বিদেশ ঝালাই চায় আ.লীগ

আগামী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভরসার দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্ব সুদৃঢ় করার পরিকল্পনা করেছে আওয়ামী লীগ। সরকারের পাশাপাশি দলীয়ভাবেও বন্ধু দেশের সংখ্যাও বাড়াতে চায় ক্ষমতাসীন দলটি। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে এ পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে র‌্যাব কর্মকর্তাদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, শান্তিরক্ষা মিশনে র‌্যাবকে নিষিদ্ধ করতে জাতিসংঘে ১২টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের চিঠি, বিদেশে বিএনপি-জামায়াতের লবিস্ট নিয়োগ বিতর্ক ও কয়েকটি দেশের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন নিয়ে আলোচনার প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ এ পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে।

দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ওই নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ এ নীতি অনুসরণ করে তারা কাজ করবেন। তাদের লক্ষ্য বন্ধু দেশগুলোর আস্থা অর্জন করা।

তারা বলেন, বছরের মাঝামাঝি সময় দলের বিভিন্ন প্রতিনিধিদলের বিদেশ সফর শুরু হবে। এতে সম্পর্ক উন্নয়নে বিশেষজ্ঞদেরও যুক্ত করা হবে। সরকারি প্রতিনিধি ছাড়াও সম্পর্ক জোরদারে দলীয় প্রতিনিধি, সংসদীয় প্রতিনিধিদল বিদেশ সফরে করবে। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত দেশের প্রতিষ্ঠিত ও শীর্ষসারির ব্যবসায়ী, প্রভাবশালী এনজিওর কর্তাব্যক্তিদেরও এসব সফরে রাখা হবে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে না থাকা জ্যেষ্ঠ নেতাদেরও এ ক্ষেত্রে কাজে লাগানো হবে। এসব সফরের মধ্য দিয়ে বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা বাড়বে বলে আশা করছেন তারা।

আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা দলের এ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, বৈশি^ক করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে উঠলে বিদেশ সফর শুরু হয়ে যাবে। প্রভাবশালী দেশগুলোতে বসবাস করা প্রবাসীদেরও এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ পরিকল্পনার কথা জানাতে গিয়ে কেন্দ্রীয় ওই নেতারা আরও বলেন, রাজনৈতিক প্রতিনিধিদলের সফরে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিভিন্ন দেশে সুনামের সঙ্গে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তিদের যুক্ত করা হবে। এর মধ্য দিয়ে বন্ধু দেশগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কোন্নয়নে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও করার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের সহায়কশক্তি হিসেবে পাশে থেকে কাজ করতে চায় দলও।

আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সূত্র জানায়, বিদেশ সফরে তারা ওইসব দেশের ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল ও সুশীল সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গেও আলাপ-আলোচনা করবেন। বন্ধু দেশগুলোর সঙ্গে বহুমাত্রিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় ক্ষমতাসীনরা। দলটির একাধিক নেতা বলছেন, তারা মনে করেন বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড নিয়ে সম্প্রতি র‌্যাবের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্র যে নিষোধাজ্ঞা দিয়েছে সেটা এড়ানো সম্ভব হতো যদি সরকারের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কে ভাটা না পড়ত। তাই সরকারের পাশাপাশি বিদেশিদের সঙ্গে দলেরও সুসম্পর্কের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা।

আওয়ামী লীগ সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের পাশাপাশি বিদেশি বন্ধুদের সঙ্গে দলেরও একটি সুসম্পর্ক ভীষণ প্রয়োজন। সরকার টু সরকার সম্পর্কে অনেক সময় সব সুবিধা আদায় করা নাও যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা গেলে অনেক সুবিধা আদায় করা সম্ভব হয়ে উঠে।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াত বিদেশে লবিস্ট নিয়োগ করে সরকার ও দেশের বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার শুরু করেছে, সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চক্রান্ত করছে সেখান থেকে সরকারকে বের করে আনতে দলেরও কিছু ভূমিকা থাকে।’

আওয়ামী লীগ সম্পাদকমন্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, দলের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিদল বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে এখন থেকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সভা-সেমিনারে যোগ দেবে। মূলত সরকার ও দেশকে নিয়ে অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কাজ করবে তারা। এর ফলে টাকা দিয়ে বিদেশে লবিস্ট নিয়োগ করারও প্রয়োজন পড়বে না। দেশের বিভিন্ন প্রতিনিধিদল বিদেশে সফরে গিয়ে লবিস্টের মতো করেই কাজ করতে পারবে। যত বেশি আন্তর্জাতিক সভা-সেমিনারে যোগ দেওয়ার সুযোগ হবে, তত বেশি সরকারের উন্নয়ন-অগ্রগতি, মানবাধিকার পরিস্থিতি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি মানুষের আস্থার কথা বিদেশ সফরে তুলে ধরা সম্ভব হবে।

আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ সূত্রগুলো আরও জানায়, বিএনপিসহ সরকারবিরোধী মহল বিদেশে লবিস্ট নিয়োগ করে মিথ্যা অপপ্রচারের মাধ্যমে দেশের ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিদেশ সফরের মধ্য দিয়ে তারা মূলত অপপ্রচারের জবাব দেবেন। বিদেশিদের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের পাশাপাশি বন্ধু তালিকাও বাড়াতে কাজ করবে আওয়ামী লীগের শীর্ষসারির নেতারা। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রতিনিধিদল কাজ করবে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসলে বিদেশিদের সঙ্গে সম্পর্ক রাজনীতির মাঠে আলোচনায় এসেছে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা ইস্যুতে। নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি দ্রুত সমাধান করা উচিত।’ তবে এ নিষেধাজ্ঞার ফলে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটবে এমনটা বিশ্বাস করেন না তিনি। তার দাবি, ‘দেশটির সঙ্গে বহু ধরনের সম্পর্ক রয়েছে বাংলাদেশের। তাছাড়া আমেরিকাও এখন অর্থনৈতিকভাবে একমাত্র শক্তিশালী দেশ নয়। চীন, রাশিয়াসহ অনেকেই নিজেদের প্রস্তুত করে নিচ্ছে।’

ড. ইমতিয়াজ বলেন, ‘শুধু সরকারের সঙ্গে সরকারের সম্পর্কই সবকিছু নয়। এ সম্পর্ক দিয়ে সব স্বার্থরক্ষা করাও সম্ভব নয়। বিদেশি সম্পর্ক যত বহুমাত্রিক হবে সফলতাও ততই বেশি আসবে। যেকোনো সমস্যা দ্রুত সমাধান করতে বহুমাত্রিক সম্পর্ক সুফল বয়ে আনে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের সিভিল সোসাইটির সঙ্গে অন্য দেশের সিভিল সোসাইটির এক ধরনের সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে। এর জন্য সরকারের উদ্যোগের প্রয়োজন আছে।’

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয় এ পররাষ্ট্র নীতিতে আমরাও চলছি। বৈশি^ক পরিস্থিতি এখন যে পর্যায়ে তাতে সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতেই হবে। সেই লক্ষ্যে কাজ করবে আওয়ামী লীগও।’