দেশে করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ওমিক্রনের প্রকোপের মধ্যে গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সংকট কাটাতে সরকার এলএনজি আমদানি করছে। তবে ব্যয়বহুল এলএনজি এনেও সংকট কাটানো যায়নি। বরং এ সুযোগে রাষ্ট্রীয় গ্যাস বিতরণ সংস্থা তিতাস গ্যাসের পরিবর্তে বাতাস দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলী খোকন। বাতাস দিয়ে তিতাস হাজার কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছে। আর গ্যাসের চাপ স্বল্পতার কারণে রপ্তানিমুখী বস্ত্র খাতে মাত্র তিন মাসে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন মোহাম্মদ আলী খোকন।
গতকাল শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে গ্যাস সংকটজনিত সমস্যার ওপর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ মন্তব্য করেন খোকন। গ্যাস ট্যারিফ বৃদ্ধির প্রস্তাব বাস্তবায়নে এর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া ও সম্ভাব্য ঝুঁকির কথাও জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে নতুন করে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির উদ্যোগে উদ্বেগ জানিয়ে বিটিএমএ’র পক্ষ থেকে জানানো হয়, এতে যে উৎপাদন খরচ বাড়বে, তাতে স্থানীয় টেক্সটাইল মিলগুলো প্রতিযোগিতায় টিকে
থাকতে পারবে না। এ কারণে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে এবং যেসব বিনিয়োগ হতে যাচ্ছে, তাও ‘লোকসানি বিনিয়োগ’-এ পরিণত হতে পারে।
বিটিএমএ সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, দেশের রপ্তানিমুখী পোশাক খাতে বছরে স্থানীয় টেক্সটাইল মিলগুলো প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলারের কাঁচামাল সরবরাহ করে। এর মধ্যে গত তিন মাসে গ্যাস সংকটের কারণে ২৫ শতাংশ উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে। সেই হিসেবে, গত তিন মাসে কেবল গ্যাস সংকটের কারণে তাদের উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার বা ১৪ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮৫ টাকা হিসেবে)।
স্থানীয়ভাবে কোয়ালিটি বিদ্যুৎ সরবরাহ না হওয়ায় দেশের টেক্সটাইল মিলগুলো সরকারের কাছ থেকে গ্যাস নিয়ে নিজস্ব জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, যা ক্যাপটিভ পাওয়ার নামে পরিচিত। বিটিএমএ সভাপতি জানান, বর্তমানে ক্যাপটিভ ব্যবস্থায় প্রায় ১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তাদের সদস্যভুক্ত কারখানাগুলো।
মিল মালিকদের অভিযোগ, গত কয়েক মাস ধরেই কোনো কোনো কারখানা অনুমোদিত গ্যাসের চাপের, যা পাউন্ড পার স্কয়ার ইঞ্চি বা পিএসআই নামে পরিচিত, চার ভাগের একভাগও পাচ্ছে না। ১৫ পিএসআই অনুমোদন থাকলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে দিনের বেলায় তা ২-এর নিচে এমনকি শূন্যেও নেমে আসে। এ নিয়ে তিতাসের কাছে প্রতিকার চেয়েও পাওয়া যাচ্ছে না।
মোহাম্মদ আলী খোকন জানান, আমাদের তথ্যমতে, তিতাস কর্তৃপক্ষ শুধুমাত্র পাইপলাইনের মাধ্যমে বাতাস সরবরাহ করে কোটি কোটি টাকা গ্যাসের বিল নিচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের মিলগুলোতে ইভিসি মিটার সংযোগের জন্য বারবার অনুরোধ জানিয়েছি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১ হাজার ২০০ ইভিসি মিটার আমদানি করা হয়েছে। কিন্তু তা খুব অল্প কিছু কারখানায় সংযোগ প্রদান করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, ২০০৯ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত গ্যাস ট্যারিফ বৃদ্ধি হয়েছে ৩৬১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। যে কারণে প্রতি কেজি সুতায় তাদের মিলগুলোর বিদ্যুতের খরচের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৮৭ টাকা। এতে করে বিশাল সংকট দেখা দিয়েছে।
বিটিএমএ জানতে পেরেছে, বিভিন্ন গ্যাস বিতরণ কোম্পানি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে গ্যাস ট্যারিফ ১০৩ থেকে ১১৬ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। এমনিতেই সুতার দাম বাড়লে স্থানীয় সুতা ক্রয়ের ক্ষেত্রে তৈরি পোশাক কারখানাগুলো আপত্তি জানাতে থাকে। এ পরিস্থিতিতে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ বাড়লে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো তাদের তৈরি সুতা বিপণনে ঝুঁকির মুখে পড়বে। এতে সুতা ও কাপড়ের সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হবে। এর ফলে তাদের বিদ্যমান প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধ্বংস হতে পারে। এতে করে বৈধ ও অবৈধ আমদানিও উৎসাহিত হবে।
গ্যাসের সংকট নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শিল্প মালিকরা তিতাস কর্মকর্তাদের অসৌজন্যমূলক আচরণের শিকার হচ্ছেন বলেও খবর পাওয়া গেছে। বিষয়টিকে দুঃখজনক আখ্যা দিয়ে, তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান বিটিএমএ সভাপতি।
বিটিএমএ সভাপতি বলেন, গ্যাসের দাম যখন বাড়ানো হয়, বলা হয়েছিল সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে এলএনজি আমদানি করে শিল্পে সরবরাহ করা হবে। কিন্তু দাম বৃদ্ধির অজুহাতে বর্তমানে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে না। অথচ গত তিন বছরে বিতরণকারী কর্তৃপক্ষ এ খাত থেকে দেড় হাজার কোটি টাকারও বেশি মুনাফা করেছে। এই মুনাফার অর্থ কাদের পকেটে যাচ্ছে, তারও একটি হিসাব তুলে ধরেন বিটিএমএ সভাপতি।
তিনি বলেন, ২০২৩ সাল নাগাদ নতুন করে আড়াই বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আসার কথা। বর্তমান গ্যাস সংকট বিবেচনায় আলোচ্য এ বিনিয়োগ নাও হতে পারে।
শিল্প এবং কর্মসংস্থানের স্বার্থে পরিবহনে জ্বালানি হিসেবে সিএনজির ব্যবহার বন্ধ করার প্রস্তাব করা হয়েছে বস্ত্রকল মালিকদের এ সংগঠনের পক্ষ থেকে। এ ছাড়া সারকারখানায় গ্যাস বন্ধ করা এবং বস্ত্র ও পোশাক খাতের জন্য স্বতন্ত্র একটি জ্বালানি নীতিসহ আরও বেশ কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছে বিটিএমএ।