একসময় আমরা জানতাম নির্বাচন মানে খুব সিরিয়াস একটা ব্যাপার। দেশ-জাতির ভাগ্য নির্ধারিত হবে ভোটের মাধ্যমে। যোগ্য নেতা নির্বাচন করতে না পারলে কপালে দুর্ভোগ। অতএব, দেখে-শুনে-বুঝে ভোট দিয়ে সুনাগরিকের দায়িত্ব পালন করতে হবেএমনটাই ছিল সাধারণ ভাবনা।
সেই সাধারণ ভাবনা অসাধারণ প্রহসনে রূপ পেল সামরিক সরকারের আমলে। ভোট হয়। কেউ দেয় না। ভূত বোধহয় সেই সুযোগটা নেয়। তার বা তাদের ভোটে বাক্স এমন ভরতে থাকল আর শাসকরা এত এত ভোট পেতে থাকলেন যে ভোটের যদি শরীর থাকত তাহলে লজ্জায় মুখ ঢাকতে হতো।
আমরা ভেবেছিলাম সেই দিন গেছে। কিন্তু কিছু জিনিস যায় না। বারবার ফিরে আসে। আমাদের ভূতের ভোটের দিন বা রাত আবার ফিরে এসেছে। যাই হোক, সেসব বড়দের বড় নির্বাচনের ব্যাপার। ইউনিয়ন পরিষদের ছোট নির্বাচনের চরিত্র অন্যরকম। প্রতিদ্বন্দ্বী সরকারি দল বনাম সরকারেরই আরেক দল। এদের নাম হয়েছে বিদ্রোহী। সমাজের কোথাও কোনো বিদ্রোহ নেই এখন আর, কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এত সব বিদ্রোহীর দেখা মেলে যে মনে হয়, নজরুল বেঁচে থাকলে শান্তি পেতেন। এসব বীর বিদ্রোহীদের দেখে বিদ্রোহী কবিতার সিক্যুয়াল লিখতে বসে যেতেন নির্ঘাত।
কবিতার বিষয় এই বিদ্রোহীরা হতে পারেন। তারও আগে হয়েছেন কৌতূহলের বিষয়, যখন দেখা গেল দলের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে বুক ফুলিয়ে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আর এখন কৌতূহল রূপান্তরিত কৃতিত্বে। কারণ দলের মার্কাকে তারা চ্যালেঞ্জই জানাচ্ছেন না শুধু, কোথাও কোথাও কোথাও ছাড়িয়েও যাচ্ছেন। পঞ্চম ধাপের নির্বাচনে তো মূল প্রার্থীদের চেয়ে বেশি জিতে দেশের রাজনীতি আর নির্বাচনী অঙ্কের নতুন জানালা খুলে দিয়েছেন।
আমার এক বোদ্ধা ধরনের বন্ধু সবকিছুকেই মনে করে সরকারের চাল। করোনা বাড়ছে, বলল, সরকারের চাল। শীত বাড়ছে, তাও নাকি সরকারের চাল। একদিন সবাই মিলে ধরলাম ওকে। সবকিছুতে সরকারের চাল কেন দেখে? যুক্তিটা কী?
একটুও বিব্রত না হয়ে বলল, ‘এটাও সরকারের চাল।’
‘কোনটা?’
‘এই যে তোরা আমাকে ধরতে আসলি?’
রসিকতা না মূর্খতা ধরতে না পেরে আমরা থ।
সে বলল, ‘এরকম বিরোধী মতকে দমনের সম্মিলিত তৎপরতা এটাও তো সরকারের চাল। সরকার চায় না যে...’ তারপর লম্বা বক্তৃতা। এমনই গোছানো সব যুক্তি যে আমাদেরও একসময় সন্দেহ হলো, আমরাও সরকারের চালের অংশ কিনা!
