মাত্র এক মাসের ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক সাক্ষী খুনের ঘটনায় সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। প্রায় এক যুগ আগে জাতীয় আইন কমিশন সাক্ষী সুরক্ষা আইন করার জন্য সুপারিশ করে। কিন্তু এখনো সেই আইন হয়নি।
সংবিধান ও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফৌজদারি মামলার আসামিদের অধিকার রক্ষায় সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও আইন রয়েছে। কিন্তু যাদের সাক্ষ্যের মাধ্যমে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ এবং সাজা হয় সেই সাক্ষীদের সুরক্ষায় দেশে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট আইন নেই। কেবল সাক্ষ্য আইনের ১৫১ ও ১৫২ ধারা অনুযায়ী সাক্ষীকে অপমানজনক, কুরুচিপূর্ণ বা আগ্রাসী প্রশ্ন করার ব্যাপারে বিধিনিষেধ রয়েছে।
আইনজীবীদের অভিমত, খুন, ধর্ষণের মতো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধে ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা ভুক্তভোগী ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। কিন্তু ঘটনার পর নিরাপত্তাহীনতায় থাকতে হয় তাদের। বর্তমানে খুন, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, এসিড নিক্ষেপের মতো গুরুতর অপরাধের বিচারে দীর্ঘসূত্রতা নিয়মিত বিষয়। এর অন্যতম কারণ, এসব মামলার আসামিরা অনেকক্ষেত্রেই সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। সাক্ষীকে খুন, মারধর ও হুমকির ঘটনা নিয়মিতই ঘটছে। এতে করে নিরাপত্তাহীনতায় শুনানির দিন সাক্ষীরা আদালতে যান না।
চট্টগ্রামে নগরের ইপিজেড এলাকায় ২০০৯ সালের ১১ এপ্রিল মো. এরশাদ নামে একজন খুন হন। এই মামলায় গত বছরের নভেম্বরে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন লায়লা বেগম। সম্প্রতি ওই খুনের মামলার আসামি ইরান (৩৩) জামিনে বেরিয়ে এসে হামলা চালায় ওই সাক্ষীর ওপর। মারধরের পর গত ৪ জানুয়ারি মারা যান লায়লা। ইতিমধ্যে এই খুনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে ইরান।
মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায় ২০১৬ সারের ১৬ অক্টোবর ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার কাষ্টভাঙ্গা গ্রামের শাহানুর বিশ্বাসের ওপর হামলার ঘটনার পর তার দুই পা কেটে ফেলতে হয়। এ মামলার সাক্ষী ছিলেন একই এলাকার পীর আলী (৩৫)। জীবননাশের হুমকি পেয়ে গত বছরের ৪ ডিসেম্বর কালীগঞ্জ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন তিনি। গত ২৩ জানুয়ারি নিখোঁজ হওয়ার পরদিন গ্রামের খালপাড় থেকে গলায় রশি বাঁধা অবস্থায় পীর আলীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। স্বজনদের অভিযোগ, ওই মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার কারণে তাকে প্রাণ দিতে হয়েছে।
গোপালগঞ্জে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সাইদুর রহমান বাসু হত্যা মামলার সাক্ষী মিন্টু মিনা ওরফে কোটর মিনাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ১৬ জানুয়ারি শহরের ফরিককান্দি এলাকার ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক থেকে লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ জানায়, বাসু হত্যা মমলায় ২৪ জানুয়ারি মিন্টুর সাক্ষ্য দেওয়ার দিন ধার্য ছিল। এই কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে সন্দেহ পুলিশ ও স্থানীয় লোকজনের।
