শরণার্থী থেকে বিশ্বখ্যাত ফুটবলার নাদিয়া নাদিম

আফগান নারী নাদিয়া নাদিম। তার কৈশোরে তালেবান সরকারের হাতে নিহত হন বাবা। বোনদের নিয়ে তার মা দেশত্যাগ করেন। যাবেন লন্ডনে।  শেষ পর্যন্ত পৌঁছান ডেনমার্কের শরণার্থী শিবিরে। ফুটবল খেলার সুযোগ পান সেখানে। এখন তিনি বিশ্বের সেরা ফুটবলার। সম্প্রতি রিকনস্ট্রাকটিভ প্লাস্টিক সার্জনও হয়েছেন নাদিয়া। তাকে নিয়ে লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া   

ডেনমার্কের ফুটবলার নাদিয়া নাদিম। অংশ নিয়েছেন ৯৮টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে। খেলেছেন ম্যানচেস্টার সিটি ও পিএসজির মতো বড় ক্লাবে। এ সময়ের তুখোড় নারী ফুটবলারদের নিয়ে আলোচনা হলে নির্দ্বিধায় নাদিয়া নাদিমের নাম আসবেই। পিএসজির শীর্ষ লিগে তিনি খেলেছেন দুই সিজনে। গত মৌসুমে প্রথমবারের মতো ফরাসি জায়ান্টদের শিরোপা জয়ে নাদিয়া রাখেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তারকা এই স্ট্রাইকার দুই মৌসুমে পিএসজির হয়ে ২৭ ম্যাচে করেন ১৮ গোল। এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের রেসিং লুইভিল ক্লাবে খেলছেন সর্বকালের সেরা আফগান নারী ফুটবলার নাদিয়া। ৩৪ বছর বয়সী তরুণী নাদিয়া এতদিন কেবল খেলার পাতার শিরোনাম ছিলেন। এবার তাকে অন্য আরেক পেশায় দেখা যাবে। না, খেলাধুলা ছাড়েননি তিনি। ফুটবল খেলার পাশাপাশি গত পাঁচ বছর ধরে ডেনমার্কের এরহাস বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাক্তারি পড়েন নাদিয়া। কিছুদিন আগে ডাক্তারি পাস করেছেন তিনি। পাসের খবরে উচ্ছ্বসিত মেধাবী ও পরিশ্রমী নাদিয়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখেন, ‘শুরু থেকেই আমার পাশে থাকার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ। জীবনে চলার পথে যাদের নতুন সাথী হিসেবে পেয়েছি, তাদেরও ধন্যবাদ। আপনাদের সমর্থন ছাড়া এতদূর আসা আমার একার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এজন্য আপনাদের প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।’ জীবনে প্রতিষ্ঠিত নাদিয়ার  সফলতা অর্জনের পথ মসৃণ ছিল না। ছোটবেলায় কঠিন ও প্রতিকূল অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় আফগান এই নারীকে।

