ফরিদ আহমেদ ‘বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি’র সভাপতি। করোনা পরিস্থিতিতে পিছিয়ে যাওয়া অমর একুশে গ্রন্থমেলা, সৃজনশীল প্রকাশনার সমস্যা ও সম্ভাবনা এবং লেখক-প্রকাশক সম্পর্কসহ প্রাসঙ্গিক বিষয়ে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তর সম্পাদকীয় বিভাগের এহ্সান মাহমুদ
দেশ রূপান্তর : করোনা মহামারীর কবলে গতবারের মতো এবারও বইমেলা পিছিয়ে যাওয়ার ঘোষণা পাওয়া গিয়েছিল আগেই। এখন নতুন সময়ে ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে মেলা শুরুর কথা বলা হয়েছে। এই বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন? করোনা মহামারী, মেলায় লাভ-লোকসানের আশঙ্কা, মেলা নিয়ে আপনাদের সার্বিক প্রস্তুতি জানতে চাই।
ফরিদ আহমেদ : এখানে শুরুতেই একটি বিষয়ে বলতে চাই, গতবার যেভাবে বইমেলা হয়েছে, তা আমরা দেখেছি। করোনার প্রভাবে মেলা নির্ধারিত সময়ে শুরু করা যায়নি। সেটি শুরু হয়েছিল মার্চে। ফেব্রুয়ারির বইমেলা মার্চে গিয়ে তাই আসল রূপ পায়নি, তা গতবার দেখা গেছে। আবার করোনার কারণে সরকারের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাসহ বিভিন্ন বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছিল। পরিবর্তিত সময়ে মেলা শুরুর পাশাপাশি মেলার প্রতিদিনকার সময়েও পরিবর্তন আনা হয়েছিল। রাত ৮টা থেকে বিকেল ৪টায় নিয়ে আসা হয়েছিল সময়। বারবার সময় পরিবর্তন এবং করোনার আতঙ্কে মেলা ঠিকমতো হতে পারেনি। তাই মেলা নিয়ে প্রকাশকরা দুশ্চিন্তায় ছিলেন। হতাশা ছিল।
গত বছর বইমেলা শুরু হওয়ার দিনে, অর্থাৎ উদ্বোধনী দিনে প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে মেলার আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেছিলেন। সেদিন আমি মঞ্চে ছিলাম। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, আমরা যদি করোনার ভ্যাকসিনটা দিয়ে দিতে পারতাম, তাহলে বইমেলা নির্দিষ্ট সময়েই শুরু করা যেত। প্রধানমন্ত্রী ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা শুরু করার ব্যাপারে আন্তরিক। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং বাংলা একাডেমিও মেলা আয়োজন নিয়ে আগ্রহী ও আন্তরিক। তাই এবার মেলার আয়োজন নিয়ে আমরা আশাবাদী। এবার বেশ সংখ্যক মানুষকে করোনার টিকার আওতায় আনা হয়েছে। তাই এবার পরিস্থিতি ভিন্ন বলেই আমার কাছে মনে হয়। একুশে ফেব্রুয়ারির আগেই যদি বইমেলা শুরু করা যায়, তবে মেলা ভালো হবে বলে আমরা আশাবাদী। বইমেলা নিয়ে তো একটা নীতিমালা আছেই। সাধারণত বইমেলা দিনের যে সময়ে শুরু ও শেষ হয় সে নীতিমালা অনুযায়ী হবে। এ নিয়ে আমাদের ভাবনা নেই। গত বছর স্টলের নির্ধারিত ভাড়ার অর্ধেক দিয়ে মেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলাম। এবারও সে রকমভাবে টাকা জমা দিয়েছি। গতবার মেলায় ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলেন প্রকাশকরা। এবার আমাদের প্রস্তাব অনুযায়ী মেলা হলে সেই ক্ষতি কিছুটা হলেও কাটিয়ে ওঠা যাবে বলে আশা করছি।
দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশের প্রকাশনা সংস্থার ওপর লেখক-প্রকাশক ছাড়াও বই মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান, বাঁধাইখানা থেকে শুরু করে কয়েকটি স্তরের লোকজন নির্ভরশীল। গতবারে করোনার প্রভাবে মেলা ঘিরে একধরনের হতাশার চিত্র দেখা গেছে বলে আপনারা বলছেন। এই বছর মেলা নিয়ে এমন কোনো আশঙ্কা আছে কিনা? সরকারের পক্ষ থেকে আপনাদের ক্ষতিগ্রস্ত প্রকাশকদের ক্ষতিপূরণে কোনো প্রণোদনা পাওয়া গেছে কী?
