মামলাকে আর পাত্তা দিচ্ছে না বিএনপি

করোনার বিস্তারের কারণে সরকার বিধিনিষেধ আরোপ করায় বিএনপির আন্দোলন কর্মসূচি আপাতত স্থগিত রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দলটির আবার মাঠে নামার ঘোষণা রয়েছে। এই অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার নতুন করে বিএনপির কয়েক নেতার বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জে মামলা হয়েছে। এ বিষয়টিকে সরকারের এক ধরনের চাপ হিসেবে দেখছে দলটি।

বিএনপির কয়েক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে সরকার বেকায়দায় পড়েছে। সে কারণে এখন বিএনপির ওপর পাল্টা চাপ দিচ্ছে। কিন্তু মামলা করে আর বিএনপিকে দমানো যাবে না। সরকারের শেষ রক্ষা হবে না।

বিএনপি নেতাদের দাবি, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর গত এক যুগে সারা দেশে দলটির ৩৫ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর থেকে শুরু করে তৃণমূলের এমন কোনো নেতাকর্মী পাওয়া যাবে না, যার বিরুদ্ধে মামলা নেই।

গত ডিসেম্বরে র‌্যাবের বর্তমান ও সাবেক সাত কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দেয়।

এই বিষয়টি উল্লেখ করে গতকাল শুক্রবার বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমেরিকার নিষেধাজ্ঞায় দেশে ক্রসফায়ার (বন্দুকযুদ্ধ) বন্ধ হয়ে গেছে। চাপে পড়ে সরকার দুর্বল হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের ওপর স্বতন্ত্র অবরোধ আসতে পারে। এ কারণে বেকায়দায় আছে সরকার। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকার বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দিচ্ছে। কিন্তু এসব করে শেষ রক্ষা হবে না। কারণ বিএনপি কোনো ধরনের চাপে নেই।’

এর আগে গত বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে হাফিজ বলেছেন, ‘নিষেধাজ্ঞা যেটা দেখেছেন, সেটা তো সবে শুরু। এটা ট্রেলার (প্রাথমিক চিত্র), পিকচার (পরবর্তী ঘটনা) এখনো বাকি।’

প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তি করার অভিযোগে মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মো. আকরাম হোসেন বাদল নারায়ণগঞ্জের জ্যেষ্ঠ বিচার বিভাগীয় হাকিম আদালতে মামলার আবেদন করেন। গত বৃহস্পতিবার আবেদন গ্রহণ করে হাকিম কাউসার আহমেদ জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখাকে (ডিবি) তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

এই মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালকে। এ ছাড়া বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন, চাকরিচ্যুত মেজর দেলোয়ার হোসেন, গণঅধিকার পরিষদের সদস্য সচিব নুরুল হক নুরুসহ আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছ।

নারায়ণগঞ্জে দায়ের হওয়া মামলার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে ভারতে চিকিৎসাধীন মোয়াজ্জেম হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নাকের ওপরে যখন পানি উঠে যায়, তখন মাথা নিয়ে চিন্তা করে কোনো লাভ নেই।’

এদিকে গত বুধবার রাতে সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে যুবদলের নেতা আকবর আলীকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ হত্যাকা-ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জড়িত বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। এই হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে যুবদল আজ শনিবার সারা দেশের জেলা ও মহানগরে বিক্ষোভ সমাবেশের কর্মসূচি দিয়েছে।

দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ও সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে যুবদল নেতাকে গুলি করে হত্যার বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অবৈধ আওয়ামী লীগ সরকারের বৈশিষ্ট্যই হলো খুন, গুম ও হামলা করে বিরোধী নেতাকর্মীদের বিধ্বস্ত করা। কথায় কথায় তারা মামলা করে। এই সরকার মামলাবাজ সরকারে পরিণত হয়েছে।’

সারা দেশে দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৩৫ লাখ মামলা হয়েছে দাবি করে সিরাজগঞ্জের সাবেক এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘বিশে^র আর কোনো দেশের সরকার এই আওয়ামী লীগ সরকারের মতো তার বিরোধী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এত মামলা করেছে কি না সন্দেহ রয়েছে। মামলার ক্ষেত্রে সরকারের নাম গিনেস বিশ্ব রেকর্ডে ওঠা উচিত।

তার দাবি, ‘সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে যুবদল নেতা আকবর আলীকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে ৫৬১ নেতাকর্মীকে হত্যা করেছে সরকার। খুন, গুম, হামলা-মামলা করে সরকারের শেষ রক্ষা হবে না।’  

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বিদেশ বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি জার্মান ভিত্তিক সংবাদ সংস্থা ডয়চে ভেলেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘মানবাধিকার কোনো একটি দেশের বিষয় নয়, এটি আন্তর্জাতিক বিষয়। এটা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বাংলাদেশের মানুষের মৌলিক অধিকারের বিষয়। বিএনপির দায়িত্ব হলো দেশে যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘটনা ঘটে, তার বিরুদ্ধে দেশে এবং দেশের বাইরে সোচ্চার হওয়া। বিএনপি সেই কাজটিই করেছে এবং অব্যাহতভাবে করে যাবে। এটা বিএনপির নৈতিক দায়িত্ব।’

তিনি বলেন, ‘সরকারের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো উঠেছে সেগুলো খন্ডন করার দায়িত্ব তাদের। সেটা না করে তারা আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে যাচ্ছে। এটা তাদের কাজ নয়। আসলে সরকার খুন, গুম, মামলা করে যেভাবে টিকে আছে তা সংশোধন না করে বরং আগের পথেই হাঁটছে। এসব করে কোনো লাভ হবে না। বরং পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য আরও বলেছেন, ‘নিষেধাজ্ঞার ফলে সরকার অনেক চাপের মধ্যে আছে। বিএনপি কোনো চাপের মুখে নেই। চাপের মুখে ফেলা যাবে না। বিএনপি বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল। সরকার চাপের মুখে আছে বলেই তো অগণতান্ত্রিকভাবে সব কিছু করতে চাইছে।’