তেমনই অনেকে মনে করছেন, এই নির্বাচনের পাতানো বিরোধিতাও সরকারের চাল। বিরোধী দল যখন নিজেদের হারিয়ে খুঁজছে আর বিদেশিদের কাছে তদবির করে হাস্যকর হচ্ছে, তখন সরকার নিজেদের মধ্যে বিরোধী বানিয়ে একরকম নির্বাচনী উত্তেজনার জন্ম দিচ্ছে। বেশ সাজানো নাটকের চিত্রনাট্যের মতো ব্যাপার। হয়তো ঠিক। কিন্তু এটাও তো ঠিক যে এতে করে বেরিয়ে পড়ছে সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার লোকের অভাব নেই। সুযোগ পেলেই...। কোনো কোনো বোদ্ধা আবার বলবেন, এটাও সরকারের চাল। নিজেদের দলকে দুই ভাগ করে দেখে নিচ্ছে মাঠের প্রকৃত অবস্থাটা। সেটা দেখার পর সিদ্ধান্ত নেবে পরের নির্বাচন আর কমিশনকে কতটুকু জায়গা দেওয়া হবে। অনেক বিশ্লেষক সত্যিই মনে করেন, ২০১৩ সালের ৪ সিটি করপোরেশনে নিরপেক্ষ নির্বাচন দিয়ে তখনকার সরকার বুঝতে চেয়েছিল সত্যিকারের জনভিত্তির চিত্র। চারটাতেই হারার পর তারা যা বোঝার বুঝে নেয়। তার ভিত্তিতেই ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিরোধী দলকে আর একটুও ছাড় নয়।
সরকার কী দেখছে, বিরোধী দল কী বুঝছে সেটা তারা জানে। কিন্তু আমরা জানছি, যে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ছিল গ্রামীণ উৎসবের মতো ব্যাপার সেখানে আজ রক্তের বন্যা। ভোটে কে জিতে না জিতে এরচেয়েও বড় প্রশ্ন এখন হয়ে দাঁড়ায়, কতজন মারা যাবে। ষষ্ঠ ধাপে আমাদের দেশ রূপান্তর-এর নিউজ রুমে নির্বাচনের খবর আসে আর সবার মধ্যে বিস্ময় জাগে। আগের ধাপগুলোর তুলনায় সহিংসতা প্রায় নেই বললেই চলে। পাঁচ ধাপে প্রায় শ’খানেক লোক মারা গিয়ে মৃত্যু বিষয়টাকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের এমন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য করে তুলেছেন যে হানাহানিহীন ইউপি নির্বাচন যেন গোলবিহীন ফুটবল ম্যাচ। কৌতুক, কৌতূহল, কৃতিত্ব ছাপিয়ে এটা এখন কুরুক্ষেত্র।
দেখে দেখে আফসোস হয়। একসময় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হতেন এলাকার সর্বজনশ্রদ্ধেয় মানুষ। ত্যাগী সমাজসেবক, জনপ্রিয় স্কুল শিক্ষক, এলাকার উচ্চশিক্ষিত মানুষএদের জন্যই বরাদ্দ ছিল পদটা। নির্বাচন হতো, বাজে লোকেরাও দাঁড়াত কিন্তু যোগ্য মানুষেরও জায়গা ছিল। এখন বোধহয় নেই। মার্কার অঙ্ক ইউনিয়ন পর্যন্ত চলে যাওয়াতে দলবিহীন মানুষরা বাতিল। দল বা রাজনীতির লোকেরা কী শিক্ষা নিলেন তারা জানেন কিন্তু আমরা জেনে গেছি, দলাদলিটা এই পর্যায় পর্যন্ত যাওয়া উচিত না। উন্নত বিশ্বের উদাহরণ অনেকে দেবেন, সেখানে স্থানীয় সরকারও রাজনৈতিক ভিত্তিতে হয় বটে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সেখানে রাজনীতি মানে ক্ষমতার আরোহণের সিঁড়িই শুধু নয়, সমাজসেবাও। সেই সেবামুখী মানুষেরাই রাজনীতিতে নাম লেখান। ফলে ধরেই নেওয়া হয়, যে রাজনীতিতে নেমেছে সে জনকল্যাণের জন্য নেমেছে। কাজেই রাজনীতির অঙ্কে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করতে অসুবিধে নেই। কাগজে আমাদেরটাও তেমন কিন্তু আমাদের কাগজ আর কাজে যে এভারেস্ট আর রেইন ফরেস্টের পার্থক্য সে তো আমরা জানি। রাজনীতিতে তারাই নাম লেখায় যারা শক্তি চায়, চাঁদা চায়, দখল চায় এবং প্রায় সবকিছুই চায়। গ্রাম বা ইউনিয়নে এদের আস্কারা না দিলে কিছু জায়গা অন্তত মানুষের থাকে। শান্তির থাকে। সরকারি দল বা স্থানীয় সরকার বিশ্লেষকদের কারও কারও মধ্যেও সেই চিন্তার উদয় হয়েছে দেখছি। সেই আশা পূরণ হওয়া বহু দূরের ব্যপার। তবু চলুন হতাশায় না ডুবে বরং কিছু রসিকতা শুনি।
এক এলাকায় ভোট দিতে গিয়ে ঘোর বিপত্তি। কেন্দ্র দখল করে রেখেছে একদল মাস্তান। নিজেরাই সিল মারছে। ক্ষুব্ধ ভোটারদের একজন বন্ধুকে ফোন করল দুঃখের কথা বলতে, ‘আমরা এখানে একদম ভোট দিতে পারছি না। কেন্দ্রেই ঢুকতে দিচ্ছে না।’
‘বলো কী! খুবই দুঃখের কথা।’
‘তা তোমাদের এখানে কী অবস্থা?’