নাদিয়ার শৈশব

আফগানিস্তানের হেরাত শহরে ১৯৮৮ সালের ২ জানুয়ারি জন্ম হয় নাদিয়ার। বাবা রাবানি নাদিম সেনাবাহিনীর জেনারেল ছিলেন। মা-বাবা ও চার বোনকে নিয়ে নিরুদ্বেগেই দিন কাটছিল নাদিয়ার। নব্বই দশকে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায় বসলে দেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। ২০০০ সালে নাদিয়ার বাবাকে এক বৈঠকে ডাকে তালেবান সরকার। এরপর তার বাবা আর ফেরেননি। তাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সে সম্পর্কে তার পরিবারের বিন্দুমাত্র কোনো ধারণা ছিল না। সে সময়ের কথা স্মরণ করে নাদিয়া বলেন, ‘আমার বয়স তখন ১১। বাবা আমার কাছে জেমস বন্ডের মতো সুপারহিরো ছিলেন। তালেবান বাবাকে ডেকে নেওয়ার পর প্রতিদিন আমরা তার ফেরার অপেক্ষা করতাম। অনেক দিন পর্যন্ত আমার মনে হয়েছিল, দেরিতে হলেও বাবা একদিন ঠিকই ফিরবেন।’ নিখোঁজ হওয়ার ছয় মাস পর নাদিয়া জানতে পারেন, তার বাবাকে মেরে ফেলা হয়েছে। নাদিয়া বলেন, ‘মানবজাতির ইতিহাসে অনেক দেশেই স্বৈরশাসন কায়েম হয়েছে। বিরোধী কোনো শক্তিকে সহ্য করতে পারেন না স্বৈরশাসকরা। তালেবান দেশের ক্ষমতা দখলের পর সরকারি কয়েকজন কর্মকর্তাকে হত্যা করে। তাদের মধ্যে আমার বাবাও ছিলেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘তালেবান শাসনে পুরুষ সঙ্গী ছাড়া নারীদের ঘরের বাইরে বের হওয়ার অনুমতি ছিল না। গান-বাজনা শোনা মানা। সব টেলিভিশন স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়। স্কুলে যেতে পারতাম না আমরা। তালেবানের মতাদর্শ অনুযায়ী কাজ করতে বাধ্য ছিল সবাই। বাবার মৃত্যুর পর আমার মা তার পাঁচ মেয়েকে নিয়ে আতঙ্ক ও দুশ্চিন্তায় দিন কাটাতেন। মেয়েদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে একপর্যায়ে তিনি দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন।’ 

দেশত্যাগ

দেশত্যাগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর নাদিয়ার মা হামিদা নাদিম অ্যাপার্টমেন্ট, গাড়ি, গহনাসহ স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি বিক্রি করে দেন। সম্পদ বেচে পাওয়া অর্থের বেশির ভাগ এক পাচারকারীকে দেন তিনি। এ বিষয়ে নাদিয়া বলেন, ‘ইউরোপে যেতে ওই পাচারকারীর সঙ্গে মায়ের যোগাযোগ কীভাবে হয়, তা আমি বা বোনেরা জানতাম না। সবাই খুব ছোট থাকায় স্বাভাবিকভাবেই মা তার পরিকল্পনা আমাদের জানাতেন না। দেশে থাকা হচ্ছে না, খালি এটুকুই আমাদের জানানো হয়েছিল। মা যা করতে বলতেন, চুপচাপ তাই করতাম। কারণ দেশ ছেড়ে পালানো তখন ছিল জীবন-মৃত্যুর বিষয়।’ একদিন রাতের আঁধারে ছোট ভ্যানে করে মেয়েদের নিয়ে দেশ ছাড়েন হামিদা। প্রথমে তারা পাকিস্তানে যান। করাচিতে দুই মাস জাল পাসপোর্টের জন্য অপেক্ষার পর ইতালির উদ্দেশে রওনা দেন নাদিয়া ও তার পরিবার।  

লন্ডন নয়, ডেনমার্ক

ইতালি নাদিয়ার মায়ের মূল গন্তব্য ছিল না। লন্ডনে তাদের কয়েকজন আত্মীয়-স্বজন থাকতেন। তাই ইতালি পৌঁছার পর লন্ডনের উদ্দেশে ট্রাকে রওনা দেন তারা। নাদিয়া বলেন, ‘ট্রাকের ভেতর দিনের পর দিন থাকতে হয়েছে আমাদের। খাবার ও পানি ছিল খুব অল্প। তা সত্ত্বেও আমাদের খারাপ লাগেনি। নিরাপদে আছি, এটাই ছিল আমাদের কাছে স্বস্তির বিষয়।’ দীর্ঘ অপেক্ষার পর একসময় ট্রাকটি থামে। ট্রাকের দরজা খোলা হলে ওই ছয় নারী আশা করেছিলেন, তারা লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী ঘড়ি বিগ বেন দেখবেন। কিন্তু তার জায়গায় নাদিয়ারা দেখেন, চারদিকে কেবল গাছ আর গাছ। এক পথচারীর কাছ থেকে নাদিয়ার মা জানতে চান, জায়গাটা লন্ডন কি না। জবাব আসে, লন্ডন কেন হবে? এটা ডেনমার্ক! ট্রাকটি আসলে নাদিয়াদের ডেনমার্কের গ্রামাঞ্চলে এক শরণার্থী শিবিরে পৌঁছে দেয়। শিবিরে পৌঁছার পর এক নিরাপত্তাকর্মী ক্ষুধার্ত নাদিয়াকে দুধ, টোস্ট ও কলা মাখানো খাবার খেতে দেন। সেদিনের সেই ঘটনা কখনো ভুলতে পারেননি নাদিয়া। তার জীবনে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। নাদিয়া বলেন, ‘সেই প্রথম অপরিচিত কেউ আমাকে খাবার দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। অনেকে মনে করতে পারেন, মাত্র দুই পাউন্ড মূল্যের খাবার দেন ওই কর্মী, এটা আর এমন কী? আসলে ওই ব্যক্তির মধ্যে আমি যে মমত্ববোধ ও পরোপকারের মনোভাব দেখি, তা আমাকে সে সময় অবাক করে। মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ সেই প্রথম অনুভব করি।’ তিনি বলেন, ‘আফগানিস্তান ছাড়ার পর বিরূপ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয় আমাকে। সেই পরিস্থিতির মধ্যে ক্ষুধায় কাতর এক মেয়েকে নিরাপত্তাকর্মীর খাবার খাওয়ানো আমার কাছে জীবনের বড় শিক্ষা ছিল। এরপর থেকে আমি সবার সঙ্গে সৎ থাকার চেষ্টা করতাম, যা এখনো করি। আমাদের যেকোনো কর্মকাণ্ড অন্যদের জীবনে উপকার বা অপকার বয়ে আনতে পারে, এটা আমাদের সবার মনে রাখা দরকার বলে মনে করি। আমার এসব চিন্তার পেছনে ওই নিরাপত্তাকর্মীর নিঃসন্দেহে বড় ভূমিকা রয়েছে।’  বাবার স্মৃতি বিদেশ-বিভুঁইয়েও তাড়িয়ে বেড়াত নাদিয়াকে। ১৫ বছর বয়সেও তার মনে হতো, একদিন না একদিন তার বাবা ফিরবেন, যা আসলে কখনোই হয়নি। 

ফুটবলে হাতেখড়ি

ডেনমার্কের শরণার্থী শিবিরে টানা নয় মাস ছিলেন নাদিয়া ও তার পরিবার। তিনি বলেন, ‘শরণার্থী শিবিরের পরিবেশ নিরাপদ ছিল। বাইরে যেতে পারতাম। যা ইচ্ছে তাই করতে পারতাম। বাধা দেওয়ার কেউ ছিল না। আমার মা অনেক দিন পর নিশ্চিন্ত ছিলেন।’ শরণার্থী শিবিরের আশপাশে মাঝেমধ্যে হেঁটে বেড়াতেন নাদিয়া। একদিন হাঁটতে হাঁটতে তিনি দেখেন, কয়েকজন মেয়ে মাঠে ফুটবল খেলছে। বেড়ার পেছনে দাঁড়িয়ে তাদের খেলা অনেকক্ষণ মনোযোগ দিয়ে দেখেন নাদিয়া। খেলা  দেখা শেষে শিবিরে ফেরেন তিনি। পরদিন আবার সেখানে যান। জীবন পাল্টে দেওয়া ওই ঘটনা সম্পর্কে নাদিয়া বলেন, ‘আমি প্রায় প্রতিদিনই ওই মাঠে যেতাম। প্রথম প্রথম একটু ভয় করত। সেখানে খেলা দেখা ঠিক হচ্ছে কি না, বুঝে উঠতে পারতাম না। বেড়ার ঠিক পেছন দাঁড়িয়ে ওই মেয়েদের ফুটবল খেলা দেখে আমারও খেলতে ইচ্ছে করত। আমার মনে হতো, আরে, এটাই তো জীবনে করতে চেয়েছি!’  

একদিন সাহস করে নাদিয়া কোচকে বলে ফেলেন, তিনিও ফুটবল খেলতে চান। তিনি বলেন, ‘আমি তখন ইংরেজি বলতে পারতাম না। তা সত্ত্বেও আকারে-ইঙ্গিতে আমি কোচকে বুঝাতে পারি, আমি খেলতে ইচ্ছুক। কোচ চমৎকার মানুষ। খেলার প্রতি আগ্রহ দেখে আমাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন তিনি। সব কিছু এত দ্রুত হয় যে বুঝে উঠতে বেগ পেতে হয়। তবে যাই ঘটছিল সবই আমাকে আনন্দ দেয়।’ 

টানা দুই মাস নাদিয়াকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এরপর একদিন ম্যাচে খেলার ডাক পান তিনি। জীবনে প্রথম গায়ে জার্সি ওঠে নাদিয়ার। শরণার্থী শিবিরে নিজেকে দক্ষ খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলেন তিনি। এরই মধ্যে ডেনমার্কে নাদিয়ার পরিবারের আশ্রয় আবেদন মঞ্জুর হয়। নাদিয়ার পেশাগত জীবন শুরু হয় দেশটির বি৫২ আলবর্গ ক্লাবে। এরপর একে একে টিম ভিবর্গ, আইকে স্কভবাক্কেন ও ফরচুনা ইয়ায়েং দলের হয়ে খেলেন নাদিয়া। ২০০৯ সালে অ্যালগার্ভ কাপে ডেনমার্কের জাতীয় দলে প্রথম খেলেন তিনি। দক্ষতা ও নৈপুণ্যের কারণে একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির ফুটবল দল স্কাই ব্লু এফসিতে খেলার ডাক পান নাদিয়া। ওই দলের হয়ে দেশটির ন্যাশনাল উইমেনস সকার লিগে অংশ নেন তিনি। এরপর মার্কিন দল পোর্টল্যান্ড থরনসের হয়ে ৩৭ ম্যাচে ১৯টি গোল করেন দুর্দান্ত এই খেলোয়াড়। নাদিয়ার খেলায় মুগ্ধ হয় ইংলিশ ফুটবল ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটি। ২০১৮ সালে এক বছরের জন্য ওই ক্লাবে খেলেন তিনি। পরে খেলেন ফরাসি ক্লাব পিএসজিতে।   

চিকিৎসক নাদিয়া

নাদিয়া জানতেন, ফুটবলের ক্যারিয়ার বেশিদিনের নয়। একটা সময়ের পর তিনি আর খেলতে পারবেন না। তাই ফুটবলের পাশাপাশি ডেনমার্কের এরহাস বিশ্ববিদ্যালয়ে রিকনস্ট্রাকটিভ প্লাস্টিক সার্জারি নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। পাঁচ বছর পড়াশোনা শেষে সম্প্রতি সার্জন হয়েছেন নাদিয়া। ক্যারিয়ার শেষ হলে অনেক ফুটবলার আফসোস করেন, মাঠের সেই চরম উত্তেজনা-উদ্দীপনা জীবনে আর পাবেন না তারা। নাদিয়াকে অবশ্য এ ধরনের আফসোস করতে হবে না। কারণ সার্জন হিসেবে কাজ করার উত্তেজনা কোনো অংশে জাতীয় পর্যায়ে বা বড় ক্লাবে খেলার চেয়ে কম নয়। নাদিয়া বলেন, ‘গোল করার অনুভূতি এক কথায় বলতে গেলে অসাধারণ। তবে একই অনুভূতি আমি অপারেশন রুমেও পাই। সেখানেও মাঠের মতো একই উত্তেজনা হয়। কিছুদিন আগে একটি ম্যাচে অংশ নিয়েছিলাম। ম্যাচ শেষে অনেক ক্লান্ত হয়ে পড়ি। এর কিছুদিন পর এক রোগীর কিডনি অপারেশনের সময় আমাদের এক চিকিৎসককে সহযোগিতা করি। অপারেশন চলাকালে এক জায়গায় ঠায় দুই ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিলাম। কয়েকদিন আগের ওই ম্যাচে খেলার সময় শরীরে বেশ কয়েক জায়গায় আঘাত পেয়েছিলাম। তারপরও সেই ব্যথা নিয়ে অপারেশন রুমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে চিকিৎসককে সহযোগিতা করতে আমার খুব ভালো লাগে। অপারেশন চলাকালে আমার নাড়ির স্পন্দন দ্রুত ছিল, এড্রিনালিন হরমোনের চলাচল বেড়ে যায়। একটা সময় আসবে যখন অস্ত্রোপচারের পুরো দায়িত্ব আমার ওপর থাকবে। সে সময় নিশ্চিতভাবেই আমার উত্তেজনা আজকের চেয়ে অনেক বেশি থাকবে।’  

সড়ক দুর্ঘটনা বা বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের চেহারা বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ঠিক করার কাজ করতে হয় রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জনদের। এ বিষয়ে নাদিয়া বলেন, ‘কেউ যখন আর কোনো আশা দেখে না, সে সময় তাকে সহযোগিতা করার মূল্য আমি জানি। কারণ এ ধরনের পরিস্থিতির মুখে জীবনে আমাকে পড়তে হয়েছে। অনেকে আমাকে কষ্টের সময়, আশাহীন সময়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। তাদের কারণেই আজ আমি এ পর্যায়ে আসতে পেরেছি। তাদের সেই সহযোগিতা অন্যভাবে ফিরিয়ে দেওয়ার সময় এখন।’ 

নারীদের অনুপ্রেরণা

নারী খেলোয়াড়দের নাদিয়া পরোক্ষভাবে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন, এমন উদাহরণও রয়েছে। গত বিশ্বকাপে নারীদের ফুটবল খেলার মাধ্যমে ক্ষমতায়ন বিষয়ক এক প্যানেলে  অংশ নেন নাদিয়া। তিনি বলেন, “বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে সেদিন নারী ফুটবলাররা অংশ নেন। ফুটবলার হওয়ার পথে তাদের কী কী বাধা পেরোতে হয়, সেসব অভিজ্ঞতা তারা ওই প্যানেলে উপস্থাপন করেন। আজ আমরা যারা নারী ফুটবলার রয়েছি, তাদের সমতা নিয়ে বিশেষ করে বেতনের সমতা নিয়ে লড়াই করতে হচ্ছে। কারণ পুরুষদের চেয়ে অনেক কম বেতন নারী ফুটবলারদের। অথচ বিশ্বের কোনো কোনো দেশে মেয়েদের এখনো ফুটবলে পা দেওয়ার অনুমতিই নেই। ওই প্যানেলে পাকিস্তানের এক ফুটবলার অংশ নেন। দেশটির ছোট এক শহরের মাঠে তিনি খেলা শুরু করেছিলেন। একপর্যায়ে সবাই তাকে নিরুৎসাহিত করে এই বলে যে, ‘রক্ষণশীল সমাজের মেয়ে তুমি। ফুটবলার তুমি হতে পারবে না।’ পাকিস্তানের ওই নারী ফুটবলার প্যানেলে বলেন, ‘সবার কথা শুনে আমি ফুটবল খেলা প্রায় ছেড়েই দিচ্ছিলাম। হঠাৎ একদিন আমি নাদিয়া নাদিমের কথা শুনি। কীভাবে তিনি প্রতিকূল অবস্থা মোকাবিলা করে বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হয়েছেন, তা জানতে পারি। আমার মনে হয়েছে, নাদিয়া নাদিম পারলে একদিন আমিও তার মতো ফুটবলার হতে পারব।’’ নাদিয়া বলেন, “আমি আবেগপ্রবণ মানুষ। তবে সচরাচর অন্যদের সামনে চোখের পানি ফেলি না। কিন্তু সেদিন পাকিস্তানের ওই ফুটবলারের কথা আমার চোখে পানি এনে দেয়। তিনি প্যানেলে আমাকে বলেন, ‘আপনি আমার জীবন বাঁচিয়েছেন। এলাকায় আমি একটি ফুটবল দল গড়েছি। আত্মবিশ্বাস অটুট থাকলে কোনো বাধাই যে শেষ পর্যন্ত বাধা থাকে না, তা আমি আপনার কাছ থেকেই শিখেছি’।” এভাবে নিজের অজান্তেই নারীদের ভেতর আশার আলো জ্বালিয়ে যাচ্ছেন অদম্য নাদিয়া নাদিম।