সংসদে ও বাইরে আলোচনা-সমালোচনা-বিতর্কের মধ্যেই সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠন করার বিধান রেখে পাস হলো ইসি গঠন আইন। স্বাধীনতার ৫০ বছরের মাথায় এ আইনটি পাস হওয়ায় বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য ছাড়া বাকিরা প্রশংসা করেন। তবে তারা এ আইনের কিছু কিছু ধারা নিয়ে সমালোচনাও করেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ বিল-২০২২’ সংসদে পাসের প্রস্তাব করেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। পরে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। এর আগে বিলটি জনমত যাচাই-বাছাই কমিটিতে পাঠানো এবং জাতীয় পার্টি, বিএনপি, জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টির সংসদ সদস্যরা বিলের ওপর সংশোধনী প্রস্তাব দেন। এ সময় জাতীয় পার্টি ও বিএনপির সংসদ সদস্যরা সার্চ কমিটিতে সংসদের প্রতিনিধিত্ব দাবি করেন। তারা বিলটির নানা দিকের সমালোচনা করেন। বিলের ওপর বিভিন্ন শব্দ ও ছোটখাটো কয়েকটি সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে।
বিলটি পাসের সময় জাতীয় পার্টি ও বিএনপির সংসদ সদস্যরা অভিযোগ করেন, খসড়া আইনটি ‘তড়িঘড়ি করে’ আনা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমি বলেছি এটা তড়িঘড়ি করে করার আইন নয়, এটা সত্য। বর্তমান কমিশনের মেয়াদের মধ্যে আইন করা সম্ভব নয় এটাও বলেছি। কারণ আমি বলেছিলাম করোনার সময় যে সীমিত সময়ের জন্য সংসদ বসে, এর মধ্যে এ আইন পাস করা কঠিন হবে। সংসদকে শ্রদ্ধা জানিয়েই এটা বলেছিলাম।’
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘সুজনের একটি প্রতিনিধিদল আমার কাছে গিয়ে আইনের একটি খসড়া দিয়ে পাসের প্রস্তাব করে। আমি আইনটি পাস করার জন্য সময় লাগবে বলে তাদের জানাই। তারা অর্ডিন্যান্স করে এটা করার প্রস্তাবও দেয়। আমি বললাম সংসদকে পাস কাটিয়ে এ আইন করব না। সংসদে নেওয়া ছাড়া এ আইন আমরা করব না।’
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘এবার রাষ্ট্রপতির সংলাপে যারা গেছেন, যারা যাননি তারা নির্বাচন কমিশন নতুন আইনের মাধ্যমে গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। গত ১৭ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপ করে। রাষ্ট্রপতি আইনের বিষয়ে তার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। আমরা তড়িঘড়ি করিনি। এ আইনের কথা অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে। ২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যখন রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপ হয়, তখনই এ আইনের বিষয়ে কথা হয়েছিল। তখনই প্রধানমন্ত্রী এ আইনটি করার জন্য বলেছিলেন। এ আইন করার প্রক্রিয়া শুরুর পর যারা বাইরে কথা বলেন তাদের আন্দোলন সৃষ্টির চেষ্টার যে টুলস বা মসলা সেটা আর থাকেনি। সেজন্যই এখন তারা উঠেপড়ে লেগেছেন।’
আইনে সার্চ কমিটি গঠনের প্রস্তাবনা প্রসঙ্গে আনিসুল হক বলেন, ‘ইসি গঠনে সার্চ কমিটি গঠনের বিষয়ে ২০১২ সালে রাজনৈতিক দলগুলো সম্মত হয়েছিল। তখন থেকেই এই সার্চ কমিটির ধারণা এসেছে। এটা কল্পনা থেকেও আসেনি, আকাশ থেকেও পড়েনি। এটা তো নতুন আবিষ্কার নয়। সার্চ কমিটির মাধ্যমে দুই কমিশন গঠিত হয়েছে। যার কারণে এটা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। ফলে জনমত যাচাই তো ১০ বছর ধরে হয়ে গেছে। বিষয়টি হলো তালগাছটি না পেলে অনেক কমপ্লেইন থাকে।’
তিনি বলেন, ‘দুজন বিশিষ্ট নাগরিক কারা হবে সেটা নিয়ে কথা হচ্ছে। আমরা তো আইনে কোথাও বলিনি যে সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে তাদের নিয়োগ দেওয়া যাবে না। বিশিষ্ট নাগরিকের ক্রাইটেরিয়া তো বলে দেওয়া হয়নি। আমরা শুধু রাষ্ট্রপতিকে এ সুযোগটি দিয়েছি।’
বক্তব্য এক্সপাঞ্জ প্রসঙ্গে বিএনপির সাংসদ হারুনুর রশিদ বক্তব্যের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, উনি আগে অসংসদীয় ভাষায় কথা বলেছিলেন বলেই তা এক্সপাঞ্জ হয়। আমি অসংসদীয় ভাষায় কোনো কথা বলিনি। আমারটা এক্সপাঞ্জ হবে কেন?’
বিএনপির এমপিদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘উনারা তো তালগাছ চান। উনারা কিছুই মানেন না যতক্ষণ তালগাছটা উনাদের না হয়। উনারা আদালতের রায়ও মানেন না। উনাদের কথা হলো, যেটা কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী করেছেন সেটা ভালো। কিন্তু যুদ্ধ করে জাতির পিতা যেটা করে দিয়েছেন সেটা ভালো নয়।’
বিএনপি এমপিদের ঐকমত্যের দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ঐকমত্য করতে হলে উনাদের সত্যকে স্বীকার করতে হবে। আর সত্যটি হচ্ছে বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। উনারা ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করতে দেননি। খুনিদের পুনর্বাসিত করেছেন। এসব সত্য মেনে জনগণের কাছে মাফ চাইলে আমরা ঐকমত্যে আসব।’
সার্চ কমিটির মাধ্যমে গঠিত আগের দুই কমিশনকে হেফাজত প্রশ্নে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘ইনডেমনিটি আর লিগ্যাল কাভারেজ এক কথা নয়। ইনডেমনিটি হচ্ছে অন্যায় করার পরে তাকে প্রটেকশন দেওয়ার জন্য আইন করা। লিগ্যাল কাভারেজ হচ্ছে যেকোনো বৈধ কাজ যেটার লিগ্যাল কাভারেজ ছিল না সেটা তার আওতায় আনা। ইনডেমনিটি কথা শুনলেই হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। ইনডেমনিটি আওয়ামী লীগ দেয় না, এটা বিএনপি দেয়। তারা ইনডেমনিটি দিয়ে আমাদের রক্তক্ষরণ করিয়েছে। ২১ বছর আমাদের অপেক্ষা করিয়েছে জাতির পিতার হত্যার বিচার করতে। ইনডেমনিটির কথা আর আমাদের কাছে শোনাতে আসবেন না। আমরা ওই পথে হাঁটি না। ২০১২ সালে যে কাজটা করা হয়েছে সেটা থেকে শুরু করে সেটার লিগ্যাল কাভারেজ। এ আইনের মধ্যে কেউ অন্যায় করে থাকলে তাকে প্রটেকশন দেওয়া হয়নি। সেই কারণে তাদের যেসব প্রস্তাব গ্রহণ করা যায় না। তাদের এ প্রস্তাব প্রত্যাহার করতে অনুরোধ করব। না হলে সংসদ সদস্যদের অনুরোধ করব এসব প্রস্তাব ভোটে হারিয়ে দেওয়ার জন্য।’
পরে সংশোধনী প্রস্তাবের ওপর আলোচনাকালে আনিসুল হক বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের পর বলা হয়েছিল তিন মেয়াদে এটি থাকবে। আদালতের রায়ে বলা হয়েছিল সংসদ চাইলে দুটি নির্বাচন হতে পারে। সংসদ এটি চায়নি।’ সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণ শেষে আইনমন্ত্রী জানান, তিনি যত সংশোধনী গ্রহণ করেছেন, তার মনে হয় এর আগে কখনো এত বেশি সংশোধনী গ্রহণ করা হয়নি।
এর আগে সংশোধনী প্রস্তাব দিয়ে জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘বিএনপি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। তারা একটি অস্বাভাবিক সরকার আনতে চায়। তাদের এমপিরা এখানে সংশোধনী প্রস্তাব দিলেও বিএনপি নেতারা ইতিমধ্যে নির্বাচন বর্জন করার ঘোষণা দিয়েছেন। নির্বাচনের আগেই ক্ষমতা নিশ্চিত করা তাদের উদ্দেশ্য।’
তিনি বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারে অনেক ফাঁক ছিল, এর মধ্য দিয়ে ইয়াজউদ্দীনকে ক্ষমতায় এনে নির্বাচন করতে চেয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ছুঁতোয় বিএনপি একটি অস্বাভাবিক সরকার গঠন করতে চায়।’
বিএনপির সাংসদ রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আওয়ামী লীগও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার জন্য আন্দোলন করেছিল। তখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি ছিল। এখন সে ঘাটতি আরও অনেক বেড়েছে। জাতীয় থেকে স্থানীয় সব নির্বাচন মাগুরার নির্বাচনের চেয়ে অনেক খারাপ হয়। সুতরাং ’৯৬ সালের চেয়ে এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার আরও বেশি দরকার।’
জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কারণে সবচেয়ে বেশি ভুগতে হয়েছে জাতীয় পার্টিকে। এটি একটি অসাংবিধানিক ফর্মুলা।’
সাবেক সিইসি এটিএম শামসুল হুদার বক্তব্যের সমালোচনা করে জাতীয় পার্টির মুজিবুল হক বলেন, ‘আমলারা এরশাদ, বিএনপি, আওয়ামী লীগ সব সরকারের আমলে আরামে চাকরি করেছেন, পরে চাকরি শেষে আবার পাঁচ বছরের জন্য সিইসি হয়েছেন। তারা ওপরেরটা খান, নিচেরটাও খান।’
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, এর আগে আইনমন্ত্রী বলেছিলেন, আইনটি করার জন্য সময় প্রয়োজন। এ আইনটি নিয়ে অনেক প্রশ্ন উত্থাপন হয়েছে। সেগুলো নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। তিনি নির্বাচন কমিশন গঠনে একটি সাংবিধানিক কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব এবং অনুসন্ধান কমিটি যে নামগুলো দেবে সেগুলো জাতীয় সংসদের কার্য-উপদেষ্টা কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব দেন। এছাড়া অনুসন্ধান কমিটি যে নামগুলো প্রস্তাব করবে সেগুলো অন্তত প্রকাশ করা এবং এরপর জনমত বিবেচনা করে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেবেন, এ ব্যবস্থা করারও দাবি জানান মেনন। তিনি বলেন, বিএনপি আইন নয়, সরকারের উৎখাত চায়। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে লাভ নেই।
বিএনপির হারুনুর রশীদ বলেন, ‘সংবিধানে বলা আছে নির্বাহী বিভাগের দায়িত্ব ইসিকে সহায়তা করা। কিন্তু না করলে কী হবে তা বলা নেই। এসব নিয়ে একটি পুরো আইন হওয়া উচিত।’ এ আইনটিকে সরকারের কূটকৌশল আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘২০১৪ সালে বিনা ভোটের নির্বাচন হয়েছে, ২০১৮ সালে দিনের ভোট রাতে হয়েছে। এ আইনের মাধ্যমে আগামীতে দিনের বেলা নতুন কৌশলে নির্বাচন করবে কি না, তা নিয়ে মানুষের প্রশ্ন আছে।’
বাছাই কমিটি পাঠানোর প্রস্তাবের ওপর বক্তব্যকালে গণফোরামের সংসদ সদস্য মোকাব্বির খান বলেন, ‘দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা নেই। এই ইসির সুবিধাভোগী ছাড়া সবাই বলবে তারা ব্যর্থ। কমিশন সরকারের আকাক্সক্ষার বাইরে কিছু করতে পারে না। আমরা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে গিয়ে যে আইন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছি, এ আইনে তার প্রতিফলন ঘটেনি।’
প্রথমে বিলের নাম ছিল ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ বিল’। সংসদে সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণের মাধ্যমে এখন নাম হবে ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ বিল’।
ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন সার্চ কমিটিতে দুজন বিশিষ্ট নাগরিকের মধ্যে একজন নারী রাখার প্রস্তাব দেন। আইনমন্ত্রী সেই প্রস্তাব গ্রহণে সায় দিলে, সংসদ তা ভোটে গ্রহণ করে। অর্থাৎ ইসি গঠনের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে নাম সুপারিশের জন্য যে সার্চ কমিটি থাকবে সেখানে একজন নারী থাকবেন।
বিলে বলা ছিল, রাষ্ট্রপতি ছয় সদস্যের অনুসন্ধান কমিটি গঠন করবেন, যার সভাপতি হবেন প্রধান বিচারপতি মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারক। সদস্য হিসেবে থাকবেন প্রধান বিচারপতির মনোনীত হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারক, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান এবং রাষ্ট্রপতি মনোনীত দুজন বিশিষ্ট নাগরিক। এখন রাষ্ট্রপতির মনোনীত ওই দুজন বিশিষ্ট নাগরিকের মধ্যে একজন নারী রাখার বিধান যুক্ত হয়েছে।
বিলে সার্চ কমিটির কাজ ১০ কার্যদিবস করার বিধান রাখা হয়েছিল। সেটি এখন ১৫ কার্যদিবস করা হয়েছে। জাতীয় পার্টির ফখরুল ইমামের এ সংক্রান্ত সংশোধনী সংসদ গ্রহণ করে।
গত রবিবার বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী। পরে বিলটি পরীক্ষা করে সাত দিনের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। বুধবার দুটি পরিবর্তনের সুপারিশসহ প্রতিবেদন সংসদে তোলেন সংসদীয় কমিটির সভাপতি শহীদুজ্জামান সরকার।