এর আগে ২০১০ সালে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচার শুরুর পর সাক্ষীদের হুমকি, হামলার পরিপ্রেক্ষিতে সাক্ষী সুরক্ষা আইন করার দাবি ওঠে নানা মহল থেকে। এর ধারাবাহিকতায় গুরুতর অপরাধে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও সাক্ষীর সুরক্ষায় ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাক্ষী সুরক্ষা আইন করতে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠায় জাতীয় আইন কমিশন। এতে সাক্ষী সুরক্ষা আইনের প্রয়োজনীয়তা, গুরুত্ব, প্রেক্ষাপট, পরিস্থিতি, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নজির, বিশ্লেষণ করে কমিশন। সাক্ষীদের নিরাপত্তা ও অধিকার ভোগ নিশ্চিত করা, সুরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য জানার অধিকার, মামলার রায় ঘোষণার পরও ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা অব্যাহত রাখা, আদালতে নির্বিঘ্নে তাদের হাজিরার ব্যবস্থা করাসহ বেশকিছু সুপারিশ করে কমিশন। পরে এ আলোকে আইন মন্ত্রণালয় আইনের একটি খসড়া তৈরি করে। এর অনুলিপি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও পাঠানো হয়। পরে এ নিয়ে সরকারের জোরালো পদক্ষেপ দেখায় যায়নি।
এ বিষয়ে সবশেষ পরিস্থিতি এবং অগ্রগতি জানতে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। গত বছরের ২৪ অক্টোবর ঢাকায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছিলেন, এই আইনের বিষয়টি সামনে আসলে তড়িৎ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাক্ষী সুরক্ষা আইনটা প্রয়োজন। কেননা স্পর্শকাতর মামলাগুলোতে সাক্ষীদের সুরক্ষার প্রয়োজন হয়। এটি হলে সাক্ষীরা নির্ভয়ে সাক্ষ্য দিতে পারবে। তাদের সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব তো আমাদের (রাষ্ট্রপক্ষের)।’
আন্তরিকতা থাকলেও নিকট ভবিষ্যতে এই আইন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না এ নিয়ে আইন ও বিচারসংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ সন্দিহান। সাবেক প্রধান বিচারপতি ও আইন কমিশনের চেয়ারম্যান এ বি এম খায়রুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাক্ষীদের সুরক্ষা দেওয়া তো দরকার। আইনটি হওয়া উচিত। কিন্তু এটি কবে করতে পারবেসেটা সরকারের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে। কেননা এটি বাস্তবায়ন করতে গেলে যে সক্ষমতা, সম্পদ, অবকাঠামো ও অর্থের প্রয়োজন তাতে সরকার আন্তরিক হলেও এখনই এটি বাস্তবায়ন করতে পারবে বলে মনে হয় না। সাধ্য আর সামর্থ্যরে মধ্যে একটা সমন্বয়তো থাকতে হবে।’
সাক্ষীর গরহাজিরায় একটি হত্যা মামলা দীর্ঘদিনেও নিষ্পত্তি না হওয়ায় ২০১৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ওই মামলায় এক আসামির জামিন শুনানির পর আদেশে ফৌজদারি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি ও সাক্ষীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সাক্ষী সুরক্ষা আইন করার তাগিদ দেয় বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিমের (বর্তমানে আপিল বিভাগের বিচারপতি) নেতৃত্বে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ।
ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের প্রধান কৌঁসুলি আব্দুল্লাহ আবু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনার (সাক্ষীর ওপর হামলা হুমকি) কথা প্রায়ই শুনি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সাক্ষী এসে বলেনি যে, তিনি নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন। সাক্ষী নিরাপত্তাহীন মনে করলে প্রসিকিউশন ও পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। আইন না থাকলেও সাক্ষীকে যত সুরক্ষা দেওয়া দরকার তার সবই দেওয়া হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রের উচিত সাক্ষীকে সুরক্ষা দেওয়া। আইন থাকলে বাধ্যবাধকতা চলে আসবে। না হলে তো সাক্ষীরা আদালতে ভয়ে আসবে না। আর সাক্ষী না আসলে মামলাগুলো নিষ্পত্তি হবে না, প্রকৃত আসামির শাস্তির ব্যবস্থা করা যাবে না।’
এখনো সাক্ষী সুরক্ষা আইন না হওয়া দুঃখজনক উল্লেখ করে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও আইন সাময়িকী ঢাকা ল রিপোর্টসের (ডিএলআর) সম্পাদক অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাক্ষী সুরক্ষা আইন বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত জরুরি। রাষ্ট্র যদি সাক্ষীকে সুরক্ষা ও নিরাপত্তা দিতে না পারে তাহলে তো মানুষ বিচার পাবে না, ন্যায়বিচারও নিশ্চিত হবে না।’