বরগুনার বেতাগী উপজেলায় দরপত্র বিক্রির প্রক্রিয়া শেষের আগেই প্রায় ৪৮ লাখ টাকার নির্মাণকাজ ভাগবাটোয়ারার অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার দুটি বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর ও আরসিসি রাস্তার নির্মাণকাজ বেশ আগেই শুরু হয়েছে। জানাজানি হওয়ার পর সম্প্রতি নিয়মরক্ষার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বেতাগী উপজেলার প্রকৌশলী মো. রাইসুল ইসলাম মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে পছন্দের ব্যক্তিকে এ কাজ দিয়েছেন।
তবে অভিযোগের বিষয়ে প্রকৌশলী রাইসুল ইসলাম বলেন, ‘বিদ্যালয়ের ভেতরে কে, কী করছে তা আমার দেখার বিষয় নয়। দরপত্র সম্পন্ন হওয়ার পর আমি ঠিকাদারকে কাজ বুঝিয়ে দেব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা নির্মাণকাজ করার জন্য স্কুল কর্র্তৃপক্ষের কাছে জায়গা চাইব। তারা দিতে না পারলে ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়ে চিঠি দেব। তারাই সিদ্ধান্ত নেবেন।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরগুনার বেতাগী উপজেলার বিবিচিনি ইউনিয়নে বেগম লুৎফুন্নেছা মেমোরিয়াল ব্রিট নামে বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর ও বিদ্যালয়ের ভেতরে আরসিসি সড়ক নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বেতাগী উপজেলা প্রকৌশলী মো. রাইসুল ইসলামের স্বাক্ষরে গত ৯ জানুয়ারি ই-টেন্ডার (নং-০২/২০২১-২০২২) নোটিসের মাধ্যমে এ দরপত্র আহ্বান করা হয়। একটি বাংলা দৈনিক ও একটি ইংরেজি দৈনিক পত্রিকায় দরপত্রের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এতে ১ ও ২ নম্বর প্যাকেজে বিবিচিনি ইউনিয়নের বেগম লুৎফুন্নেছা মেমোরিয়াল ব্রিট স্কুলের সীমানা প্রাচীর ও স্কুলের ভেতরে আরসিসি রাস্তা নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৮ লাখ টাকা। দুটি প্যাকেজের শিডিউল বিক্রির শেষ সময় উল্লেখ করা হয় ২৬ জানুয়ারি বিকেল ৫টা। আর দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনে গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কে কাজ পেয়েছেন তা জানা যায়নি।
ই-টেন্ডার পদ্ধতি হওয়ায় সারা দেশ থেকেই অনলাইনে টেন্ডার শিডিউল ক্রয় ও জমা দেওয়ার কথা। সেভাবেই সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। বেশ কয়েকজন ঠিকাদার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে গিয়েই বাধে বিপত্তি। তারা দেখতে পান, বেশ আগে থেকেই সেখানে ঠিকাদার মো. জাকির নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করছেন। কাজ চলমান অবস্থায় দরপত্র আহ্বান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ঠিকাদাররা।
ঠিকাদার রিয়াজ বলেন, ‘দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। দরপত্র অনুযায়ী যিনি কাজ পাবেন, তাকে ওয়ার্ক অর্ডার বুঝিয়ে দেওয়ার পরই নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। দরপত্রে অংশগ্রহণ ছাড়াই কাজ শুরু নজিরবিহীন। আসলে প্রায় অর্ধকোটি টাকার কাজ ভাগবাটোয়ারার জন্য লোক দেখানো দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন, নোটিস পেয়ে টেন্ডার শিডিউল নিয়ে দরপত্রে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। দরপত্রে অংশ নেওয়ার আগেই কাজ শুরু হয়ে গেছে জেনে অবাকই হয়েছি।
গতকাল বুধবার সরেজমিন বেগম লুৎফুন্নেছা মেমোরিয়াল ব্রিট স্কুলে গিয়ে দেখা গেছে, বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীরের নির্মাণকাজ চলছে পুরোদমে। ইতিমধ্যে সীমানা প্রাচীরের জন্য বিদ্যালয়ের চারপাশে কলাম ঢালাই ও মাটি কাটা হচ্ছে। সেখানে সাত-আট শ্রমিক কাজ করছেন। করোনা পরিস্থিতিতে বিধিনিষেধের কারণে বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। কর্মরত শ্রমিকরা জানান, ঠিকাদার জাকির এ নির্মাণকাজ করছেন। ১০-১৫ দিন আগে থেকে তারা শুরু করেছেন।
বেগম লুৎফুন্নেছা মেমোরিয়াল ব্রিট স্কুলের ইনচার্জ মো. মাইনুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারিভাবে এ প্রতিষ্ঠানের সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ চলছে। এরপর রাস্তার কাজ শুরু হবে। ১৫ দিন আগে নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। তবে এ কাজের দরপত্র এখনো সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই।’
যোগাযোগ করা হলে ঠিকাদার মো. জাকির বলেন, ‘কর্র্তৃপক্ষ আমাকে কাজ করতে বলেছে। তাই আমি কাজ করছি। আমি নিজেও দরপত্র কিনেছি। পরবর্তীকালে যিনি এ কাজ পাবেন, তার সঙ্গে সমন্বয় করে নেওয়া হবে।’
বরগুনা পাবলিক পলিসি ফোরামের আহ্বায়ক মো. হাসানুর রহমান ঝন্টু বলেন, ‘কাজ আগে শুরু করে পরে দরপত্র আহ্বান হাস্যকর। অন্য কোনো খাত থেকে কিংবা অন্য কোনো দপ্তর থেকে যদি এ কাজ এখন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, তাহলে সেখানে পুনরায় অন্য একটি দপ্তরের কাজ বাস্তবায়ন করা কতটা যৌক্তিক? আসলে এখানে সরকারি অর্থ লুটপাটের পাঁয়তারা চলছে। বিষয়টি তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর বরগুনার নির্বাহী প্রকৌশলী এস কে আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘যেখানে কাজ হচ্ছে, তা আমার দপ্তরের আওতাধীন নয়। আমি বিষয়টি সম্পর্কে কিছু জানিও না। বেতাগী উপজেলা নির্বাহী প্রকৌশল অধিদপ্তরই ভালো বলতে পারবে।’