ফরিদ আহমেদ : এক্ষেত্রে একটা কথা আমরা আগেও বলেছি, এখনো পরিষ্কার করে বলতে চাই প্রণোদনার বিষয়ে বলতে হলে বলব, সাহায্য চাই না। আমরা চাই সহযোগিতা। বইমেলায় আয়োজনে ২০২১-এর সময়ে আমরা বাংলা একাডেমিকে প্রস্তাব দিয়েছিলাম স্টল ভাড়া অর্ধেক করার জন্য। তারা তা মেনে নিয়েছিল। এবারও আমরা এটা চেয়েছি। এবারও অর্ধেক ভাড়ায় দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আশাকরি তা বাস্তবায়ন হবে।
এর বাইরে সরকার প্রকাশকদের যদি সাহায্য করতে চায় সেটা হতে পারে, প্রকাশকদের কাছ থেকে বই কেনার মাধ্যমে। সরকারের বেশ কিছু খাত আছে যারা নিয়মিত বই কিনে থাকে। আমরা বলেছি, এই খাতগুলো যাতে আমাদের কাছ থেকে বই কেনে। সরকারের বিভিন্ন দপ্তর বই কিনে থাকে। তারাও এগিয়ে আসতে পারে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ও বই কিনে থাকে। আমাদের প্রস্তাবের পর সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় কিছু বাজেট বাড়িয়েছে। যদিও দেশের সামগ্রিক সংস্কৃতি খাতের বরাদ্দই কম। তবে সরকারের উচিত বিশেষ তহবিল ঘোষণা করে এই সৃজনশীল প্রকাশকদের পাশে থাকা।
দেশ রূপান্তর : এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলতে চাই। বাংলাদেশে লেখক এবং প্রকাশকদের একটি অংশ দাবি করেন তারা ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকেন। লেখকরা বলেন, তারা ঠিকমতো রয়্যালিটি পান না। আবার প্রকাশকরা বলে থাকেন, লেখকরা তাদের ঠিকমতো কথা রাখেন না। এই অবস্থার অবসান কীভাবে সম্ভব? লেখক-প্রকাশকদের সম্পর্কটি পেশাগত অবস্থায় কেন দাঁড়াচ্ছে না বলে মনে করেন?
ফরিদ আহমেদ : এই কথাটি পুরোপুরি ঠিক নয়। তবে বিগত পঞ্চাশ বছরে এমন ঘটনা যে ঘটেনি তা নয়। ঘটেছে, খুব কম সংখ্যক। আমাদের দেশের প্রবীণ লেখক থেকে শুরু করে অনেক নবীন লেখকও রয়্যালিটি নিয়ে সন্তুষ্টির কথা পত্রিকায় লিখে প্রকাশ করেছে। আমি গত ৩০ বছরের কথা বিশেষভাবে বলতে চাই। অর্থাৎ, ১৯৯২-৯৩ সালের দিক থেকে যদি শুরু করি, আমি বলতে পারব, এই সময়ে বাংলাদেশের বইমেলা দেখতে পশ্চিমবঙ্গের লেখকরা ও প্রকাশকরা ঢাকায় আসতেন। তারা ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকায় এসে দেখতেন যে বাংলাদেশের জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের বই কীভাবে বিক্রি হতো। যেভাবে লাইন দিয়ে বই বিক্রি হতো এটা দেখে তারা অবাক হয়ে যেত। পশ্চিমবঙ্গের লেখক ও প্রকাশকরা যাদের মধ্যে শীর্ষেন্দু ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো লেখকরা ছিলেন, তারা এখানে এসে বই বিক্রি দেখে বিস্ময় প্রকাশ করতেন। তারাও স্বীকার করেছেন, বাংলাদেশের লেখকরা যে পরিমাণ রয়্যালিটি পান, তারাও সেটা পান না।
তবে সভাপতি হিসেবে অল্পকিছু অভিযোগ আমি পেয়েছি। সেসব ক্ষেত্রে দেখা গেছে, লেখক এবং প্রকাশক দুজনেরই মধ্যে একটি ফাঁকি রয়েছে। দুই পক্ষ পরিষ্কার থাকলে এমন পরিস্থিতি ঘটে না। আমি সবসময়ই বলেছি, বই প্রকাশের আগে লেখক-প্রকাশক একটি চুক্তি করে নিতে। চুক্তি করলে পরে এমন ঘটনা বা অভিযোগ উঠবে না।
দেশ রূপান্তর : মেলা আয়োজনের দায়িত্ব কাদের হওয়া উচিত মনে করেনবাংলা একাডেমি নাকি প্রকাশকদের?