‘খুবই চমৎকার নির্বাচন হচ্ছে। কোনো বাধা নেই।’
‘তাই নাকি?’
‘হুম। আমরা যত ইচ্ছা ভোট দিতে পারছি। আমি নিজেই তো কয়েকটা ভোট দিয়ে এলাম। চাইলে আরও দিতে পারতাম। ইচ্ছে হলো না। আমি একাই যদি সব ভোট দিই তাহলে অন্যরা কী দেবে?’
আমাদের এখানে মাঝে মধ্যে শুনি, কোথাও কোথাও সুষ্ঠু ভোট হয়। আশা করি, বিষয়টা আমাদের এই গল্পের মতো নয়।
এরপরও কিছু মানুষের নির্বাচন নিয়ে তুমুল আগ্রহ। কে ভোটে যাবে না যাবে তাই নিয়ে নানান আলোচনা। ইসি-সার্চ কমিটি এসব নিয়ে উত্তেজনা দেখতে দেখতে হাসি পায়। আর আরেকটা কৌতুক মনে পড়ে।
ভোটের ধুন্দুমার প্রচার চলছে এক এলাকায়। একজন নেতা সদলবলে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছেন ভোট চাইতে। প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন গলা উজাড় করে। মানুষ এসব ছেলেভোলানো কথায় খুব একটা ভোলে না বলে পাত্তা পাচ্ছেন না বিশেষ। কিন্তু এক বাড়িতে যেতেই তুমুল সমাদর। ‘ভোটের লোক এসেছে’ ‘আসুন আসুন’ বলে তুমুল খাতির।
তিনি ‘এই করব’ ‘ওটা পাইয়ে দেব’ ‘সেটা হইয়ে দেব’ বলতে থাকলেন আর মিনিটে মিনিটে হাততালি। নেতা মহাখুশি। শুধু সামান্য খটকা। একটা লোক পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল, একবারও হাততালি দেয়নি। বেরিয়ে এসে সাঙ্গপাঙ্গদের বললেন, ‘এ নিশ্চয়ই বিরোধী দলের লোক। একে ডাকো।’
ডাকা হলো। সে বলল, ‘আপনি কি ভেবেছেন এরা আপনাকে ভোট দেবে?’
‘দেবে না?’
‘এদের তো ভোট নেই। এটা একটা পাগলাগারদ। এরা সবাই পাগল।’
নেতা স্তম্ভিত। সামলাতে সময় লাগল। তারপর স্বাভাবিক কৌতূহলবশত জানতে চাইলেন, ‘সবই বুঝলাম কিন্তু তুমি হাততালি দিলে না কেন?’
‘আমি এখানকার প্রহরী। আমি তো আর পাগল না যে আপনাদের ভোটের কথায় সুর মেলাব। ভোট আর নির্বাচনের কথায় এখন নাচে শুধু পাগলরা! পাগল ছাড়া আর কার এসব নিয়ে ভাবার সময় আছে।’
এই গল্পের কাহিনী এবং সব চরিত্র কাল্পনিক। যদি কোনো জায়গার বাস্তবতার সঙ্গে এর মিল পান তাহলে সেটা একান্তই আপনার নিজস্ব ব্যাপার।
লেখক সাংবাদিক ও লেখক
mustafa.mamun@gmail.com