
প্রথম চূড়ায় ১ বছর ৪ মাস, এবার ৪০ দিনেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময় গত ২০২০ সালে সর্বনিম্ন সংক্রমন থেকে সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠতে সময় লেগেছিল ৪৮১ দিন বা ১৬ মাস বা ১ বছর ৪ মাস। সে সময় এ যাবৎকালের সর্বনিম্ন শনাক্ত হার ছিল ২০২০ সালের ২৩ মার্চ, শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশ। সেখান থেকে সংক্রমণ বাড়তে বাড়তে সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠেছিল গত বছরের ২৪ জুলাই। শনাক্ত হার দাঁড়িয়েছিল ৩২ দশমিক ৫৫ শতাংশে। এটি এখনো দেশের সর্বোচ্চ শনাক্ত হার। মাঝখানে সময় লেগেছিল ৪৮১ দিন। এরপর সংক্রমণ কমতে কমতে আবার সর্বনিম্ন পর্যায়ে আসে গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর। তখন ১৪৫ দিন বা ৫ মাস পর সর্বনিম্ন সংক্রমন দাঁড়ায় শূন্য দশমিক ৮৭ শতাংশে। সেখান থেকে চলমান ওমিক্রনের বিস্তার ও তৃতীয় ঢেউয়ে এসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শনাক্ত হার হয় গত ২৫ জানুয়ারি। এ সময় ঊর্ধ্বগতি এতটাই বেশি ছিল যে, সর্বনিম্ন সংক্রমণ থেকে সর্বোচ্চ সংক্রমণে পৌঁছতে সময় লাগে অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক কম, মাত্র ৪০ দিন বা ১ মাস ১০ দিন।
৭-১০ দিন সংক্রমণ বাড়তে থাকবে : আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আলমগীর বলেন, আগামী ৭-১০ দিন বা দুই সপ্তাহ সংক্রমণ বাড়তে থাকবে। আগে ডেল্টার সময় দৈনিক ১৬ হাজার রোগী দেখেছি। তারপর কমতে শুরু করেছে। এখন সে তুলনায় রোগী আরও বাড়বে। আর শনাক্ত হারও ৩২-৩৩ শতাংশে সীমাবদ্ধ না থেকে আরও বাড়বে। সারা পৃথিবীতে দেখেছি, যখন বাড়তে শুরু করে, সেটা ৪-৬ সপ্তাহ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। তারপর কমতে শুরু করে।
ঢাকায় ওমিক্রন ৭০-৮- শতাংশ : ডা. এ এস এম আলমগীর বলেন, ঢাকায় অনেক সংক্রমণ। আবার ঢাকায় পরীক্ষাও বেশি। ঢাকার বাইরে এখন মাত্র ছড়ানো শুরু হয়েছে। ঢাকার বাইরে আরও ছড়াবে। তার মানে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি এখন ঢাকার বাইরে দেখা যাবে।
এই বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা জানান, আইসিডিডিআর-বি তাদের হাসপাতালে যে সব করোনা রোগী এসেছিল, তাদের জিনোম সিকোয়েন্স করে ঢাকায় ৬৯ শতাংশ ওমিক্রণ পেয়েছে। ভ্যারিয়েন্ট পিসিআর, ট্রিপল জেন পিসিআরÑ সব ডেটা মিলিয়ে দেখলে ঢাকায় ৭০-৮০ শতাংশের মধ্যে ওমিক্রণ। সারা দেশে এখন ডেল্টার জায়গা ওমিক্রন দখল করে নেবে।
ঠেকানোর একমাত্র পথ স্বাস্থ্যবিধি : এ ব্যাপারে আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ওমিক্রন দ্রুত ওঠে, আবার দ্রুত নেমেও যায়। কত দ্রুত উঠতে থাকবে ও কতদিনে সর্বোচ্চ চূড়ায় যেতে পারে, সেটা নির্ভর করে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা, রোগী শনাক্ত ব্যবস্থাপনার ওপর। তা না হলে সংক্রমিত হতে হতে ভাইরাসটি যখন একটা এলাকার মধ্যে আর মানুষ পাবে না, তখন ছড়াতেই থাকবে। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে যতক্ষণ না আটকাতে পারব, ততদিন এটা ছড়াতেই থাকবে। একটা এলাকায় সব মানুষকে সংক্রমণ করে পরে অন্য এলাকায় যাবে। ওমিক্রনের আগুনের বৈশিষ্ট্য। এ জন্য চলাচল বন্ধ করে ঘরে থাকতে বলা হয় যাতে আগুনটা আর ছড়াতে না পারে। কিন্তু ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনায় আমরা সেটা পারছি না।
এ ব্যাপারে ডা. এ এস এম আলমগীর বলেন, বাস্তবতা হচ্ছে যে কোনো ভ্যারিয়েন্ট নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যবিধি প্রধান কাজ। স্বাস্থ্যবিধি মানলে কোনো ভ্যারিয়েন্ট আক্রমন করতে পারবে না। আর স্বাস্থ্যবিধি না মানলে সব ভ্যারিয়েন্টেই সংক্রমিত হবে মানুষ। টিকা রোগপ্রতিরোধ করছে না, টিকা জটিলতা ও মৃত্যু কমাচ্ছে। তাই টিকাও নিতে হবে ও স্বাস্থ্যবিধিও মানতে হবে। টিকা না নিলেও স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে।
দুই সপ্তাহ শেষে দৈনিক রোগী ৪০-৫০ হাজার : আইইডিসিআর উপদেষ্টা ও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, এখনো সংক্রমণ বাড়তির দিকে। অন্ততপক্ষে আরও দুই সপ্তাহ বাড়বে। যদি প্রতিদিন এক লাখ পরীক্ষা করতে পারি তা হলে ৪০-৫০ হাজার রোগী শনাক্ত হতে পারে। অর্থাৎ কমপক্ষে দুই সপ্তাহ ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকবে।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, এখন করোনার বিপর্যয় চলছে। আগামী দুই সপ্তাহে রোগীর সংখ্যা বাড়বে। মৃত্যুর সংখ্যা বাড়বে কি না, সেটা এই দুই সপ্তাহে স্পষ্ট হয়ে যাবে। কারণ এখনো যারা মৃত্যুবরণ করছেন, তারা ওমিক্রনের শুরুর দিককার সংক্রমিত, যার মধ্যে ডেল্টাও আছে। ধীরে ধীরে ডেল্টার জায়গায় ওমিক্রন চলে আসছে। ঢাকায় সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ। এখানে লোক চলাচল বেশি, মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ বেশি। মোট সংক্রমণের ৬০-৭০ শতাংশ ঢাকাতেই। ঢাকার বাইরে বড় বড় শহরে ইতিমধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে।
দুই দিন ধরে দৈনিক রোগী ১৫ হাজারের বেশি : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় রোগী শনাক্ত হয়েছে ১৫ হাজার ৫২৭ জন। এবং মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের। এর আগের দিন মঙ্গলবার রোগী শনাক্ত হয় ১৬ হাজার ৩৩ জন। সেদিন মৃত্যু হয়েছিল ১৮ জনের। এ নিয়ে নতুন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৩১ হাজার ৫২৪ জনে। পাশাপাশি মৃত্যু হয়েছে ২৮ হাজার ২৭৩ জনের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গত ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হার দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৬৪ শতাংশে। এ পর্যন্ত শনাক্তের হার দাঁড়িয়েছে ১৪ দশমিক ১২ শতাংশ। আর মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গত এক দিনে শনাক্ত রোগীদের মধ্যে ৯ হাজার ৪৫৬ জনই ঢাকা বিভাগের বাসিন্দা, যা মোট আক্রান্তের ৬০ দশমিক ৯০ শতাংশ। আগের দিন এ বিভাগে ১০ হাজার ৪৭৮ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছিল, যা ছিল দিনের মোট শনাক্তের ৬৫ শতাংশের বেশি। তবে গত সপ্তাহখানেক ধরে দেশের অন্যান্য জেলাতেও রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। চট্টগ্রাম বিভাগে এক দিনে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা আগের দিনের ২ হাজার ৩২৫ জন থেকে বেড়ে ২ হাজার ৪৪৪ জন হয়েছে। রাজশাহী বিভাগে এক দিনে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৮৮২ জন থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৮৮ জন। অন্যান্য বিভাগেও রোগী বাড়ছে।
২৪ ঘণ্টায় যে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, তাদের ১৩ জন পুরুষ, চার জন নারী। এদের মধ্যে ১০ জন ছিলেন ঢাকা বিভাগের বাসিন্দা। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগের চারজন, রাজশাহী বিভাগের একজন জন, খুলনা বিভাগের একজন, এবং ময়মনসিংহ বিভাগের বাসিন্দা ছিলেন একজন। তাদের মধ্যে ১১ জনের বয়স ৬০ বছরের বেশি, তিনজনের বয়স ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে, দুইজনের বয়স ৪১ থেকে ৫০ বছর এবং একজনের বয়স ১১ থেকে ২০ বছরের মধ্যে ছিল।