অ্যাম্বুলেন্সে মৃত্যু অ্যাম্বুলেন্সের সিন্ডিকেট

অ্যাম্বুলেন্সের মতো একটি জরুরি পরিষেবায় দেশে যে নৈরাজ্য চলছে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এই নৈরাজ্যের কারণেই সড়ক-মহাসড়কগুলোতে মুমূর্ষু রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স কাক্সিক্ষত গুরুত্ব হারিয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে যাত্রীবাহী গণপরিবহন কিংবা ব্যক্তিমালিকাধীন যানবাহনের চালক কেউই এখন অ্যাম্বুলেন্সকে পথ ছেড়ে দেয় না। অথচ সারা দুনিয়াতেই জরুরি রোগী পরিবহনকারী অ্যাম্বুলেন্স চলাচল সবসময়ই অগ্রাধিকার পেয়ে থাকে। কিন্তু দেশের বাস্তবতা মর্মান্তিক। ঢাকার সাভারে মঙ্গলবার এই পরিস্থিতির এক ন্যক্কারজনক দৃষ্টান্ত দেখা গেল। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আগে যাওয়া নিয়ে বাগ্বিতণ্ডার জের ধরে এক অ্যাম্বুলেন্সের চালককে মারধর করেন এক মাইক্রোবাসের চালক। একপর্যায়ে অ্যাম্বুলেন্সের চাবিটিও ছিনিয়ে নেন তিনি। এই ঘটনায় অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে আটকে থেকে ছটফট করতে করতে মারা গেছে ৯ বছর বয়সী এক শিশু। তার নাম আফসানা আক্তার। ক্যানসারে আক্রান্ত আফসানা চার মাস ধরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। সেখান থেকে ঢাকার মহাখালী ক্যানসার হাসপাতালে চিকিৎসক দেখিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে গাইবান্ধার বাড়িতে ফিরছিল আফসানার পরিবার।

অ্যাম্বুলেন্স চালক মারুফ হোসেন জানান, সাইড না দেওয়ার জেরে মাইক্রোবাস চালক নজরুল গাড়ি আটকে আমাদের মারধর শুরু করে। গাড়িতে মুমূর্ষু রোগী থাকার কথা বলে অনুরোধ করা হলেও মাইক্রোবাস চালক উল্টো ফোন করে আরও লোকজন নিয়ে এসে মারধর করে অ্যাম্বুলেন্সের চাবি ছিনিয়ে নেন। পরে ৯৯৯-এ ফোন দিলে পুলিশ এসে চাবি সংগ্রহ করে রোগীকে স্থানীয় নারী ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যায়। কিন্তু তার আগেই মেয়েটি মারা যায়। পুলিশ মাইক্রোবাসটি জব্দ করলেও মাইক্রোবাসের চালকসহ মারধরকারী অন্যরা পালিয়ে যায়। ওই মাইক্রোবাস চালকের নাম নজরুল ইসলাম বলে জানা গেছে। তিনি বাইপাইলের আবদুল মজিদ নামে এক ব্যক্তির মালিকানাধীন রেন্ট-এ-কার প্রতিষ্ঠানের মাইক্রোবাসটি চালান। অপরাধীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। দুঃখজনক বিষয় হলো, এগিয়ে যাওয়ার পথ না পেয়ে অ্যাম্বুলেন্সে মুমূর্ষু রোগীর মৃত্যুর এমন খবর প্রায়ই সংবাদ মাধ্যমে দেখা যায়। স্মরণ করা যেতে পারে সম্প্রতি ভিআইপি প্রটোকলের জন্য ফেরিঘাটে ফেরি আটকে রাখায় মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ি ফেরিঘাটে স্কুলছাত্র তিতাস ঘোষের মৃত্যুর কথা। এ নিয়ে দেশব্যাপী তোলপাড় হলেও অ্যাম্বুলেন্সের মতো একটি জরুরি পরিষেবার অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে কারোর কোনো মাথাব্যথা আছে বলে দেখা যাচ্ছে না।

এই পরিস্থিতির উল্টোদিকে রয়েছে আরও ভয়াবহ চিত্র। দেশের বেশিরভাগ অ্যাম্বুলেন্স যে প্রকৃত অর্থে অ্যাম্বুলেন্সই নয় তা নিয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) কিংবা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যেন চোখে ঠুলি এঁটে রয়েছে। খেয়াল করা দরকার সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী, ব্যক্তিমালিকানায় অ্যাম্বুলেন্সের নিবন্ধন নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। শুধু চিকিৎসা সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানের নামে অ্যাম্বুলেন্সের নিবন্ধন দেয় বিআরটিএ। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ঢাকা মহানগর অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বীকার করেছেন যে, অধিকাংশ অ্যাম্বুলেন্সের মালিকই বেসরকারি নানা হাসপাতালের নামে নিবন্ধন নিয়ে নিজেরা ব্যবসা করেন। সংশ্লিষ্টরাও স্বীকার করছেন যে, দেশে বেশির ভাগ অ্যাম্বুলেন্সই আসলে মাইক্রোবাসকে কেটেছেঁটে রূপান্তর করা। মাইক্রোবাসের সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সের পার্থক্য শুধু এটুকুই যে অ্যাম্বুলেন্স নামের মাইক্রোবাসে অক্সিজেন আর রোগী বহনের বিছানা থাকে। তবে অনেক ক্ষেত্রে সেটাও থাকে না। অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির নেতারাও এটি স্বীকার করেন।

অ্যাম্বুলেন্স নামধারী এসব মাইক্রোবাসের মালিক-চালক-হাসপাতাল কর্মচারীরা দেশজুড়ে দালাল-সিন্ডিকেট তৈরি করে রোগীদের জিম্মি করে রেখেছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ার ২০ শতাংশ কমিশন দিতে হয় হাসপাতালের কর্মচারী অথবা ওয়ার্ডবয়দের। আর তারাই বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে ‘রোগী ভাগিয়ে’ নিয়ে যায় নিজেদের পছন্দসই হাসপাতালগুলোতে। সরকারি-   বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে কেন্দ্র করে অ্যাম্বুলেন্সের মতো একটি জরুরি পরিষেবা ঘিরে এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি চলছে বছরের পর বছর ধরে। অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, শুধু ঢাকা মহানগরে অ্যাম্বুলেন্স মালিকের সংখ্যা ৬৩৪। তাদের মালিকানায় রয়েছে দেড় হাজারের বেশি অ্যাম্বুলেন্স। প্রশ্ন হলো, যে অ্যাম্বুলেন্সের জরুরি রোগী পরিবহনে নিয়োজিত থাকার কথা, পথেঘাটে যে অ্যাম্বুলেন্সের সবসময় অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা সেই যানটিকে এমন অকার্যকর করে রাখার দায় কে নেবে? জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট অ্যাম্বুলেন্সের এসব সিন্ডিকেট ভাঙার বিষয়ে সরকার আন্তরিক ও কঠোর পদক্ষেপ নেবে সেটাই কাম্য।