গত পহেলা ফেব্রুয়ারি ছিল মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি। ২০২১ সালের এই দিনে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী নবনির্বাচিত সরকারকে অকস্মাৎ ক্ষমতাচ্যুত করে রক্তপাতহীন এক সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। এরপর গত এক বছরে মিয়ানমারের রাজনীতিতে ও মিয়ানমারের সমাজব্যবস্থায় এক বিপুল পরিবর্তন ঘটেছে। এর আগের সামরিক অভ্যুত্থানের সঙ্গে এ সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে জনগণের প্রতিক্রিয়ার মাত্রা, ধরন এবং প্রকারে। ১৯৬২ সাল থেকে মিয়ানমার, অর্থাৎ তৎকালীন বার্মা, ২০১১ সাল পর্যন্ত কোনো না কোনোভাবে সামরিক শাসনের অধীনে ছিল। কিন্তু তখনকার সামরিক জান্তার প্রতি মানুষের মনোভাব, আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রতিক্রিয়া আর ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের প্রতি মিয়ানমারের রাজনীতিবিদ এবং সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া এক নয়। ফলে, সামরিক জান্তার অধীনের বিগত এক বছরের মিয়ানমারের হালচাল ও চালচিত্র বিশ্লেষণ করলে মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ কোনদিকে যাচ্ছে তার একটা ইশারা পাওয়া যাবে।
১৯৪৮ সালে তৎকালীন বার্মা একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর বার্মা বহুজাতির, বহুভাষার এবং বহু সংস্কৃতির একটি দেশ হওয়া সত্ত্বেও একটি সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের ধারণাকে সামনে নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু ১৯৬২ সালে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন গণতান্ত্রিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে তখনকার শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করে বার্মা সামরিক জান্তার অধীনে গণতন্ত্রহীন সামরিক শাসনের পথে যাত্রা শুরু করে। সেটা অব্যাহতভাবে চলে ২০১১ সাল পর্যন্ত। মিয়ানমারের গণতন্ত্রের আইকন হিসেবে পরিচিত অং সান সু চিকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রায়নের পথে ফেরার জন্য সাধারণ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়। তার আগে ২০০৮ সালে মিয়ানমারের সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্র পরিচালনায় সামরিক বাহিনীর কর্তৃত্বকে সুসংহত করা হয়। ২৫ শতাংশ আসন, তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়, ভাইস-প্রেসিডেন্ট এবং কমান্ডার-ইন-চিফ সামরিক বাহিনীর জন্য রিজার্ভ রেখে সংবিধান সংশোধন করা হলেও অং সান সু চি সেটাকে মেনে নিয়েই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন এবং তার নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি বিপুল ভোটে জয়লাভ করে মিয়ানমারের তথাকথিত ‘গণতান্ত্রিক সরকার’ গঠন করে।
২০১৫ সালের নির্বাচনেও সু চির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি বিপুল ভোটে জয়লাভ করে মিয়ানমারের গণতন্ত্রের ধারা অব্যাহত রাখে। সামরিক বাহিনী রাষ্ট্র পরিচালনায় বিপুলভাবে প্রভাব বিস্তার করলেও মিয়ানমার একটু একটু করে গণতন্ত্রের পথে হাঁটা শুরু করেছিল। বহির্বিশ্বে সু চির ভাবমূর্তিকে কাজে লাগিয়ে মিয়ানমারে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকা- ও কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বাড়তে শুরু করে। বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ মিয়ানমার তথাকথিত গণতন্ত্রের জনপ্রিয় উপস্থাপনায় বিশ্বব্যাপী একটা আকর্ষণ তৈরি করে। কিন্তু ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত জেনোসাইডের কারণে মিয়ানমারের ভাবমূর্তি বিশ্বব্যাপী নতুন করে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। গোটা পৃথিবীতে সু চির বিরুদ্ধে একটা তীব্র সমালোচনা শুরু হয় এবং জেনোসাইড সংঘটনের জন্য আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিচার শুরু হয়। সে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলকে নেতৃত্ব দিয়ে সামরিক বাহিনী কর্তৃক সংঘটিত জেনোসাইডের সমর্থনে সু চি’র অবস্থান বিশ্বব্যাপী তীব্রভাবে নিন্দিত হয়। পাশাপাশি একটি সম্ভাবনাময় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়ে উঠবার ক্ষেত্রে মিয়ানমারের সম্ভাবনাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখোমুখি করে।
এরকম একটি অবস্থায় ২০২০ সালের ডিসেম্বরের ৮ তারিখ মিয়ানমারে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে নির্বাচনে সু চি’র নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি ৮৩ শতাংশ ভোট পেয়ে জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়ে নতুন করে সরকার গঠনের জন্য নির্বাচিত হয়। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারির ১ তারিখ নবনির্বাচিত সাংসদদের নিয়ে নতুন সরকার গঠনের কয়েক ঘণ্টা আগে একটি রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চিসহ নবনির্বাচিত প্রায় ৩৯৪ জন সাংসদকে এবং দেশের রাষ্ট্রপতিকে গ্রেপ্তার করে মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। কিন্তু সামরিক সরকার ক্ষমতা দখল করলেও বিগত এক বছরের ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে যে, সামরিক জান্তা খুব একটা শান্তিতে নেই। জনগণের তীব্র প্রতিক্রিয়া, বিভিন্ন ধরনের প্রতিরোধের ঘটনা এবং সশস্ত্র প্রতিরোধের ঘটনাই প্রমাণ করে সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখল করলেও ক্ষমতা ধরে রাখা তাদের জন্য প্রতিনিয়ত নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
