প্রকৃতি ও প্রাণিসম্পদের প্রতি ভালোবাসা

গত দু সপ্তাহে মিডিয়ায় সুন্দরবনে বাঘ, গাজীপুরে সাফারি পার্কে বাঘ ও জেব্রা, নাটোরে  মেছো বাঘ সংহারের সংবাদে উদ্বেগ বেড়েছে বিভিন্ন মহলে। প্রকৃতি ও প্রাণিসম্পদের প্রতি সদয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে পরিবেশবাদী সংগঠনসমূহ। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদের স্বার্থরক্ষায় সোচ্চার সুশীল সংগঠন বাবাহকু বসে নেই। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সিডর এবং ২০০৯ সালের ১৫ মে আইলার আক্রমণের পর সুন্দরবনে বসবাসকারী প্রকৃতি ও প্রাণিসম্পদের সপক্ষে বাবাহকু (বাঘ বানর হরিণ কুমির) গঠিত হয়।

গতকাল সুন্দরবনের কচিখালীতে তার শীতকালীন অবকাশ কেন্দ্রে ডাকা বিশেষ সংবাদ  সম্মেলনে বাবাহকুর প্রেসিডিয়াম প্রধান, বাঘ জোটের বর্ষীয়ান নেতা সুন্দর মিয়া সংবাদকর্মীদের কাছে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ও প্রাণিসম্পদের প্রতি লোকালয়ের বৈরী আচরণের ব্যাপারে তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন। বাবাহকুর নিজস্ব নিউজ পোর্টাল উড়ো বিভ্রান্তিকর সংশয় সন্দেহ ( উবিসস)  সংবাদ সম্মেলনটি লাইভ সম্প্রচার করে। সম্মেলনে সুন্দর মিয়া তুলে ধরেন বাবাহকুর পরিচয়। প্রথমে নিজের পরিচয় দেন ‘আমার নাম সুন্দর মিয়া, বনের বাঘ, হরিণ, হাঙর, কুমির, কচ্ছপ, বানর, বগা, মাছ, মোরগ, ময়াল, সাপ, শালিখ, পাখি, পাখাল, সবাই মিলে এবার এরা আমাকে নেতা মেনে নিয়েছে। এই সুন্দরবনের নেতা আমি সুন্দর মিয়া। আমি জোর করে নেতা হইনি। নেতা হতেও চাইনি। এদের অনুরোধে এবার আমি ওগো সর্দার হইছি। আঞ্চলিক টানে গম গম ভারী গলায় বলে চলেন, অন্যগুলো বন্ধ হলিও আমাদের আশপাশে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে আমাদের বাদার অস্তিত্ব এবং পরবর্তী প্রজন্মের ভূত-ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা আতঙ্কিত।’

‘সেবারের বড় বড় দুটি বান, শুনিছি তার নাম ছেডর আইলা না যেন কি, আমাদের যা সর্বনাশ করেছে তা আর বলার না। আমাদের এত বড় ক্ষেতি হলো কিন্তু কেউ আমাগো সেন্দার করে দেখল না, আমরা শুনিছি বিশ^ জলবায়ু সম্মলেনে বড় বড় তহবিল থেকে অনেক সাহায্য প্যায়েছেন, কিন্তু আমরা কী পালাম? এর আগে আমরা এভাবে কখনো এক হইনি, দল করিনি। এরকম করে কতা বলতি হবে তাও ভাবিনি। আমরা শুনতিছি আমাদের এই সুন্দরবনকে নাকি এক নম্বর করতি কেউ কেউ উঠেপড়ে লেগেছিলেন। আমরা বাঁচলাম না মল্লাম সেদিকি কারও খেয়াল নি অথচ আমাগো দেকিয়ে আমাগো কতা বুলে বিদিশিগো থেকে আপনারা সাহায্য নেচ্ছেন। আমরা যদি না বাঁচি কাগো দেকাতি একানে নে আসবেন। বানে ঝড়ে এত গাছ মরে গেল, পড়ে গেল, জ্বলে গেল, ভেঙেচুরে পড়ে থাকল কেমন নেড়া মুড়ো হয়ে গেল আমাদের থাকার জায়গা, কই কেউ তা সারাতি এলো না। আমরা খুব কষ্ট পালাম। কার কাছে বলব?’

