ঝর্ণার পরিবারকে সমাজচ্যুত: মসজিদ কমিটির ভুল স্বীকার এবং নেপথ্যের ঘটনা

মেয়ের স্বাধীন চলাফেরা ও বিদেশে অন্য সম্প্রদায়ের বন্ধুকে বিয়ে করার অভিযোগ এনে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় একটি পরিবারকে সমাজচ্যুতের অভিযোগ উঠেছিল। স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে সেই পরিবার সমাজচ্যুত থেকে মুক্তি পেয়েছেন।

মঙ্গলবার রাতে কুলাউড়া উপজেলার ভাটেরা ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে সেই পরিবার ও গ্ৰামের মসজিদ কমিটির সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এটিএম ফরহাদ চৌধুরী।

সেখানে উপস্থিত ছিলেন কুলাউড়া থানার ওসি বিনয় ভূষণ দেব, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সমাজচ্যুতির অভিযোগ তোলা ঝর্ণা চৌধুরীর বাবা আব্দুল হাই চৌধুরী এবং কৃষ্ণপুর গ্রামের মসজিদের সভাপতি মাখন মিয়া ও সম্পাদক আমিন মিয়া।

বৈঠক শেষে ইউএনও এটিএম ফরহাদ চৌধুরী বলেন, এইমাত্র মিটিং শেষ করলাম। দুই পক্ষকে নিয়ে বসেছিলাম। সেখানে মসজিদ কমিটির সভাপতি ও সম্পাদক উপস্থিত ছিলেন। তারা জানান, তারা বয়স্ক মানুষ, তাই ইন্টারনেট চালাতে পারেন না। এলাকায় রটে যায় যে ঝর্ণা একটি হিন্দু ছেলেকে বিয়ে করেছে। তাই তার বাবাকে তারা (মসজিদের সভাপতি ও সম্পাদক) ডাকায়, কিন্তু উনি না আসায় তারা বলেন যে উনি উনার মতো চলুক, আমরা আমাদের মতো চলব।

ইউএনও আরও বলেন, তবে আজ তারা ভুল বুঝতে পেরে দুঃখ প্রকাশ করেছেন ঝর্ণার বাবার কাছে। সেই সঙ্গে লিখিত দিয়েছেন যে ফিউচারে আর এমন কিছু করবেন না। ঝর্ণার পরিবারও খুশি হয়েছেন, তারাও লিখিত দিয়েছেন যে তারা এখন খুশি।

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ভাটেরা ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গ্রামের মেয়ে ঝর্ণা চৌধুরী। তিনি উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে অবস্থান করছেন। গত ২৬ ডিসেম্বর তিনি আমেরিকা গমন করেন। এই দিকে বিদেশে যাওয়ার কারণে ঝর্ণার পরিবারকে সমাজচ্যুত করেছে স্থানীয়রা। 

বিষয়টি নিশ্চিত করে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সামান্য ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। এটি সমাধান হয়ে যাবে।

এ দিকে সোমবার (৩১ জানুয়ারি) কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী ঝর্ণা চৌধুরীর পরিবার।

এদিকে উচ্চ শিক্ষায় বিদেশে যাওয়ায় একজন তরুণীর পরিবারকে সমাজচ্যুত করার ঘটনায় গত কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় উঠছে। এই পরিবারের পাশে থেকে যারা এর নেপথ্যে তার শাস্তিও দাবি করছেন সকলে।

কেন ঘটেছিল এমন ঘটনা?

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ভাটেরা ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গ্রামের মেয়ে ঝর্ণা চৌধুরী। তিনি উচ্চ শিক্ষার জন্য আমেরিকায় পাড়ি জমান গত ২৬ ডিসেম্বর।

ঝর্ণা অভিযোগ করেছেন, তাকে বিদেশ পাঠানোয় দেশে তার পরিবারকে সমাজচ্যুত করে স্থানীয় মসজিদ কমিটি। এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর আলোচনা সমালোচনা চলছে সারা দেশে জুড়ে। শুধু বিদেশে গিয়ে লেখাপড়ার কারণে একটি মেয়ের পরিবারকে অবাঞ্ছিত করার ঘটনা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। ঘটনার কারণ জানতে অনুসন্ধান করেছে দেশ রূপান্তর।

প্রথমে সমাজচ্যুতের কারণ জানতে চাইলে মুখ খুলতে চাননি স্থানীয় মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক তবে কথা বলার একপর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন । ঝর্ণা চৌধুরী বিদেশ যাওয়ার পর একটি হিন্দু ছেলের সঙ্গে ফেসবুকে লাইভে আসেন। যা এলাকার সবার মুখে রটে যায় যে হিন্দু ছেলেকে বিয়ে করেছেন। আর এই ঘটনার সূত্রেই সমাজচ্যুত যদিও সরাসরি সমাজচ্যুতের কথা স্বীকার করেননি এই সাধারণ সম্পাদক। তবে তিনি বিষয়টি দ্রুত মীমাংসা হয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে বিস্তারিত সভাপতি বলতে পারবেন বলে জানান।

মসজিদ কমিটির সভাপতি শামছুল ইসলাম মাঘন মিয়া নিজেই জানেন না ঝর্ণার অপরাধ কি। তবে তিনি বলেছেন, কি যেন একটা ভাইরাল হয়েছে শুনেছি। আমি এত বুঝি না। তাই ঝর্ণার বাবাকে ডেকেছিলাম, উনি আসেননি। এরপর আমরা বললাম উনিতো আমাদের (সমাজ) ছেড়ে চলে গেলেন। আর কিছু বলতে পারব না।

কি ছিল সেই ফেসবুক লাইভে যার জন্য একটি পরিবারকে সমাজচ্যুত করা হয়েছে? এ নিয়ে অনুসন্ধান করে দেশ রূপান্তর। দেশ রূপান্তর কথা বলেছে সেই কথিত হিন্দু ছেলে ও হাতে এসেছে এই ঘটনার নেপথ্যের সেই লাইভ ভিডিওটি।

ঝর্ণা চৌধুরী গত বছরের ২৫ তারিখ বাংলাদেশ থেকে আমেরিকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন এবং ২৬ তারিখ তিনি আমেরিকা পৌঁছান সেদিন জয়তূর্য চৌধুরী নামের একজন তার বন্ধুদের নিয়ে ঝর্ণাকে এয়ারপোর্ট থেকে স্বাগত জানান এবং ১১ মিনিটের একটি ফেসবুক লাইভ করেন। সেই লাইভে ঝর্ণার আমেরিকার যাওয়ার খবর দেন এবং যারা নারীবিদ্বেষী এবং ধর্মান্ধ তাদের থেকে ঝর্ণা এখন নিরাপদ।

কি ছিল পেছনের কাহিনি?

ঝর্ণা এবং জয়তূর্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একই গ্রামের জয়তূর্য চৌধুরী ঝর্ণার শিক্ষক। তিনি ক্লাস এইট থেকে এইচএসএসি পর্যন্ত ঝর্ণাকে প্রাইভেট পড়িয়েছেন। তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত এবং পারিবারিকভাবে ভালো সম্পর্ক রয়েছে। পরে তারা জড়িয়ে যান সাংগঠনিক কাজেও।

২০০৮ সালে ‘পজিটিভ জেনারেশন অব সোসাইটি বাংলাদেশ’ নামের একটি সংগঠন গড়ে তোলেন জয়তূর্য চৌধুরী। এই সংগঠনের উদ্দেশ্য মানব সেবার কাজ করা। নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং দরিদ্রদের শিক্ষা কার্যক্রম এবং বিভিন্ন ধরনের মানসিক সহায়তায় কাজ করা। বর্তমানে কিশোরগঞ্জ ঠাকুরগাঁও ও রংপুরে এই সংগঠনের ৩টি স্কুল রয়েছে। পরে এই সংগঠনে যোগ দেন ঝর্ণা চৌধুরী।

