বঙ্গোপসাগরে ঝড়ের কবলে পড়ে ১৮টি মাছ ধরার ট্রলার ডুবে যাওয়ার পর দুই জেলের মরদেহ উদ্ধার করেছেন কোস্টগার্ডের সদস্যরা। গত শুক্রবার রাত ১১টার দিকে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের দুবলারচরসংলগ্ন সাগরে হঠাৎ ঝড়ের কবলে পড়ে ট্রলারগুলো ডুবে যায়। এ ঘটনার পর ট্রলারগুলোতে থাকা কমপক্ষে ২৩ জেলে নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছেন বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী। নিখোঁজদের সন্ধানে গতকাল শনিবার সকাল থেকে বন বিভাগ ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা সমুদ্রে তল্লাশি চালাচ্ছেন।
এদিকে দুবলারচর শুঁটকিপল্লিতে মাঘ মাসের প্রবল বৃষ্টিতে ভিজে কয়েক মেট্রিক টন মাছ নষ্ট হয়ে গেছে। এতে কয়েক কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত শুঁটকি ব্যবসায়ীরা।
ট্রলারডুবির পর মরদেহ উদ্ধার হওয়া দুই জেলে হলেন এফবি মা-বাবার দোয়া ট্রলারের মামুন এবং এফবি জামিলার ইসমাইল। এর মধ্যে মামুনের বাড়ি বাগেরহাটের চিতলমারীর কালিগঞ্জ গ্রামে এবং ইসমাইলের বাড়ি পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার জানখালী গ্রামে। গতকাল সন্ধ্যায় সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের দুবলারচরসংলগ্ন এলাকায় সাগরে ভাসমান অবস্থায় তাদের মরদেহ উদ্ধার করেন কোস্টগার্ডের সদস্যরা।
নিখোঁজ জেলেদের মধ্যে তিনজনের নাম পাওয়া গেছে। তারা হলেন শাহীনুর রহমান, মফিজুল ইসলাম ও মিজানুর রহমান। তাদের বাড়ি বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায়।
দুবলারচরের শুঁটকি ব্যবসায়ী আবু তাহের সাংবাদিকদের বলেন, শুক্রবার রাত ১১টার দিকে দুবলারচরসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে ৫০-৬০টি মাছ ধরার ট্রলার জাল দিয়ে মাছ ধরছিল। হঠাৎ সাগরে প্রবল বৃষ্টির সঙ্গে ঝড়ো হাওয়া শুরু হয়। বাতাসে সাগরে বড় বড় ঢেউ শুরু হলে ১৮টি ট্রলার উল্টে ডুবে যায়। এসব ট্রলারে থাকা অধিকাংশ জেলে সাঁতরে তীরে ফিরতে পারলেও অনেকে ফিরতে পারেননি। বন বিভাগ ও কোস্টগার্ড খবর পেয়ে সকাল থেকে ঘটনাস্থলে গিয়ে নিখোঁজ ট্রলার ও জেলেদের উদ্ধারে তল্লাশি চালাচ্ছে।
নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধার অভিযানের বিষয়ে মোংলায় কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের স্টাফ অফিসার মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আব্দুর রহমান গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজ (গতকাল শনিবার) সকালে ঝড়ের কবলে পড়ে সাগরে নিখোঁজ হওয়া জেলেদের উদ্ধারে তল্লাশি অভিযান শুরু করে কোস্টগার্ড। সন্ধ্যায় দুবলারচরসংলগ্ন সাগরে দুই জেলের মরদেহ ভাসতে দেখে আমরা তা উদ্ধার করি। স্থানীয় জেলেরা তাদের পরিচয় শনাক্ত করেছেন। রাতে অভিযান বন্ধ রয়েছে। আগামীকাল (আজ রবিবার) সকাল থেকে অন্য নিখোঁজদের উদ্ধারে অভিযান শুরু করা হবে।’
এর আগে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন ট্রলারডুবির বিষয়ে গতকাল দুপুরে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুবলার ও এর আশপাশে প্রবল ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টি বয়ে যাওয়ার সময় সাগরে মাছ ধরার ১৮টি ট্রলার ডুবে যায়। ডুবে যাওয়া ট্রলারের নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে বন বিভাগ ও কোস্টগার্ড যৌথভাবে অভিযান চালাচ্ছে।’
ট্রলারডুবির ঘটনায় নিখোঁজ জেলের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী। এফবি হাওলাদার ট্রলারের মাঝি এমাদুলের বরাতে তিনি বলেন, ‘নিখোঁজ জেলেদের বাড়ি বরগুনা, পিরোজপুর, বাগেরহাট ও পটুয়াখালী জেলার বিভিন্ন এলাকায়। ডুবে যাওয়া ট্রলারের মধ্যে রয়েছে এফবি মায়ের দোয়া, এফবি আনিছ ও এফবি ইলিয়াস।’
ট্রলার মালিক সমিতির এই নেতা জানান, নিখোঁজ জেলেদের সন্ধানে বরগুনার পাথরঘাটা এলাকার বেশ কয়েকটি ট্রলার উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। গতকাল সকাল ১০টা পর্যন্ত ৩০ জেলেকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও কমপক্ষে ২৫ জন নিখোঁজ ছিলেন। যাদের মধ্যে দুজনের লাশ গতকাল সন্ধ্যায় কোস্টগার্ডের সদস্যরা উদ্ধার করেন।
বৃষ্টিতে ভিজে মাছ নষ্ট হওয়ার বিষয়ে দুবলারচরের শুঁটকি ব্যবসায়ী আবু তাহের বলেন, ‘চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ১৮ জন বহদ্দার (শুঁটকি ব্যবসায়ী) শীত মৌসুমে শুঁটকি মাছ আহরণে সুন্দরবনের দুবলায় আসেন। সাগর থেকে সামুদ্রিক মাছ আহরণ করে তা দুবলার শুঁটকিপল্লির খোলা আকাশে শুকানো হয়। মাঘ মাসে হঠাৎ করে বৈরী আবহাওয়ায় প্রবল বৃষ্টিতে কয়েক মেট্রিক টন শুঁটকি মাছ ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। এতে আমাদের অন্তত পাঁচ কোটি টাকার লোকসান হবে।’
বৃষ্টিতে ভিজে শুঁটকি মাছ নষ্ট হওয়ায় ব্যবসায়ীদের অন্তত দুই কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন বন কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেন।