ব্যবসার বাধা দুর্নীতি অদক্ষ প্রশাসন

দুর্নীতি, অদক্ষ প্রশাসন ও অর্থায়নের সীমাবদ্ধতাই বাংলাদেশে ব্যবসায় পরিবেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ বলে এক জরিপে উঠে এসেছে। তবে ব্যবসায় পরিবেশের ক্ষেত্রে একজন বড় ব্যবসায়ী যেভাবে বাধা মোকাবিলা করতে পারেন, সেটা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীর জন্য অনেক কঠিন। তাই ব্যবসায় এ ধরনের ব্যবসায়ীর টিকে থাকা আরও বেশি চ্যালেঞ্জের। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) পরিচালিত ‘বাংলাদেশে ব্যবসায় পরিবেশ ২০২১’ শীর্ষক উদ্যোক্তা মতামত জরিপের ফলাফলে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

অবশ্য বাংলাদেশে ব্যবসায় পরিবেশ নিয়ে উদ্যোক্তাদের মতামতের ভিত্তিতে পরিচালিত এ জরিপে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের চিত্রও উঠে এসেছে। আগে দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল অবকাঠামো বিষয়টিকে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করলেও অব্যাহত বিনিয়োগের ফলে এটি এখন শক্তিশালী অবস্থায় চলে এসেছে বলে ব্যবসায়ীরা স্বীকৃতি দিচ্ছেন। আগে তা শীর্ষ থাকলেও এখন চার নম্বরে নেমে এসেছে। আবার স্বাস্থ্যবান দক্ষ শ্রমিকসহ যেসব চ্যালেঞ্জ আগে নিচের সারিতে ছিল, এখন তা ধীরে ধীরে ওপরে উঠে আসছে। বিভিন্ন সমস্যার কারণে কভিড-পরবর্তী পুনরুদ্ধারও অনেক বেশি সময় লাগবে বলে জরিপে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

গতকাল বুধবার সিপিডি কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে জরিপের ফল তুলে ধরা হয়। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা পরিচালক ও জরিপের পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। স্বাগত বক্তব্যে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত ছোট-বড় ৭৩ জন উদ্যোক্তাদের তথ্য নিয়ে এ মতামত জরিপ পরিচালনা করা হয়। এর মধ্যে ৩৯ জন বড়, ১৭ জন মাঝারি, ১২ জন ছোট এবং ৫ জন ক্ষুদ্র  ব্যবসায়ী তাদের ব্যবসাসংক্রান্ত তথ্য দেন।

মূল প্রবন্ধে গোলাম মোয়াজ্জেম গবেষণার ফল উপস্থাপন করে বলেন, জরিপের অন্যতম বিষয় ছিল বাংলাদেশের যে ব্যবসার পরিবেশ, সেখানে কী ধরনের অবকাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, সুশাসন কিংবা আর্থিক ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বিষয়। অর্থনৈতিক, সামাজিক পরিবেশগত ও সুশাসনগত বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এবার ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম যেহেতু সেটি করছে না, তাই বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনামূলক র‌্যাংকিংয়ের কোনো বিষয় নেই। কিন্তু সামগ্রিকভাবে উদ্যোক্তাদের মতামত প্রতিফলিত হবে জরিপটিতে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম কর্তৃক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা প্রতিবেদন এবার হচ্ছে না।

জরিপ মতামত তুলে ধরে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আমরা কভিড-পরবর্তী সময়কালে ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। জরিপে মূলত ১০টি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেগুলো হলো অবকাঠামো, প্রতিষ্ঠান, নিরাপদ এবং নিরাপত্তা, আর্থিক বিষয়াদি, ব্যবসা বিনিয়োগ, প্রতিযোগিতা, ব্যবসা পরিচালনায় সুশাসন এবং উদ্ভাবন, মানবসম্পদ গড়ে তোলা, কাজের পরিবেশ এবং কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও ঝুঁকি। ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও ফরিদপুরের ১০ কোটি টাকার ওপরে যাদের মূলধন, এমন ৭৩ জন ব্যবসায়ী জরিপে অংশগ্রহণ করেছেন।

