বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনে চিত্রনায়ক জায়েদ খানের প্রার্থিতা বাতিল করে চিত্রনায়িকা নিপুণ আক্তারকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করে নির্বাচনী আপিল বোর্ডের দেওয়া সিদ্ধান্ত স্থগিত করেছে উচ্চ আদালত। নির্বাচনী আপিল বোর্ডের ওই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে জায়েদ খানের করা রিট আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে গতকাল সোমবার বিচারপতি মামনুন রহমান ও বিচারপতি খোন্দকার দিলীরুজ্জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এ আদেশ দেয়।
রুলে গত ২ ফেব্রুয়ারি জায়েদ খানের প্রার্থিতা বাতিলসংক্রান্ত সমাজসেবা অধিদপ্তরের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনী আপিল বোর্ডের দেওয়া সিদ্ধান্ত কেন আইনগত কর্র্তৃত্ববহির্ভূত ও বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়েছে হাইকোর্ট। সমাজকল্যাণ সচিব, সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি সোহানুর রহমান সোহান, পরিচালক মোহাম্মদ হোসেন, অভিনেত্রী নিপুণ আক্তার ও পরিচালক মোহাম্মদ হোসেন জেমিকে এক সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
আদালতের আদেশের বরাত দিয়ে জায়েদ খানের আইনজীবীরা জানান, সমিতির নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে জায়েদ খানের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করতে বলেছে হাইকোর্ট। আর রিট আবেদনকারী জায়েদ খান জানিয়েছেন, তিনি ন্যায়বিচার পেয়েছেন। অন্যদিকে হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করবেন বলে জানান নিপুণের আইনজীবীরা।
আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী আহসানুল করিম ও নাহিদ সুলতানা যূঁথী। নিপুণের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রোকন উদ্দিন মাহমুদ। সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান খান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাগমার।
এবারের চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচন নিয়ে দেশ জুড়ে ছিল নানা আলোচনা ও কৌতূহল। শিল্পী সমিতির এ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হয় গত ২৮ জানুয়ারি। ভোটগ্রহণের পর সভাপতি পদে ইলিয়াস কাঞ্চন ও সাধারণ সম্পাদক পদে জায়েদ খানকে বিজয়ী ঘোষণা করে দায়িত্বপালনকারী নির্বাচন কমিশন। ঘোষিত ওই ফলাফলে নিপুণের চেয়ে ১৩ ভোট বেশি পান জায়েদ খান। তবে জায়েদ টাকা দিয়ে ভোট কিনছেন বলে ভোটগ্রহণের দিন নিপুণ গণমাধ্যমে অভিযোগ করেন। পরে তার আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে ভোট পুনঃগণনার ফলাফলও একই থাকে। এরপর সংবাদ সম্মেলন করে জায়েদ খানের বিরুদ্ধে ভোট কেনার অভিযোগ করেন নিপুণ। একই সঙ্গে ওইদিন শিল্পী সমিতির নির্বাচনের নির্বাচন কমিশনার পীরজাদা হারুনের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলেন। এরপর নির্বাচনী আপিল বোর্ডে জায়েদ খান ও সমিতির কার্যকরী পরিষদের সদস্য চুন্নুর পদ বাতিলের আবেদন করেন নিপুণ। তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে করণীয় জানতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান সোহানুর রহমান সোহান। এরই ধারাবাহিকতায় ২ ফেব্রুয়ারি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পাঠানো এক চিঠিতে আপিল বোর্ডকেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরপর গত শনিবার দুপক্ষকে নিয়ে আলোচনায় বসেন সোহানুর রহমান সোহান। তবে ২৯ জানুয়ারির পর নির্বাচনী আপিল বোর্ডের কোনো কার্যকারিতা নেই জানিয়ে ওই আলোচনায় অংশ নেননি জায়েদ খান। পরে ৫ ফেব্রুয়ারি জায়েদ খানের প্রার্থিতা বাতিল করে নিপুণকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করে নির্বাচনী আপিল বোর্ড। পরদিন ৬ ফেব্রুয়ারি সমিতির সভাপতি ইলিয়াস কাঞ্চন ও নিপুণ আক্তার শপথ নেন।
নিপুণকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণার সিদ্ধান্ত স্থগিতের বিষয়ে আইনজীবী নাহিদ সুলতানা যূঁথী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২ ফেব্রুয়ারি সমাজসেবা অধিদপ্তর চিঠির মাধ্যমে নির্বাচনী আপিল বোর্ডকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে এখতিয়ার দেয়। আমাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সেই চিঠির কার্যকারিতা স্থগিত করেছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে জায়েদ খানের প্রার্থিতা বাতিল করে নিপুণ আক্তারকে বিজয়ী ঘোষণার সিদ্ধান্তটিও স্থগিত করেছে আদালত। আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে জায়েদ খানের কার্যক্রমে কেউ যেন কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে। এর অর্থ হচ্ছে, ওই পদে জায়েদ খানের দায়িত্ব পালন করতে কোনো বাধা নেই। রুলের জবাব দেওয়ার এক সপ্তাহ পর এ বিষয়ে শুনানি হবে।’
অন্যদিকে নিপুণের আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাইকোর্টের এই অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ স্থগিত চেয়ে আমরা আপিল বিভাগে আবেদন করব।’
হাইকোর্টের আদেশের প্রতিক্রিয়ায় জায়েদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি ন্যায়বিচার পেয়েছি। দুর্বলদের জন্য যে হাইকোর্টে ন্যায়বিচার রয়েছে তার প্রমাণ এ আদেশ। আমি আইন ও বিচারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। বিচার বিভাগের প্রতি কৃতজ্ঞ।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি ভোটে একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি। কিন্তু সাত দিন পর কোথা থেকে আপিল বোর্ড এলো? আমরাই তফসিল বানিয়েছি। আমরাই আপিল বোর্ডকে নিয়োগ দিয়েছি। ২৯ তারিখের পর তাদের কার্যক্রম আর নেই। কিন্তু আমার প্রতি তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে অবিচার করেছেন। আমি এখন শিল্পীদের কল্যাণে কাজ করে যাব।’