মিয়ানমারভিত্তিক একটি মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, গত এক বছরে সামরিক বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ বিক্ষোভকারী। এসব হত্যাকা- জান্তাবিরোধী আন্দোলনের তীব্রতাকে আরও বেগবান করেছে। মিয়ানমারের শহরে শহরে তরুণরা জড়িয়ে পড়ছে জান্তাবিরোধী বিক্ষোভে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, মিয়ানমারের বিভিন্ন প্রদেশে যেসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণ মিয়ানমার রাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে নানান ধরনের দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত ছিল, তারা এখন জান্তাবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়েছে। নানান রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজন সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেছে নিয়েছিল। এরকম বেশ কিছু মিলিশিয়া গ্রুপ জান্তাবিরোধী বিক্ষোভে যোগ দিয়েছে। ফলে, সামরিক বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে পাল্টা হত্যার ঘটনাও ঘটছে। এক হিসাব অনুযায়ী, গত এক বছরে প্রায় ১৬৮ জন সামরিক বাহিনী ও পুলিশের সদস্য বিক্ষোভকারীদের আক্রমণে নিহত হয়েছে। এতে সহজেই অনুমেয় যে, জান্তাবিরোধী প্রতিবাদ-প্রতিরোধ সহিংস সংঘাতে রূপ নিয়েছে।
সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলে বছরপূর্তিতে জাতিসংঘ পরিষ্কার বলেছে যে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ-প্রতিরোধ কর্মসূচিতে সহিংস পন্থায় মোকাবিলা করার সরকারি পলিসির কারণে এ হতাহতের ঘটনা ঘটছে। এখানে গত এক বছরে আরও একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হচ্ছে, ২০২০ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচিত সাংসদদের সমন্বয়ে একটি ছায়া সরকার গঠিত হয়েছে যার নাম রাখা হয়েছে ইউনিয়ন ন্যাশনাল গভর্নমেন্ট। এরাও তৈরি করেছে একটি সশস্ত্র গ্রুপ ‘পিপলস ডিফেন্স ফোর্স’ যারা সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হচ্ছে। ফলে, এ ইউনিয়ন ন্যাশনাল গভর্নমেন্ট ইতিমধ্যে ব্যাপক জনসমর্থন অর্জন করেছে। বিশেষ করে, মিয়ানমারের বিভিন্ন রাজ্যের সংঘাতরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতিগত পরিচয় দেওয়ার প্রতিশ্রুতি এবং একটি অন্তর্ভুক্তিবাদী সরকারের দর্শন সামনে নিয়ে আসার কারণে বহু ভাষার, বহু জাতির এবং বহু সংস্কৃতির মিয়ানমার ইউনিয়ন ন্যাশনাল গভর্নমেন্টের সঙ্গে প্রায় সবাই একাত্ম হয়ে জান্তাবিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলনে শামিল হয়েছে।
এছাড়াও মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বেশ কিছু শীর্ষ কর্মকর্তার ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর নানান ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণেও বিশ^ব্যাপী জান্তাবিরোধী একটা জনমত তৈরি হয়েছে। ফলে, ১৯৬২ সালের সামরিক সরকার আর ২০২১ সালের সামরিক সরকারের প্রতি মিয়ানমারের জনগণের দৃষ্টি এবং প্রতিক্রিয়া পুরোপুরি ভিন্ন। আজকের প্রজন্ম অনেক বেশি দেশপ্রেমিক এবং গণতন্ত্রের জন্য লড়াইয়ে প্রস্তুত। ফলে, মিয়ানমারের তরুণ প্রজন্ম দলে দলে জান্তাবিরোধী প্রতিবাদ-প্রতিরোধ সংগ্রামে যোগ দিচ্ছে এবং শহরে শহরে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে সহজেই অনুমেয় যে, মিয়ানমার একটি গৃহযুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের প্রধান বলেছেন, ‘মিয়ানমারের এখনকার পরিস্থিতি গৃহযুদ্ধের রূপ নিচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মিয়ানমারের ক্রমবর্ধমান সংঘাতময় পরিস্থিতি আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য ক্রমান্বয়ে হুমকি হয়ে উঠছে।’ এরকম পরিস্থিতি সহজেই অনুমান করা যায় যে, মিয়ানমার নিশ্চিতভাবে গৃহযুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে। কেননা, একদিকে সামরিক বাহিনী সহজে ক্ষমতা ছাড়বে না, অন্যদিকে জান্তাবিরোধী প্রতিবাদ-বিক্ষোভ তীব্রতা নিচ্ছে এবং সহিংসতা ও সশস্ত্র সংগ্রামে রূপ নিচ্ছে। ফলে, গৃহযুদ্ধ অনিবার্য। এরকম একটি পরিস্থিতিতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শক্তভাবে একটি অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। কেবল লিপ-সার্ভিস বা বিবৃতিবাজি নয়, প্রয়োজন বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পদক্ষেপ।
লেখক নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়