তিনি বলেন, ৬৮ শতাংশ ব্যবসায়ী জরিপে বলেছেন দুর্নীতি ব্যবসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু আমি মনে করি দুর্নীতি এককভাবে প্রতিবন্ধকতা নয়। আমি আসলে দেখতে পাচ্ছি, ব্যবসায়ীরা ত্রয়ী চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। এগুলো হচ্ছেÑ দুর্নীতি, অদক্ষ প্রশাসন ও অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, যা ব্যবসায়ীদের মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে ব্যবসার খরচ বাড়ছে। এ ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ব্যবসায়ীকে বাজারে টিকে থাকা ও বাজার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। উপরন্তু আমরা ব্যবসার ক্ষেত্রে আগে যে চ্যালেঞ্জগুলো অনেক নিচের দিকে ছিল, সেগুলো এখন ধীরে ধীরে ওপরে উঠে আসছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে স্বাস্থ্য খাত। ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্বাস্থ্যসম্পন্ন একজন দক্ষ শ্রমিক পাওয়া ও শ্রমিকদের কাছ থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ পাওয়া এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে করহার ও কর খাতের জটিলতা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবার নতুন করে আরেকটি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, সেটি হচ্ছে দক্ষ মানবসম্পদ। আমাদের অর্থনীতি বড় হচ্ছে, আমাদের ব্যবসার গুণগত মানে পরিবর্তন আসছে। বড় বড় বিনিয়োগ আসছে, যেখানে দক্ষ মানবসম্পদ দরকার। সেই জায়গাটি এখন বাংলাদেশের জন্য ধীরে ধীরে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি জানান, ব্যবসার ব্যয় আবার সবার ক্ষেত্রে সমান নয়। বড় ব্যবসায়ীদের ৫২ শতাংশ দুর্নীতির চ্যালেঞ্জটি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে বলছেন, যেখানে শতভাগ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলছেন দুর্নীতি তার জন্য চ্যালেঞ্জ। আর দুর্নীতি প্রধান চ্যালেঞ্জ ৬৮ শতাংশ মাঝারি ও ৮৩ শতাংশ ছোট ব্যবসায়ীর জন্য। সুতরাং ব্যবসায় পরিবেশের ক্ষেত্রে একজন বড় ব্যবসায়ী যেভাবে মোকাবিলা করতে পারেন, সেটা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীর জন্য অনেক কঠিন। তাই ব্যবসায় এ ধরনের ব্যবসায়ীর টিকে থাকা আরও বেশি চ্যালেঞ্জের।

কভিড-পরবর্তী ব্যবসা পুনরুদ্ধারে অন্তত তিন বছর সময় প্রয়োজন হবে বলে জরিপে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। তাই এখন যে পুনরুদ্ধার দেখা যাচ্ছে তা আংশিক পুনরুদ্ধার বলে জানায় সিপিডি। এক বছরের মধ্যে পুনরুদ্ধার সম্ভব, এমনটা বলেছেন মাত্র ৭ শতাংশ ব্যবসায়ী। অন্যদিকে ৪৫ শতাংশ ব্যবসায়ী বলেছেন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে তিন বছরের বেশি সময় তাদের প্রয়োজন।

ব্যবসা পুনরুদ্ধারে সহায়তা করতে আর্থিক প্রণোদনা, কর হ্রাস, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থায়ন সহজলভ্য করার পরামর্শ দিয়েছেন বেশিরভাগ ব্যবসায়ী, যা আগামী বাজেটে সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে পারে। ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন ব্যয় কমানোর বিষয়ে। ব্যবসায় ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যকীয় বিষয়টি শ্রমিক কমানো। ২৮ শতাংশ ব্যবসায়ী বলছেন, বাধ্য হয়ে তাদের ব্যয় কমানোর পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে।

জরিপে ব্যবসায়ীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, আগামী ১০ বছরের জন্য কোন কোন ব্যবসা দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এখানে ৬৭ শতাংশ বলেছেন, ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের কথা, যেটা আগামী দিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা হয়ে উঠবে। ৫৩ শতাংশ জানিয়েছেন দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরি, যেটা বেসরকারি খাতে হতে হবে। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ডেটা ম্যানেজমেন্ট। এছাড়া রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, নতুন অ্যান্টিবায়োটিক, বৈদ্যুতিক যানবাহন, ব্রড স্পেকট্রাম অ্যান্টিভাইরাসসহ বিভিন্ন খাতের কথা বলা হয়েছে, যা আগামী দিনের ব্যবসা হতে পারে।

আগামী দুই বছরের জন্য বৈশ্বিক কী কী ঝুঁকি দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য তৈরি হতে পারে, এমন প্রশ্নে তারা জানিয়েছেন অর্থনৈতিক, পরিবেশগত, ভূরাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অর্থনৈতিক ঝুঁকির ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা যেগুলো বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বড় দেশগুলোর ঋণ বা দায়ের সংকট, যা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। এ ধরনের সমস্যার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বড় দেশগুলোতে যদি সংকট তৈরি হয়, তা আমাদের আমদানি, রপ্তানি ও ঋণ সম্পর্ক সংকুচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।