এসব বলতে বলতে সুন্দর মিয়ার মনে হলো একটা সুন্দর হরিণকে ডেকে কানে কানে কী যেন বলল। হরিণটা এমনভাবে মাথা নাড়াল যেন সে বুঝেছে। সুন্দর মিয়া সবার সামনে হরিণটাকে পরিচয় করিয়ে দিল ‘এর নাম হরিণা হাপান। আমাদের মুখপাত্র, লোকালয়ের  তথ্যমন্ত্রীর মতো। সে এখন কিছু বলবে।’ হরিণা কথা বলা শুরু করল। সে সুন্দর মিয়ার মতো আঞ্চলিক টানে গম গম করে কথা বলে না, ওর গলার স্বরটা মিহি, চিকন এবং মিষ্টি; সে গুছিয়ে কথা বলে, যুক্তি আছে, মনে হয় কোনো নামকরা বিশ^বিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট : ‘এই বনে আমরা আছি বলেই এই বন আছে। এই বনের নাম সুন্দরবন, আমরা সবাই সুন্দর। আমাদের দেখতে, আমাদের দেখাতে সবাই এখানে আসে। সবাই এসে আমাদের দেখে খুশি হয়, ছবি তোলে, আবার আমাদের বধও করে’।

হরিণার গলায় কাঁপা কান্নার সুর, ‘আমাদের সবাই উপভোগ করে, আমাদের নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করে, আমাদের পণ্য বানানো হয়। অন্যের মনোরঞ্জনে এসে, অন্যের টাকা-পয়সা বানাবার পাত্র হয়ে আমরা অকাতরে প্রাণ দিই আমাদের এই মহানুভবতাকে সবাই যদি দুদ- বসে ভাবত তাহলে শান্তি পেতাম। না সে শান্তি তো আমাদের কপালে নেই, বরং আমাদের এমনভাবে উপেক্ষা করা হয়, এমভাবে উপহাস করা হয় যে আমরা মর্মযাতনায় ভুগি। আমাদের আরও কষ্ট লাগে, আমরা অপমানিত বোধ করি, যখন দেখি বা শুনি লোকালয়ে কেউ কোনো অপকর্ম করলে আমাদের সঙ্গে তার তুলনা করে উদাহরণ টেনে তাদের আমাদের চেয়েও অধম বলা হয়। আমি স্পষ্ট করতে চাই, আমাদের মধ্যেও মূল্যবোধ আছে, সুশাসন ও জবাবদিহির ব্যবস্থা আছে, ন্যায়নীতি-নির্ভরতাবোধ আছে, আমাদের কেউ সহজে ও ধরনের অপকর্ম করে না, এখানে নিজেদের অপকর্মকে যৌক্তিক করতে অন্যের অপপ্রয়াসকে দাঁড় করাবার চেষ্টা চলে।’  

ঠিক এ সময় একটা লম্বাটে ধরনের হ্যাংলা পাতলা বিমর্ষ বাঘ এলো পাটাতনের কাছে- সুন্দর মিয়া উঠে দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানাল। পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে সে জানাল ‘ইনি গিরিধারী লালা, পাশের বাদা থেকে আমাগো এলাকায় এয়েছেন’ কারও বুঝতে বাকি রইল না যে, এটা সুন্দরবনের অপর অংশের বাঘ।

সিডর, আইলা ও আম্ফান দুদেশেরই সুন্দরবনে আঘাত হেনেছে। সীমান্ত নদীর দু’পাড়েই অসম্ভব ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বনের বাসিন্দারা শুধু না বর্ডারের দুপাশের বাসিন্দারাও ভিসা পাটপোর্ট ছাড়াই যাতায়াত  করেছে খাবার পানির সন্ধানে। গিরিধারী সুন্দর মিয়ার মতো গমগম শব্দ করল না তবে বেশ মার্জিত স্বরে বলল কমন দুর্যোগ আমাদের অনেকটা কাছাকাছি এনে দিয়েছে। আমরা বুঝেছি সম-সংকটে বিপক্ষও পক্ষ হয়ে যায়, শত্রুও মিত্রতার মেলবন্ধনে বাঁধা পড়ে।

হরিণা জানাল, গিরিধারী দাদাদের দেশের সরকার সেদেশের বনের সবাইকে নাকি ন্যাশনাল আইডেনটিটি কার্ড দেবে রিলিফ ও যতœআত্তির খোঁজখবর সমন্বয় সাধনের জন্য। হরিণা পরিসংখ্যান দিয়ে বললে, দেশ ও বন ভাগের সময় গিরিধারীদের সংখ্যা ছিল ৫ শতাধিক আর আমাদের এখানে সুন্দর মিয়ারা ছিলেন ৩ হাজারের ওপরে। বিগত পৌনে একশ বছরে  গিরিধারীরা ৩ হাজারের ওপরে আর আমাদের অংশে সুন্দর মিয়াদের সংখ্যা ৩শর কাছাকাছি ।