ফরিদ আহমেদ : মেলা আয়োজনের দায়িত্ব বাংলা একাডেমির নয় এই কথা আপনি বা আমি আর নতুন করে কী বলব! বাংলা একাডেমির সাবেক সভাপতি যিনি আমাদের শ্রদ্ধার মানুষ, প্রয়াত আনিসুজ্জামান এই কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মেলা আয়োজনের দায়িত্ব থেকে বাংলা একাডেমির সরে আসা উচিত। তিনি বাংলা একাডেমির বার্ষিক সাধারণ সভায় এই মতামত জানিয়েছিলেন। তার এই মতামত কেন যে আর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া গেল না, তা এখনো আমাকে ভাবনায় ফেলে দেয়। মেলা আয়োজনে আমরা যে উদ্যোগ নিইনি, তা ঠিক নয়। আমরা বিভিন্ন সময়ে আমাদের মিটিংয়ে বলেছি, মেলার দায়িত্ব আমাদের দিয়ে দেওয়া হোক। তবে এটা ঠিক, আমরা বাংলা একাডেমির কাছ থেকে দায়িত্ব ছিনিয়ে নিতে চাইনি। কিংবা বিকল্প আরেকটি মেলার ঘোষণা দিইনি। আমরা যেটা করেছি, ভেবেছি, একুশে বইমেলা যেহেতু আমাদের আবেগের এবং চেতনার একটি জায়গা। তাই কোনোভাবেই আমরা চাইনি যে, একুশে বইমেলা নিয়ে ন্যূনতম কোনো বিতর্ক হোক। তাই আমরা একাডেমির সঙ্গে মিলেই মেলায় অংশগ্রহণ করে আসছি। বাংলা একাডেমি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি প্রতিষ্ঠান। বাংলা একাডেমির অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। সেসব কাজ সম্পন্ন করতে তাদের মেলা আয়োজনের থেকে মুক্ত রাখা যেতে পারে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় মেলা আয়োজনের জন্য তাদেরই আরেকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছেজাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র মেলার অয়োজন করতে পারে। প্রকাশকরা তাদের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে।
দেশ রূপান্তর : বইমেলার টিকিট চালু করা নিয়ে একটি আলোচনা দেখা যায়। এতে কেউ কেউ বলছেন, টিকিট পদ্ধতি চালু করা যায়। আবার কেউ কেউ বলছেন, একুশে বইমেলায় টিকিট প্রবর্তন করা ঠিক হবে না। একজন প্রকাশক হিসেবে এই বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
ফরিদ আহমেদ : এখন আসলে বইমেলা শুরুর সময় আর মেলা কত দিন হবেএগুলোই আলোচনার মুখ্য বিষয়। এসব বিষয় নিয়েই এখন আমাদের কাজ করতে হচ্ছে। বইমেলা নিয়ে এরই মধ্যে আমাদের প্রকাশকদের দুই সমিতির (বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি এবং বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি) প্রতিনিধিদের সঙ্গে বাংলা একাডেমির বৈঠক হয়েছে। আমরা প্রস্তাব দিয়েছি, ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়ে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ১৭ মার্চ পর্যন্ত যেন বইমেলা চলে। এর মধ্যে বইমেলায় টিকিট রাখা হবে কি না, এই আলোচনা আমরা করতে চাই না। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই আলোচনা তোলার সুযোগও নেই। এর আগেও টিকিট নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, এমনকি বইমেলার প্রবেশে টিকিট ছাপানো হয়েছিল, মেলা প্রাঙ্গণে টিকিট বুথ স্থাপন করা হয়েছিল। পরে শেষ মুহূর্তে সেখান থেকে সরে আসা হয়েছিল।
দেশ রূপান্তর : বইমেলায় কয়েক বছর যাবৎ শিশুকর্নার রাখা হচ্ছে। মেলার সময়ে আলাদা করে শিশুপ্রহরও করা হয়। কিন্তু সবচেয়ে যেটি বেশি নজর দেওয়া উচিত শিশুদের উপযোগী বই কতটা প্রকাশ পাচ্ছে। শিশুদের মানসম্পন্ন বইয়ের সংখ্যা দিনদিন কমছে। এমন পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো বলে মনে করেন? ডিজিটাল মাধ্যমের কোনো আগ্রাসন রয়েছে কি না এক্ষেত্রে?
ফরিদ আহমেদ : ডিজিটাল মাধ্যমের একটি প্রভাব রয়েছে এটা সত্য। তবে একথাও সত্য আগে যেসব খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিকরা ছিলেন সেই তুলনায় এখন বলব যে, কিছুটা লেখক ঘাটতি রয়েছে। আবার বইমেলা প্রাঙ্গণে যে শিশু কর্নার করা হয়, তার একটি কারণ হতে পারে শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করা। আবার ধরা যাক, আমাদের সময় প্রকাশনার মতো আরও কিছু প্রকাশনা রয়েছে, যাদের ভালো শিশুতোষ বই রয়েছে কিন্তু শিশুকর্নারে এদের কোনো স্টল থাকে না। তাই অনেক সময়ে ভালো বইয়ের খোঁজও জানা হয় না।
দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশে সৃজনশীল বইয়ের প্রকাশকদের সমস্যা কী কী? এ থেকে উত্তরণের উপায় জানতে চাই।
ফরিদ আহমেদ : এখন আমি বলি যে, কোনো সমস্যাকেই আর সমস্যা বলে মনে করা যাবে না। অক্সিজেনের মধ্যে থেকেও মানুষ যেমন অক্সিজেনের অভাবে ভুগতে পারে তেমন অবস্থা বিরাজ করছে আমাদের প্রকাশনা খাতে। প্রকাশক উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি সরকারের উচিত তহবিল গঠন করে প্রকাশনা খাতকে সচল রাখা।
দেশ রূপান্তর : অনেক ধন্যবাদ, আপনাকে।
ফরিদ আহমেদ : আপনাকেও ধন্যবাদ।