এই সংগঠনটি রোষানলে পড়ে নারীদের পিরিয়ড সময়ের প্যাড বিতরণ নিয়ে। এই সংগঠনের সহযোগী সংগঠন ‘জয়ী’ যার মূল কাজ প্রত্যন্ত অঞ্চলে নারীদের মধ্যে পিরিয়ড নিয়ে সচেতনতা ও স্বাস্থ্যের সুরক্ষা। এ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে নারী বিদ্বেষী এবং ধর্মান্ধতার রোষানলে পড়েন তারা। কেন তারা এই সব নিয়ে কাজ করবেন এই নিয়ে অনেকবার হুমকিও পান।

২০১৩ সালে আমেরিকা চলে যান জয়তূর্য চৌধুরী। তার ৮ বছর পর ২০২১ সালের ২৬ ডিসেম্বর আইন নিয়ে পড়তে আমেরিকা যান ঝর্ণা চৌধুরী। নানা ধরনের হুমকি থাকায় ঝর্ণার যাওয়ার বিষয়টি গোপন রাখা হয়।

জয়তূর্য চৌধুরী ফোনে দেশ রূপান্তরকে জানান, আমি বিদেশ আসলেও সংগঠনের কাজ থেমে থাকেনি বরং আর্থিক সাপোর্ট বাড়ায় আরও গতি এসেছিল এবং সংগঠনের সমন্বয়ক হিসেবে সব কাজ ঝর্ণা সামলিয়েছে। কাজ নিয়ে প্রতিদিন আমাদের অনেক সময় ফোনে কথা হতো। দীর্ঘদিন পর যখন সে বিদেশ আসল স্বাভাবিকভাবে আমি তারে রিসিভ করতে এয়ারপোর্টে যাব। সে আমার ছাত্রী ছিল, পরে আমার সংগঠনের সহকর্মী। আমাদের ভালো একটা সম্পর্ক রয়েছে। আমি গেলাম। এবং কাজ করতে গিয়ে দেশে সে প্রচুর হুমকি পাওয়ায় তার বিদেশ আসার খবরটি আমরা লুকিয়ে রাখি। যখন সে আসল এই খবর দিতেই ফেসবুকে লাইভে যাই। এবং বলি ‘ঝর্ণা বিদেশ চলে এসেছে তার এই চলে আসায় কিছু মানুষের (নারী বিদ্বেষী, উগ্রবাদী) জ্বলবে। তারা চাইলেও এখন ঝর্ণাকে কিছু করতে পারবে না।

এই লাইভটি ভাইরাল হয় এলাকায়। বুঝে না বুঝে সবাই লিখতে থাকে ঝর্ণা বিদেশ গিয়ে হিন্দু ছেলেকে বিয়ে করে নাম পরিবর্তন করে ‘জয়িতা’ নাম নিয়েছে।

এ বিষয়ে ঝর্ণা বলেন, স্যারের সঙ্গে আমার ছবি ওঠাকে কেন্দ্র করে এলাকায় কেউ নাস্তিক কেউ হিন্দু হয়েছি বলে প্রচার করতে থাকে। আমার পরিবার থেকে আমাকে ফোন দেওয়া হয় আমি বলি এমন কিছুই না। আমার পরিবার ফেসবুক লাইভ দেখে বুঝতে পারে এসব মিথ্যা। এবং দেশে থাকতেও এরা আমাকে বিরক্ত করত সমালোচনা করত, হুমকি দিত কেন আমি নারীর পিরিয়ড নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলি। কাজ করি।

তিনি আরও বলেন, ‘গত ২৬ ডিসেম্বর আমি উচ্চ শিক্ষার জন্য আমেরিকায় আসি। ২৭ ডিসেম্বর থেকে স্থানীয় একটি মৌলবাদী গোষ্ঠী ফেসবুকে আমাকে নিয়ে কুৎসা রটাতে থাকে। বিদেশ গিয়ে ছোট কাপড় পরছি, নাস্তিক হয়ে গেছি- এই সেই নানা কিছু গল্প তারা তাদের মতো বানাতে থাকে।

‘পরদিন শুক্রবার স্থানীয় ভাটেরা বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ পঞ্চায়েত কমিটি আমার বাবা আব্দুল হাইকে সালিস বৈঠক ডাকেন। গুরুতর অসুস্থ থাকায় বাবা যেতে পারেননি। তাই ক্ষিপ্ত হয়ে মসজিদ পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি মাখন মিয়া ও সম্পাদক আমিন মিয়ার নির্দেশে আমার পরিবারকে এক ঘরে করে দেয়া হয়।’

ঝর্ণা আরও বলেন, ‘অতি উৎসাহী কিছু মানুষ স্থানীয় মসজিদে আমাকে নিয়ে বিচার ডাকেন। আমার বাবাকে সেই বিচারে উপস্থিত হতে বলেন, কিন্তু ৭০ বছর বয়সী আমার বাবা ইতিমধ্যে তিনবার স্ট্রোক করেছেন। চিকিৎসক বিশ্রামে থাকতে পরামর্শ দিয়েছেন।’

ঝর্ণার সঙ্গে ছবিতে থাকা এবং যিনি ফেসবুক লাইভ দিয়েছিলেন সেই যুবক জয়তূর্য চৌধুরীও জানান, তাদের নামে মিথ্যা রটিয়ে ঝর্ণার পরিবারকে যেভাবে সমাজচ্যুত করা হয়েছে তেমনি তার পরিবারও আছে নিরাপত্তাহীনতায়। তিনি দেশে থাকা তার পরিবারের নিরাপত্তা দাবি করেছেন।

তিনি জানান, এলাকার মিটিংয়ে আমাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। দেশে থাকতেও তারা করেছিল তার রেকর্ড আমার কাছে আছে। সেই দিনের মিটিং উপস্থিত থেকে ইউনিয়ন জাতীয় পার্টির সভাপতি ও মসজিদ কমিটির উপদেষ্টা আমাকে সরাসরি হত্যার হুমকি দিয়েছেন। তবে এই বিষয়ে যোগাযোগ করলে মসজিদ কমিটির উপদেষ্টা মাখন মিয়া জানান, আমি সেই দিন মিটিং এ ছিলাম না। এরপরে কি হয়েছে তাও জানি না।

ঝর্ণার বাবা আব্দুল হাই চৌধুরী বলেন, মসজিদ পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি শামসুল ইসলাম মাখন ও সম্পাদক আমীন আলী আমাকে গত শুক্রবার (২৮ জানুয়ারি) কমিটির সালিস বৈঠকে গিয়ে আমার মেয়ের এ রকম চলাফেরার জবাব দিতে বলেন। আমি অসুস্থ থাকায় বৈঠকে যেতে পারিনি। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তারা আমাদের সমাজচ্যুত করে একঘরে করার সিদ্ধান্ত নেন। এমন সিদ্ধান্ত ও মিথ্যা অপপ্রচারের ছড়ানোয় আমরা পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

এই ঘটনা জানার পর ঝর্ণা মসজিদ কমিটির সভাপতিকে কল করেন  জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি তাকে জিজ্ঞেস করি আমার বাবার বিরুদ্ধে অভিযোগ কী? জবাবে তিনি জানান, আমি আমেরিকায় এসে আমার এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বী একজনকে বিয়ে করেছি, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। তা ছাড়া আমার বাবা কেন তাদের নির্দেশ মানেননি, তাই আমার পরিবারকে এক ঘরে করে দেয়া হয়েছে।’

এ দিকে এই ঘটনায় ৩১ জানুয়ারি ঝর্ণার বাবা কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন । এরপর এই নিয়ে সংবাদের পর তোলপাড় শুরু হয়। বিষয়টি মীমাংসা এবং পরিবারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা করে স্থানীয় প্রশাসন। এবং গতরাতে বিষয়টি মীমাংসা করা হয়। এতে মসজিদ কমিটি লিখিত মুচলেকা দেয়।