এর মধ্যে একটা শঙ্খচিল উড়ে এসে সুন্দর মিয়ার কাছে কী যেন একটা বার্তা পৌঁছাল। খবর শুনে সুন্দর মিয়া ক্ষেপে গেল মনে হলো। আফসোসের ভঙ্গিতে, বিলাপের ভাষায় সবার  দিকে চোখ রাঙিয়ে সে বলতে লাগল, ‘এই মাত্র খবর পেলাম আমাদের একজন সম্মানিত সদস্যের লাশ মিলেছে লোকালয়ে। তিনি নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন না খাদ্যাভাবে তার মৃত্যু হয়েছে জানার জন্য হন্তাকারীদের দিয়েই তদন্ত করতে দেওয়া হয়েছে। কদিন আগে আমরা জানতে পেরেছি দেশের রাজধানীর অদূরে খোদ সাফারি পার্কে নিরাপদ নিকুঞ্জ বলে যাকে জানে সবাই সেখানে আমাদের আরেক সদস্যকে গুম করে হত্যা করা হয়েছে। সেখানে সাত জন জেব্রা, আমাদের বিদেশি সম্প্রদায় ও সদস্য, মারা যাওয়ার পর এসব খবর আমরা পাচ্ছি। দুঃখ্যির বিষয় হলো সেখান কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীন অবহেলায় আমাদের এসব মূল্যবান সদস্যরা অপমৃত্যুর শিকার হয়েছেন।’

সুন্দর মিয়া তার থলি থেকে লোকালয়ের এক পত্রিকায় ছাপানো নাটোরে এক মেছোবাঘের মৃত্যুর চিত্র দেখালেন সবাইকে। তিনি বললেন, সবাই জানে আমরা দারুণ খাদ্যাভাবে আছি, পানির কষ্টে আছি, নাটোরে আমাদের এই জ্ঞাতি ভাইকে যেতে বলেছিলাম বিকল্প কিছুর সন্ধানে। তাকে তাড়িয়ে, ঘরের চালে উঠিয়ে নামিয়ে বল্লম দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারা হয়েছে। এই সুন্দরবন আমরা দেখে রাখি বলে আপনারা আয় রোজগার করতে পারেন, অথচ আজ আমরা আত্মরক্ষার সুযোগ পাচ্ছিনে।’ এ কথা শোনা মাত্রই শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে কর্তব্য পালনরত বানরগুলো ক্ষেপে উঠল মনে হলো। এ সময় একদল উচ্ছৃঙ্খল শূকর গোঁ গোঁ করে পাটাতনের দিকে এগিয়ে আসার উপক্রম হওয়ায় একটা ষাঁড় পাটাতনের পাশে দাঁড়িয়ে ধাক্কাধাক্কি শুরু করল।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে হরিণা হাপান একটি ভালো খবর শুনিয়ে সবাইকে শান্ত হতে অনুরোধ রাখলেন। তিনি জানালেন চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় জন্মের পর মা জয়ার অবহেলায় মারা যায় দুটি বাঘ শাবক। মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধারের পর মানুষের স্নেহ-আদরে বেঁচে ফিরেছে তৃতীয় শাবকটি। চিড়িয়াখানা থেকে গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে জানা গেছে, সম্প্রতি শাবকটিকে বাঘ পরিবারে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বিভিন্ন চিড়িয়াখানা ও সাফারি পার্কে যখন যতে্নর অভাবে বাঘ, জেব্রা, সিংহ মারা যাচ্ছে সে সময় একটি বাঘ শাবককে বাঁচাতে এবং পরিবারে ফেরাতে লোকালয়ের চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের ১৪ মাসের এ প্রয়াস প্রচেষ্টাকে প্রাণিসম্পদ সংরক্ষণ ইতিহাসে বিরল ঘটনা হিসেবেই বর্ণনা করে হরিণা বাবাহকুর পক্ষ থেকে বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানালেন। এ সংবাদ শুনে সুন্দর মিয়ার চোখে পানি এসে গেল। কিন্তু হঠাৎ অনলাইন বিভ্রাট দেখা দেওয়ায় কেউ দেখতে পেল না সংবাদ সম্মেলনের পরের অংশ।

লেখক সরকারের সাবেক সচিব এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান